ভারতে নন-লাইফ বীমা প্রিমিয়াম ২৪ হাজার কোটি রুপির বেশি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতে নন-লাইফ বীমা খাত ২০২৬ সালের মে মাসে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। দেশটির নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর মোট প্রিমিয়াম আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮.৭ শতাংশ বেড়ে ২৪,১৯৪.৫৬ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাস্থ্য বীমার চাহিদা বৃদ্ধিই এ প্রবৃদ্ধির মূল কারণ।
ভারতের জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কাউন্সিলের (জিআইসি) প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে স্বাস্থ্য বীমা খাত নন-লাইফ বীমা শিল্পের প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। শুধু স্বাস্থ্য বীমা ব্যবসা পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয় ৩১.৭৪ শতাংশ বেড়ে ৩,৮৪২.৪১ কোটি রুপিতে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৫,৪১৮ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, মহামারির পর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, ক্যাশলেস চিকিৎসা সুবিধার সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে স্বাস্থ্য বীমা কেনার সুযোগ বাড়ায় এই খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
অন্যদিকে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয় ৫.৮৫ শতাংশ বেড়ে ২০,৩৪৫.৯০ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৮,৬৮৮ কোটি টাকা। এতে বোঝা যায়, স্বাস্থ্য বীমার তুলনায় অন্যান্য নন-লাইফ বীমা খাতের প্রবৃদ্ধি অপেক্ষাকৃত ধীর ছিল।
বড় বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে আইসিআইসিআই লোম্বার্ড উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। কোম্পানিটির প্রিমিয়াম আয় ১১.৫৯ শতাংশ বেড়ে ২,৪০৫.০৩ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩,৩৯১ কোটি টাকার সমান। শক্তিশালী বিতরণ ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং বৈচিত্র্যময় পণ্যের কারণে প্রতিষ্ঠানটি বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।
অন্যদিকে ভারতের বৃহত্তম সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠান নিউ ইন্ডিয়া অ্যাসিওরেন্সের প্রিমিয়াম আয় প্রায় স্থিতিশীল ছিল। মে মাসে কোম্পানিটির প্রিমিয়াম আয় মাত্র ০.০৩ শতাংশ বেড়ে ২,৯৪৫.৬৪ কোটি রুপিতে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪,১৫৪ কোটি টাকা। সামগ্রিক প্রিমিয়াম আয় বাড়লেও সরকারি খাতের বীমা কোম্পানিগুলো বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
চলতি অর্থবছরের এপ্রিল ও মে, এই দুই মাসে ভারতের নন-লাইফ বীমা খাতের মোট প্রিমিয়াম ৬.৭৫ শতাংশ বেড়ে ৫৯,৬১২.৯০ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৮৪,০৫৪ কোটি টাকা। একই সময়ে স্বাস্থ্য বীমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৪.০৩ শতাংশ, যা পুরো শিল্পের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্য বীমা এখন ধীরে ধীরে ভারতে মোটর বীমাকে ছাড়িয়ে নন-লাইফ বীমা খাতের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক খাতে পরিণত হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক ঝুঁকি সম্পর্কে বেশি সচেতন হচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্কারের ফলে বীমা সুরক্ষার পরিধিও বাড়ছে। ফলে ব্যক্তি ও পরিবারগুলো আগের তুলনায় বেশি স্বাস্থ্য বীমা কিনছে।
তবে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে। হাসপাতাল ব্যয় ও চিকিৎসা খরচ বৃদ্ধির কারণে বীমা দাবির পরিমাণ বাড়ছে। এতে বীমা কোম্পানিগুলোর লাভজনকতার ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সঠিক মূল্য নির্ধারণ এবং দক্ষ দাবি নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন বীমা সেবার সম্প্রসারণ ভারতের বীমা খাতে বড় পরিবর্তন এনেছে। মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে গ্রাহকরা সহজেই বিভিন্ন পলিসির তুলনা করতে পারছেন, দ্রুত বীমা কিনতে পারছেন এবং দাবি নিষ্পত্তির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। ফলে নতুন গ্রাহক যুক্ত হওয়ার হার বাড়ছে এবং বীমা সেবা আরও সহজলভ্য হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য বীমা পণ্যের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বাড়ানো, ডিজিটাল বিক্রয় চ্যানেল সম্প্রসারণ, ক্যাশলেস চিকিৎসা সুবিধা উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের বীমা খাতও দ্রুত সম্প্রসারণের সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য বীমার বিস্তার মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, স্বাস্থ্য বীমার বর্তমান প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে ভারতের নন-লাইফ বীমা খাতের কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। মোটর বীমার পাশাপাশি স্বাস্থ্য বীমার গুরুত্ব ও বাজারে এর অংশ আরও বাড়বে। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসুরক্ষা, প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিশেষ কভারেজ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি ব্যবস্থাপনা তখন হবে প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি।



