আবদুর রহমান আবির: অবৈধভাবে উন্নয়ন ভাতা দিয়ে গ্রাহকের ৯০ কোটি ১০ লাখ টাকা খেয়ে ফেলেছে আলফা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। মাসিক ও ত্রৈমাসিক উন্নয়ন ভাতার নামে এই টাকা ফাইন্যান্সিয়াল এসোসিয়েট (এফএ), ইউনিট ম্যানেজার (ইউএম) ও ব্রাঞ্চ ম্যানেজার (বিএম)’দের দেয়া হয়েছে বলে সমাপনী হিসাবে উল্লেখ করেছে কোম্পানিটি।
বীমা আইন ২০১০ এর ৫৯(২) ধারায় বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি কোন বীমা এজেন্টকে বাংলাদেশে এবং ইস্যুকৃত এজেন্ট নিয়োগকারীর মাধ্যমে কার্যকর কোন লাইফ ইন্স্যুরেন্স পলিসির ক্ষেত্রে নির্ধারিত শতকরা হারের অধিক কমিশন বা অন্য কোন প্রকার পারিশ্রমিক বাবদ অর্থ পরিশোধ বা অর্থ পরিশোধের চুক্তি করবে না এবং কোন বীমা এজেন্ট নিয়োগকারী ও অনুরূপ অর্থ গ্রহণ বা অর্থ গ্রহণের চুক্তি করবে না৷
অর্থাৎ নির্ধারিত শতকরা হারের অধিক কমিশন যেমন দিতে পারবে না; তেমনি অন্য কোন নামেও কোন পারিশ্রমিক দিতে পারবে না এজেন্টদের।
অপরদিকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র সার্কুলার নং লাইফ-০৩(খ)/২০১২ অনুসারে, লাইফ বীমা কোম্পানিতে নির্ধারিত হারে কমিশন ও ইনসেন্টিভের বাইরে উন্নয়ন ভাতা বা অন্য কোন খাতে পারিশ্রমিক প্রদান করা অবৈধ।
বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো কোন খাতে কত টাকা খরচ করতে পারবে তা স্পষ্টভাবে আইনে বলে দেয়া হয়েছে। এসব খাতের বাইরে খরচ করার কোন সুযোগ নেই। সেটা যদি অনুমোদিত সীমার মধ্যেও হয় তবু তা বেআইনী। আইনের বাইরে গ্রাহকের প্রিমিয়ামের টাকা খরচ করা হলে তা গ্রাহকস্বার্থ ক্ষুন্ন করার সামিল।
এর ব্যাখ্যায় তারা বলেন, এসব টাকা খরচ না হলে কোম্পানির লাইফ ফান্ড বৃদ্ধি হতো এবং কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতাও বাড়ত। ফলে ভবিষ্যতে গ্রাহকদের বোনাসের হারও বাড়ত।
অবৈধ খরচের এই চিত্র উঠে এসেছে বীমা কোম্পানিটির ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের বর্ষ সমাপনী হিসাব পর্যালোচনায়, যা খোদ আইডিআরএ’র কাছেই জমা দেয়া হয়েছে। তবে কোম্পানিটির এমন অপরাধ নিয়ে কোন প্রশ্ন পর্যন্ত তোলেনি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ।
চার বছরে ৯০ কোটি টাকা লোপাটের খতিয়ান
অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘প্রথম বর্ষ মাসিক উন্নয়ন ভাতা (এফএ-বিএম)’ এবং ‘প্রথম বর্ষ ত্রৈমাসিক উন্নয়ন ভাতা (এফএ-বিএম)’ নামে দুটি বিশেষ খাত তৈরি করে উন্নয়ন কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা প্রদানের ‘সেলস পলিসি মেমোরেন্ডাম’ নামে অফিসিয়াল সার্কুলার জারি করে আলফা ইসলামী লাইফ। এসব সার্কুলারে স্বাক্ষর করেন বীমা কোম্পানিটির চেয়ারম্যান আলমগীর সামসুল আলামীন এবং মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নুরে আল সিদ্দিকী অভি।
সার্কুলারের তথ্য অনুসারে, একজন এফএ মাসে ২০ হাজার টাকা প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম সংগ্রহ করলে নির্ধারিত কমিশনের বাইরে ৫ হাজার টাকা উন্নয়ন ভাতা পাবেন। এই প্রিমিয়ামের পরিমাণ ২ লাখ টাকা হলে ২০ হাজার টাকা উন্নয়ন ভাতা প্রদান করা হয়। আর পরবর্তী প্রতি ২ লাখ টাকা প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামের জন্য দেয়া হয় ৯ হাজার টাকা মাসিক উন্নয়ন ভাতা।
এছাড়াও প্রতি ৩ মাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামের জন্য ফাইন্যান্সিয়াল এসোসিয়েটদের দেয়া হয় আরো ৭ হাজার টাকা ত্রৈমাসিক উন্নয়ন ভাতা। আর প্রতি ৩ মাসে প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামের পরিমাণ ১০ লাখ টাকার বেশি হলে ২৫ হাজার টাকা করে দেয়া হয় ত্রৈমাসিক উন্নয়ন ভাতা।
একইভাবে ইউনিট ম্যানেজার ও ব্রাঞ্চ ম্যানেজারদের দেয়া হয় মাসিক এবং ত্রৈমাসিক উন্নয়ন ভাতা। এসব উন্নয়ন ভাতা দেয়া হয় প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম আয়ের ওপর ভিত্তি করে এবং নির্ধারিত কমিশনের অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে। যা আইন অনুসারে সম্পূর্ণ অবৈধ।
৩১ ডিসেম্বরের তথ্য অনুসারে, উন্নয়ন কর্মীদের (এফএ-বিএম) নামে চার বছরে গ্রাহকের ৯০ কোটি ৯ লাখ ৯৬ হাজার ৮৮৪ টাকা টাকা খরচ করেছে আলফা ইসলামী লাইফ।
এর মধ্যে ২০২৪ সালেই কোম্পানিটি খরচ করেছে ১৯ কোটি ৫৯ লাখ ৪৩ হাজার ৯৭৫ টাকা; যার মধ্যে প্রথম বর্ষ মাসিক উন্নয়ন ভাতা (এফএ-বিএম) খাতে ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫৮ হাজার টাকা এবং প্রথম বর্ষ ত্রৈমাসিক উন্নয়ন ভাতা (এফএ-বিএম) খাতে ১ কোটি ৭৯ লাখ ৮৫ হাজার ৯৭৫ টাকা।
এর আগে ২০২৩ সালে অবৈধ এ খাত দুটিতে ৩২ কোটি ৮ লাখ ২ হাজার ৪৬৭ টাকা খরচ করে আলফা ইসলামী লাইফ। এর মধ্যে প্রথম বর্ষ মাসিক উন্নয়ন ভাতা (এফএ-বিএম) খাতে ২৮ কোটি ৩৫ লাখ ৯৬ হাজার ৮৩৭ টাকা এবং প্রথম বর্ষ ত্রৈমাসিক উন্নয়ন ভাতা (এফএ-বিএম) খাতে ৩ কোটি ৭২ লাখ ৫ হাজার ৬৩০ টাকা।
২০২২ সালেও কোম্পানিটি ২৬ কোটি ৯৪ লাখ ৪৪ হাজার ৬২১ টাকা খরচ করে ‘প্রথম বর্ষ মাসিক উন্নয়ন ভাতা (এফএ-বিএম)’ এবং ‘প্রথম বর্ষ ত্রৈমাসিক উন্নয়ন ভাতা (এফএ-বিএম)’ খাতে। একইভাবে ২০২১ সালেও কোম্পানিটি খাত দুটিতে খরচ করে ১১ কোটি ৪৮ লাখ ৫ হাজার ৮২১ টাকা।
অবৈধ খরচের বিষয়ে যা বলছে আলফা ইসলামী লাইফ
উত্থাপিত অনিয়মের বিষয়ে জানতে আলফা ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নূরে আলম ছিদ্দিকী অভির সাথে যোগাযোগ করা হলে, তিনি সরাসরি মন্তব্য না করে কোম্পানির এইচআরএ এন্ড এডমিন বিভাগের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এজেন্টদের উন্নয়ন ভাতা প্রদানের তথ্য আইডিআরএ’র কাছে দাখিল করা হয়েছে। তাই, যা জানার আইডিআরএ’র কাছ থেকে জানতে হবে। এ বিষয়ে কোম্পানির নিজস্ব কোন বক্তব্য নেই।
পদক্ষেপ নেবে আইডিআরএ
আইন লঙ্ঘন করে অবৈধ দুটি খাতে ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে কর্তৃপক্ষ।
একইসঙ্গে এমন গুরুতর অনিয়মের বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে নিয়ে আসার জন্য তিনি ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’কে আইডিআরএ’র পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানান।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।