তবে একই সঙ্গে বেড়েছে সাইবার প্রতারণা, পরিচয় চুরি, তথ্য ফাঁস এবং অননুমোদিত লেনদেনের ঝুঁকি। অথচ এই ঝুঁকির বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকার পরও বিশ্বের বড় একটি অংশ এখনো জানে না, এসব ক্ষতি থেকে সুরক্ষার জন্য রয়েছে বিশেষ বীমা সুবিধা।
মিউনিখ রি-এর গ্লোবাল সাইবার রিস্ক অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স সার্ভে ২০২৬ অনুযায়ী, ২০টি দেশের ৯,৫০০-এর বেশি মানুষের মতামতের ভিত্তিতে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেয়া ৫৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের সাইবার আক্রমণের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এসব আক্রমণের মধ্যে ছিল অনলাইন শপিং প্রতারণা, ম্যালওয়্যার আক্রমণ, ব্যাংক লেনদেনে জালিয়াতি, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি এবং পরিচয় চুরির মতো ঘটনা।
তবে সাইবার ঝুঁকির অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত সাইবার বীমার ব্যবহার এখনো সীমিত। জরিপে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত সাইবার বীমা না থাকা মানুষের মধ্যে ৩২ শতাংশ জানেনই না যে এমন কোনো বীমা পণ্য রয়েছে। অন্যদিকে ৩১ শতাংশ গ্রাহক পলিসির খরচকে বড় বাধা হিসেবে দেখেছেন। ১৯ শতাংশ জানিয়েছেন, সাইবার বীমা কী ধরনের সুরক্ষা দেয় সে বিষয়ে তাদের পরিষ্কার ধারণা নেই, আর ১৪ শতাংশ মনে করেন তাদের ব্যক্তিগত সাইবার ঝুঁকি খুব কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্য মূলত একটি বড় সচেতনতার ঘাটতি নির্দেশ করে। অনেক মানুষ এখনো সাইবার ঝুঁকিকে শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবে সাইবার আক্রমণের ফলে সরাসরি আর্থিক ক্ষতি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচয় জালিয়াতির মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ব্যক্তিগত সাইবার বীমা সাধারণত অনলাইন প্রতারণা, অননুমোদিত ডিজিটাল লেনদেন, পরিচয় চুরি, ফিশিং আক্রমণ, তথ্য পুনরুদ্ধারের খরচ এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ সহায়তা দিতে পারে। অর্থাৎ এটি শুধু অর্থ ফেরতের বিষয় নয়; বরং সাইবার ঘটনার পর ক্ষতি কমানো এবং দ্রুত পুনরুদ্ধারে সহায়তা করার একটি আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।
তবে সাইবার বীমার প্রতি আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। মিউনিখ রি-এর জরিপ অনুযায়ী, ২০২১ সালে ব্যক্তিগত সাইবার বীমা নেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছিলেন এমন মানুষের হার ছিল ২৮ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে বেড়ে ৩৭ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে আগ্রহ বেড়েছে ৯ শতাংশ পয়েন্ট। গ্রাহকদের কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণ, বিশেষজ্ঞ সহায়তা এবং অনলাইন ঝুঁকির সময় মানসিক নিশ্চয়তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
বিশ্বব্যাপীও সাইবার বীমার খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। মিউনিখ রি-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক সাইবার বীমা খাত বর্তমানে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি এবং আগামী কয়েক বছরে এর আকার আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতি, ক্লাউড প্রযুক্তি, অনলাইন বাণিজ্য এবং আর্থিক প্রযুক্তির বিস্তার এই খাত বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি।
সাইবার অপরাধের ধরনও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। র্যানসমওয়্যার, ডেটা ব্রিচ বা তথ্য ফাঁস, বিজনেস ই-মেইল কমপ্রোমাইজ বা ব্যবসায়িক ই-মেইল জালিয়াতি এবং ডিস্ট্রিবিউটেড ডিনায়েল অব সার্ভিস আক্রমণ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় সাইবার ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশেও ডিজিটাল সেবার বিস্তারের সঙ্গে সাইবার ঝুঁকির পরিধি বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহারকারী সংখ্যা ২০ কোটির বেশি অ্যাকাউন্টে পৌঁছেছে এবং প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল লেনদেন হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি। এসব ডিজিটাল ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে অনলাইন প্রতারণা, ফিশিং এবং আর্থিক জালিয়াতির ঝুঁকিও বাড়ছে।
তবে বাংলাদেশে ব্যক্তিগত সাইবার বীমার খাত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সীমিত সংখ্যক পণ্য, গ্রাহকের কম সচেতনতা, জটিল পলিসি ভাষা এবং সুবিধাগুলো সহজভাবে তুলে ধরার অভাব এই খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে দেশের বীমা কোম্পানিগুলো মূলত করপোরেট পর্যায়ের সাইবার ঝুঁকি কাভারেজে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে; ব্যক্তিগত গ্রাহকের জন্য সহজ ও সাশ্রয়ী পণ্যের সুযোগ এখনো সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে সাইবার বীমার প্রসারে বীমা কোম্পানিগুলোকে সহজ ভাষায় পলিসির সুবিধা ব্যাখ্যা করতে হবে, কম প্রিমিয়ামের পণ্য তৈরি করতে হবে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকেও সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসম্মত পণ্য কাঠামো তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।