নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের আলো ফোটার আগেই কলসি হাতে বাড়ি থেকে বের হন বাংলাদেশের উপকূলের অনেক নারী। বাড়ির পাশের নলকূপের পানি লবণাক্ত। কোথাও পুকুরের পানিও আর নিরাপদ নয়। তাই প্রতিদিনই হাঁটতে হয় কয়েক কিলোমিটার পথ, শুধু এক কলসি সুপেয় পানির জন্য।
এই পথচলা শুধু পানির জন্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সময়, স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়তে থাকা লবণাক্ততা এখন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ঝুঁকিরও কারণ হয়ে উঠছে।
একদিকে বাড়ছে পানিবাহিত রোগ ও লবণাক্ত পানি ব্যবহারের স্বাস্থ্যঝুঁকি, অন্যদিকে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়, কমছে কর্মক্ষমতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও জীবিকা। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই বাড়তি আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বীমা কি কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারে?
বাংলাদেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলার সব এলাকায় পরিস্থিতি এক নয়। তবে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, নোয়াখালী এবং কক্সবাজারের কিছু অংশে সুপেয় পানির সংকট সবচেয়ে প্রকট। গত দুই দশকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে এই সংকট আরও জটিল হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু এলাকায় লবণপানি ব্যবহার করে চিংড়ি চাষের বিস্তারও মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। ফলে নিরাপদ পানির উৎস আগের তুলনায় দ্রুত কমে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে নারীদের ওপর। কারণ পরিবারে পানি সংগ্রহ, রান্না এবং শিশু ও বয়স্কদের দেখাশোনার দায়িত্ব এখনও প্রধানত তাদেরই। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পানি সংগ্রহের প্রায় ৮২ শতাংশ দায়িত্ব পালন করেন নারীরা, আর আরও ৪ শতাংশ বহন করে কিশোরীরা। ফলে প্রতিদিনের দীর্ঘ সময় পানি সংগ্রহে ব্যয় হওয়ায় আয়ের কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ কমে যায়, মেয়েদের পড়াশোনা ব্যাহত হয় এবং গর্ভবতী ও বয়স্ক নারীদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
বিশুদ্ধ পানির অভাবের প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি পান করলে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। নিরাপদ পানির অভাবে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগও বৃদ্ধি পায়। অসুস্থতার কারণে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে, কর্মদিবস নষ্ট হয় এবং অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে বা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অভাব নারীদের স্বাস্থ্য, মর্যাদা এবং জীবিকার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
ফলে নিরাপদ পানির সংকট শুধু জনস্বাস্থ্যের বিষয় থাকে না; এটি ধীরে ধীরে পরিবারের আর্থিক ঝুঁকিতেও পরিণত হয়। পরিবারে একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অসুস্থ হলে শুধু চিকিৎসার খরচই বাড়ে না, একই সঙ্গে কমে যায় আয়ও। জলবায়ুজনিত দুর্যোগে কৃষিজমি, মাছের ঘের বা পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই ক্ষতির প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের স্বাস্থ্য, কৃষি ও জীবিকার ওপর অর্থনৈতিক চাপ ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বীমাকে সম্ভাব্য একটি আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নিরাপদ পানির সংকটের মূল কারণ দূর করতে বীমা সক্ষম নয়। তবে পানিবাহিত রোগ, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা কিংবা দুর্যোগের কারণে আয় ও সম্পদের ক্ষতি হলে বীমা পরিবারের আর্থিক ধাক্কা অনেকটাই কমাতে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ও উন্নয়ন অংশীদারদের জন্যও এটি একটি কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উপায় হতে পারে।
স্বাস্থ্যবীমা চিকিৎসা ব্যয়ের একটি অংশ বহনে সহায়তা করতে পারে। আবার ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, কৃষি ও জীবিকা দ্রুত পুনর্গঠনে ক্লাইমেট রিস্ক ফাইন্যান্সিং, প্যারামেট্রিক বীমা এবং দুর্যোগভিত্তিক বীমার মতো ব্যবস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহার হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কার্যকর পানি অবকাঠামো, নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিকল্প হিসেবে নয়; বরং এসব উদ্যোগের পরিপূরক হিসেবেই বীমাকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।
তাই উপকূলীয় বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি সমান গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ- নিরাপদ পানির টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি করা। নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি সেই সংকট থেকে তৈরি হওয়া আর্থিক ক্ষতি সামাল দেয়ার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বীমা হয়তো পুরো সমাধান নয়, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের এই নতুন বাস্তবতায় মানুষের আর্থিক সুরক্ষা জোরদারে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হয়ে উঠতে পারে।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।