ম্যাককিনসের বিশ্লেষণ

এআইয়ের ব্যবহার বাড়লে খরচ কমবে বীমা খাতে

প্রকাশিত: ৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১৫ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বাড়ালে বৈশ্বিক বীমা খাতে নতুন গ্রাহক যুক্ত করার খরচ ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যেতে পারে। একই সঙ্গে বীমা এজেন্টদের কাজের দক্ষতা ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসের বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিষ্ঠানটির মতে, আন্ডাররাইটিং, ক্লেইম ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকসেবা এবং ঝুঁকি মূল্যায়নে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ায় বীমা কোম্পানিগুলোর কাজের গতি বাড়ছে, পরিচালন ব্যয় কমছে এবং প্রতিযোগিতার ধরনও বদলে যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বীমা খাতে এআই এখন শুধু একটি নতুন প্রযুক্তি নয়, বরং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এআই ব্যবহারে এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকসেবা, পরিচালন দক্ষতা এবং নতুন বীমা পণ্য উন্নয়নে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেতে পারে।

গত দুই দশকে বৈশ্বিক বীমা খাতের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে খাতটির আকার গড়ে বছরে ৪.৯ শতাংশ হারে বেড়ে প্রায় ৮.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে একই সময়ে মুনাফা বেড়েছে তুলনামূলক ধীরগতিতে, গড়ে ৪.৩ শতাংশ হারে। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে আয় বাড়লেও লাভের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যয় কমানো এবং দক্ষতা বাড়ানো এখন বীমা কোম্পানিগুলোর প্রধান অগ্রাধিকার। সেই লক্ষ্য অর্জনে এআইকে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ম্যাককিনসের বিশ্লেষণ বলছে, এআই ব্যবহার করে নতুন গ্রাহক যুক্ত করার খরচ ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যেতে পারে। একই সঙ্গে এজেন্টদের কাজের দক্ষতা ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কারণ এআই অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে অনেক নিয়মিত কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে।

বর্তমানে গ্রাহকের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ, পলিসি তুলনা, নবায়নের সময় মনে করিয়ে দেয়া, সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেয়া এবং নথিপত্র যাচাইয়ের মতো কাজ এআই করতে পারছে। এতে কর্মীদের সময় বাঁচছে। তারা জটিল দাবি নিষ্পত্তি, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং গ্রাহক পরামর্শের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেশি সময় দিতে পারছেন।

আন্ডাররাইটিংয়েও এআইয়ের প্রভাব বাড়ছে। আগে ঝুঁকি মূল্যায়নে বিপুল তথ্য হাতে বিশ্লেষণ করতে হতো। এখন এআই অল্প সময়ে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণ করতে পারছে। এতে প্রিমিয়াম নির্ধারণ আরও নির্ভুল হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্লেইম যাচাই দ্রুত হচ্ছে এবং জালিয়াতি শনাক্ত করাও সহজ হচ্ছে।

অনেকের প্রশ্ন, এআই কি ভবিষ্যতে বীমা এজেন্টদের জায়গা দখল করবে? অন্তত এখনই এমন সম্ভাবনা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। ম্যাককিনসির মতে, আগামী কয়েক বছরে এআই মানুষের বিকল্প নয়, বরং সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হবে। কারণ গ্রাহকের আর্থিক প্রয়োজন বোঝা, উপযুক্ত পরামর্শ দেয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যানও সেই চিত্রই তুলে ধরছে। দেশটিতে সম্পদ ও দুর্ঘটনা বীমার প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং লাইফ বীমার প্রায় ৯৫ শতাংশ এখনও এজেন্ট ও ব্রোকারদের মাধ্যমে বিক্রি হয়।

এআই নতুন ধরনের বীমা পণ্য তৈরির সুযোগও বাড়াচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বে সাইবার ক্ষতির এক শতাংশেরও কম বীমার আওতায় রয়েছে। এর ফলে প্রায় ৯০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সুরক্ষা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একইভাবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ক্ষতির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সুরক্ষা ঘাটতি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে এআই এসব ঝুঁকির মূল্য নির্ধারণ সহজ করতে পারে। এর ফলে সাইবার ঝুঁকি, জলবায়ুজনিত ক্ষতি এবং এআই ব্যবহারের কারণে তৈরি হওয়া ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন বীমা পণ্য চালুর সুযোগ বাড়বে।

তবে এআই ব্যবহারের সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। এআই ভুল সিদ্ধান্ত নিলে দায় কার হবে, ব্যক্তিগত তথ্য কতটা নিরাপদ থাকবে বা অ্যালগরিদম কতটা স্বচ্ছ হবে- এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই। পাশাপাশি বড় ধরনের সাইবার হামলায় একসঙ্গে বহু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের বীমা খাত এখনও ডিজিটাল রূপান্তরের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বলছে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্ডাররাইটিং, ক্লেইম ব্যবস্থাপনা এবং ডেটা বিশ্লেষণে এআইয়ের ব্যবহার বাড়াতে পারলে দেশের বীমা কোম্পানিগুলো আরও দ্রুত, নির্ভুল ও গ্রাহকবান্ধব সেবা দিতে পারবে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও ডেটা অবকাঠামোয় বিনিয়োগ ভবিষ্যতে বীমা কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।