রাজ কিরণ দাস: বাংলাদেশের বীমা খাত বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর ঋণ কর্মসূচি ও সংস্কার রোডম্যাপের প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। ব্যাংক খাতের পাশাপাশি, বীমা খাতেও সুশাসন, স্বচ্ছতা, গ্রাহক সেবা, দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া এবং বিনিয়োগ নীতিমালায় বড় পরিবর্তনের তাগিদ দেয়া হয়েছে।
.jpg)
রাজ কিরণ দাস: বাংলাদেশের বীমা খাত বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর ঋণ কর্মসূচি ও সংস্কার রোডম্যাপের প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। ব্যাংক খাতের পাশাপাশি, বীমা খাতেও সুশাসন, স্বচ্ছতা, গ্রাহক সেবা, দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া এবং বিনিয়োগ নীতিমালায় বড় পরিবর্তনের তাগিদ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে, বীমা খাতে দীর্ঘসূত্রিতা, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, কম পেনিট্রেশন রেট এবং গ্রাহক আস্থার সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে।
আইএমএফের ইসিএফ, ইএফএফ ও আরএসএফ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংস্কার এখন নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত একটি টিম বাংলাদেশ সফর করে ২০২৫ আর্টিকেল আইভি কনসালটেশন এবং ইসিএফ/ইএফএফ/আরএসএফ কর্মসূচির পঞ্চম পর্যালোচনা নিয়ে আলোচনা করেছে। এর আগে ২০২৫ সালের জুনে আইএমএফ বাংলাদেশের জন্য ইসিএফ ও ইএফএফ ব্যবস্থার আওতায় মোট সহায়তা প্রায় ৪.১ বিলিয়ন ডলার এবং আরএসএফ ব্যবস্থায় প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা জানিয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের বীমা খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর অর্থনীতিতে খুব কম অবদান। তথ্য অনুযায়ী, দেশের বীমা পেনিট্রেশন রেট বা জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান বর্তমানে মাত্র ০.৩৩ শতাংশ থেকে ০.৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হালনাগাদ হিসাবে মোট বীমা প্রিমিয়াম দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে লাইফ বীমা খাতে ১২ হাজার ৪২ কোটি টাকা এবং সাধারণ বীমা খাতে ৬ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা প্রিমিয়াম এসেছে। একই সময়ে লাইফ ফান্ডের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা।
প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান অনেক পিছিয়ে। ভারতের বীমা পেনিট্রেশন ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যদিও সাম্প্রতিক কয়েক বছর আগে এই হার প্রায় ৪.২ শতাংশে উঠেছিল। ভিয়েতনামে বীমা পেনিট্রেশন ২.৩ থেকে ২.৮ শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে, ওইসিডি দেশগুলোর গড় বীমা পেনিট্রেশন ২০২৪ সালে ৬.২ শতাংশ, আর লুক্সেমবার্গে এই হার প্রায় ৩৩ শতাংশ।
বীমা খাতের দুর্বলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দাবির নিষ্পত্তি হার, যা বর্তমানে ৫৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২৪ সালে মোট ১৬ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকার দাবির বিপরীতে বীমা কোম্পানিগুলো ৯ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। লাইফ বীমায় দাবি নিষ্পত্তির হার ৭২ শতাংশ থেকে কমে ৬৫ শতাংশে এবং সাধারণ বীমায় ৪১ শতাংশ থেকে কমে ৩২ শতাংশে নেমেছে।
বিশ্বমানের তুলনায় এই হার অত্যন্ত কম। বৈশ্বিকভাবে দাবি নিষ্পত্তির হার সাধারণত ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশের কাছাকাছি থাকে। ফলে বাংলাদেশে দাবি পরিশোধে বিলম্ব, অনিষ্পন্ন দাবি এবং দুর্বল গ্রাহকসেবা বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বীমার মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস; কিন্তু গ্রাহক যদি সময়মতো দাবি না পান, তাহলে নতুন পলিসি গ্রহণে অনীহা তৈরি হয়।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আস্থার সংকটের কারণে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে পলিসি ল্যাপস বা পলিসি স্থগিতের হার প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছে। এর মানে হলো অনেক গ্রাহক নিয়মিত প্রিমিয়াম চালিয়ে যেতে পারছেন না বা বীমা কোম্পানির ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে লাইফ বীমা খাতের তহবিল, বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করতে পারে।
বীমা খাত উন্নয়নে ২০১৮ সালে ৯২৫ কোটি টাকার ‘বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ চালু করা হলেও প্রত্যাশিত ফল আসেনি। প্রকল্প শুরুর সময় লাইফ ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে মোট বীমাগ্রহীতার সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ। লক্ষ্য ছিল চার বছরের মধ্যে তা ২ কোটিতে উন্নীত করা। কিন্তু ২০২৪ সালের শেষে সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৮২ লাখ ২০ হাজারে। অর্থাৎ প্রকল্প চলাকালেই বীমা কভারেজ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বীমা পেনিট্রেশন ০.৫৫ শতাংশ থেকে ০.৩৬ শতাংশে নেমে যায়।
আইএমএফ ও খাতসংশ্লিষ্ট আলোচনায় বীমা খাতের জন্য কয়েকটি বড় সংস্কার প্রস্তাব সামনে এসেছে। প্রথমত, বীমা আইন ২০১০ এবং আইডিআরএ আইন ২০১০ সংশোধনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে আরও শক্তিশালী করার কথা বলা হচ্ছে। দুর্বল বা সমস্যাগ্রস্ত বীমা কোম্পানির বোর্ড ভেঙে দেয়া, প্রয়োজন হলে কোম্পানি একীভূত করার ক্ষমতা এবং কঠোর তদারকির বিষয়ও আলোচনা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, মূলধন ও সলভেন্সি মার্জিন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। সলভেন্সি মার্জিনের উদ্দেশ্য হলো, বীমা কোম্পানির কাছে যেন গ্রাহকের দাবি পরিশোধের মতো পর্যাপ্ত মূলধন সবসময় থাকে। দুর্বল মূলধন কাঠামো, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং একচুয়ারিয়াল সক্ষমতার ঘাটতি বীমা খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তৃতীয়ত, বিনিয়োগ নীতিমালার আধুনিকায়ন একটি বড় ইস্যু। বর্তমানে লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোকে তাদের তহবিলের অন্তত ৩০ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে হয়। সাধারণ বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রেও সরকারি সিকিউরিটিজে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের বিধান রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এই বিনিয়োগ কাঠামোকে ঝুঁকিভিত্তিক, বৈচিত্র্যময় এবং বৈশ্বিক মানের করা দরকার, যাতে বীমা তহবিল থেকে স্থিতিশীল ও ভালো রিটার্ন পাওয়া যায়।
চতুর্থত, দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ডিজিটালাইজেশন জরুরি হয়ে পড়েছে। গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক করা, কেন্দ্রীয় অনলাইন ডাটাবেজ তৈরি, কোম্পানিভিত্তিক দাবি নিষ্পত্তির তথ্য প্রকাশ এবং গ্রাহক অভিযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রস্তাব সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের মধ্যে এই খাতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেয়া হয়েছে।
পঞ্চমত, কৃষি ও স্বাস্থ্য বীমার প্রসারের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, স্বাস্থ্য ব্যয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিক ঝুঁকি কমাতে ইনডেক্স-বেজড কৃষি বীমা, স্বাস্থ্য বীমা এবং নতুন ধরনের সুরক্ষা পণ্যের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এসব পণ্য চালু হলে একদিকে বীমা পেনিট্রেশন বাড়তে পারে, অন্যদিকে দুর্যোগ বা অসুস্থতার সময় মানুষের আর্থিক ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
রি-ইন্স্যুরেন্স কাঠামোতেও পরিবর্তনের আলোচনা রয়েছে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার ভাবনায় বিশ্ববাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, রি-ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা এবং দাবি নিষ্পত্তির সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রি-ইন্স্যুরেন্সে কার্যকর সংস্কার হলে বড় ঝুঁকি মোকাবিলায় সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা বাড়বে।
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এই সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ। আইএমএফের জানুয়ারি ২০২৬ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৫ অর্থবছরে ৩.৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০২৪ অর্থবছরে ছিল ৪.২ শতাংশ এবং অর্থবছর ২০২৩-এ ছিল ৫.৮ শতাংশ। তবে আর্থিক খাতের দুর্বলতা মোকাবিলা ও রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর নীতি বাস্তবায়িত হলে ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশে ফিরতে পারে বলে আইএমএফ আশা করছে।
বিশ্বমানের বীমা খাতের সাথে বৈশ্বিক তুলনায় বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে, তবে আইএমএফের রোডম্যাপ বাস্তবায়ন হলে বীমা খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আশা করা যাচ্ছে।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।