‌
‌
‌
‌
‌
‌
‌
‌
‌

‌

ঘরবাড়ি-জীবিকার ক্ষতি, বীমার বাইরে সুন্দরবনের বহু পরিবার

প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৩ পিএম

রাজ কিরণ দাস: বীমার কথা জানেন বেলায়েত সরদার। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হারানোর পর সুন্দরবন-সংলগ্ন সাধারণ মানুষের পক্ষে বীমার সুবিধা পাওয়া সহজ নয়, এটাই তার অভিজ্ঞতা।

তার ভাষায়, স্থানীয় অনেক মানুষ বীমা সম্পর্কে জানলেও দুর্যোগের সময় এটি তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর ভরসা হয়ে উঠতে পারেনি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, খুলনার কয়রা ও দাকোপ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগরে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ বাস করেন। এসব উপজেলায় পরিবার রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার।

ঘূর্ণিঝড়ে এসব এলাকার মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল, মাছের ঘের, গবাদিপশু, নৌকা ও আয়ের পথ একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সাতক্ষীরার শিক্ষক মোহাম্মদ আরাবুজ্জামান বলেন, ২০০৯ সালের ২৫ মে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় আইলার সময় লোনা পানি ঢুকে অনেক এলাকার পানির উৎস নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ঘর মেরামতের পাশাপাশি খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জীবিকার ব্যবস্থাও নতুন করে করতে হয়।

২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়রা ও শ্যামনগরের ২৭০টি পরিবার নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, যেসব পরিবারের অন্তত একজন সদস্য জীবিকার জন্য অন্য এলাকায় গিয়েছিলেন, তাদের গড় আর্থিক ক্ষতি ছিল প্রায় ৩৪৫ মার্কিন ডলার। যেসব পরিবারের কোনো সদস্য স্থানান্তরিত হননি, তাদের গড় ক্ষতি ছিল প্রায় ২৮৮ ডলার। ঘরবাড়ি, কৃষি, মাছের ঘের, গবাদিপশু, যানবাহন ও ছোট ব্যবসায় এসব ক্ষতি হয়েছিল।

ক্ষতি সামলাতে প্রথম ধরনের পরিবারগুলোর ৪১ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ধরনের পরিবারগুলোর ৪৫ শতাংশ ঋণ বা ধার নিয়েছিল। একইভাবে যথাক্রমে ৩১ শতাংশ ও ২৫ শতাংশ পরিবার সম্পদ বিক্রি করেছিল। কেউ সঞ্চয়ের অর্থ ব্যবহার করেছে, আবার কেউ বিকল্প জীবিকার পথ খুঁজেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, এ ধরনের ব্যবস্থা সাময়িকভাবে সংকট সামলাতে সহায়তা করলেও বারবার দুর্যোগে পড়লে পরিবারের আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।

আইলার পর সরকার, এনজিও ও দাতা সংস্থাগুলো খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন, আশ্রয়, চিকিৎসা এবং কৃষি সহায়তা দিয়েছিল। তবে এসব সহায়তা পরিবারের মোট আর্থিক ক্ষতির কতটা পূরণ করেছিল, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব ওই গবেষণায় নেই।

কয়রা, দাকোপ ও শ্যামনগরের কত পরিবার বর্তমানে বীমার আওতায় রয়েছে, তার সমন্বিত প্রকাশ্য সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি। এসব এলাকার কত ঘরবাড়ি, মাছের ঘের, কৃষি, গবাদিপশু বা ছোট ব্যবসা বীমার সুরক্ষার বাইরে রয়েছে, সেই পূর্ণাঙ্গ তথ্যও প্রকাশিত নয়।

তবে ২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় বীমা থেকে দূরে থাকার একটি চিত্র পাওয়া যায়। কয়রা, শ্যামনগর ও মনিরামপুরের জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নআয়ের ৩১৮টি পরিবার নিয়ে করা ওই গবেষণায় জরিপে অংশ নেয়া পরিবারগুলোর কারও দুর্যোগের আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য বীমা কভারেজ ছিল না। গবেষণায় কয়রা ও শ্যামনগরের কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ ইউনিয়নের পরিবার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

গবেষকেরা বলছেন, নিম্ন আয় ও বিকল্প আয়ের সুযোগের অভাব এসব পরিবারের বীমা নেয়ার সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তবে এই গবেষণার ফলকে কয়রা, শ্যামনগর বা পুরো সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার সামগ্রিক বীমা-হার হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ গবেষণাটি নির্বাচিত ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নআয়ের পরিবারকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে বীমা অনুপ্রবেশের হার বা মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় মোট বীমা প্রিমিয়ামের অনুপাত ছিল ০.৩৪ শতাংশ।

একই বছরে জীবনবহির্ভূত বীমায় দাবির সংখ্যার হিসাবে নিষ্পত্তির হার ছিল ২৮.৫১ শতাংশ। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৩৩.৭৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, কম দাবি নিষ্পত্তির হার বীমাগ্রাহকের আস্থা ক্ষুণ্ন করে।

জীবনবহির্ভূত বীমার আওতায় অগ্নি, নৌ, মোটর ও অন্যান্য ধরনের সম্পদ ও ঝুঁকির বীমা রয়েছে।

দেশে কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশু ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকির জন্যও কিছু বীমা পণ্য রয়েছে। গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কৃষি, গবাদিপশু ও মৎস্য খাতের জন্য বিভিন্ন বীমা দিচ্ছে। ছোট মাছচাষিদের জন্য প্রতিষ্ঠানটির সূচকভিত্তিক ক্ষুদ্র বীমার পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের আওতায় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটও রয়েছে। ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্সেরও ঘূর্ণিঝড়জনিত ক্ষতির জন্য বীমা পণ্য রয়েছে।

তবে কয়রা, দাকোপ ও শ্যামনগরে এসব বীমার আওতায় বর্তমানে কত গ্রাহক রয়েছেন, তার সমন্বিত প্রকাশ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

সূচকভিত্তিক বা প্যারামেট্রিক বীমায় প্রতিটি ক্ষতি আলাদাভাবে যাচাই করার প্রয়োজন হয় না। আগে থেকে নির্ধারিত কোনো সূচক, যেমন পানির উচ্চতা, বৃষ্টিপাত বা অন্য কোনো আবহাওয়াগত পরিমাপ, নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছালে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা থাকে। কিছু কৃষি ও মৎস্য বীমায় মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমেও অর্থ পরিশোধ করা হয়।

তবে ভূমিহীন বা যাদের বাড়ি ও সম্পদের আনুষ্ঠানিক মালিকানার নথি নেই, তাদের সম্পদভিত্তিক বীমায় বড় পরিসরে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, সে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।

অন্যদিকে যমুনা নদীর বন্যাঝুঁকিতে থাকা গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও সিরাজগঞ্জে ২০২৬ সালে ১ লাখ ২২৯টি পরিবার বা প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষকে একটি সূচকভিত্তিক আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।

এ ব্যবস্থার একটি অংশ হলো প্যারামেট্রিক বন্যা বীমা। ২০২৬ সালের বন্যা মৌসুমের জন্য এতে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের কভারেজ রাখা হয়েছে। তুলনামূলক ছোট বন্যা এবং বীমার আওতার বাইরে থাকা কিছু ঝুঁকি মোকাবিলায় আলাদা কমিউনিটি প্রোটেকশন ফান্ডও রয়েছে।

একই সময়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) কম আয়, সুবিধাবঞ্চিত ও জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য একটি জাতীয় ক্ষুদ্র বীমা নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরির কাজ শুরু করেছে।

ক্ষুদ্র বীমা হলো কম আয়ের মানুষের জন্য তুলনামূলক কম খরচে ও সহজ শর্তে আর্থিক সুরক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা।

আইডিআরএ পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছে নতুন বিতরণব্যবস্থার মাধ্যমে বীমা পৌঁছানো এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে নতুন এই কাঠামোয় সুন্দরবন-সংলগ্ন মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষি, মাছের ঘের, গবাদিপশু, নৌকা কিংবা জীবিকা হারানোর ঝুঁকি কতটা এবং কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

যমুনার বন্যাঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য আগাম আর্থিক সুরক্ষার একটি কাঠামো চালু হয়েছে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা সুন্দরবন উপকূলের মানুষের জন্য একই ধরনের বৃহৎ পরিসরের ব্যবস্থার তথ্য এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

মন্তব্য সমূহ (০)

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

‌