কেন বীমা ছাড়া হলিউডে সিনেমা নির্মাণ প্রায় অসম্ভব

বিনোদন ডেস্ক: হলিউডের চলচ্চিত্র শিল্পে বীমা এখন শুধু একটি আর্থিক পণ্য নয়। এটি পুরো প্রযোজনা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বড় বাজেট, আন্তর্জাতিক লোকেশন, ব্যয়বহুল তারকা এবং জটিল স্টান্টের কারণে হলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাণে ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি। তাই অধিকাংশ বড় স্টুডিও ও বিনিয়োগকারী বীমা ছাড়া কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন করতে চায় না।
একটি বড় হলিউড সিনেমার একদিনের শুটিং ব্যয় কয়েক লাখ ডলার। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যয় ৫ লাখ ডলারও ছাড়িয়ে যায়। তাই খারাপ আবহাওয়া, দুর্ঘটনা, প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা প্রধান অভিনেতার অসুস্থতায় শুটিং বন্ধ হলে ক্ষতি দ্রুত কয়েক মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই ঝুঁকি কমাতে নির্মাতারা বিভিন্ন ধরনের বীমা কভারেজ নেন।
হলিউডে বিভিন্ন ধরনের বীমা ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে প্রোডাকশন, জেনারেল লায়াবিলিটি, ওয়ার্কার্স কম্পেনসেশন, ইকুইপমেন্ট, কাস্ট এবং এররস অ্যান্ড ওমিশনস (ইঅ্যান্ডও) ইন্স্যুরেন্স উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি বীমা নির্দিষ্ট ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
চলচ্চিত্র নির্মাণে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো প্রধান অভিনেতা, অভিনেত্রী বা পরিচালকের অনুপস্থিতি। অনেক সময় একটি সিনেমার পুরো সাফল্য নির্ভর করে একজন বা দুজন তারকার ওপর। তারা অসুস্থ হলে, দুর্ঘটনায় আহত হলে বা নির্ধারিত সময়ে কাজ করতে না পারলে শুটিং স্থগিত হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কাস্ট ইন্স্যুরেন্স। এই বীমা অতিরিক্ত শুটিং ব্যয়, লোকেশন খরচ, কর্মীদের অতিরিক্ত মজুরি এবং পুনঃতফসিলের ব্যয় বহনে সহায়তা করে। ফলে নির্মাতারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি থেকে সুরক্ষা পান।
বিশ্বখ্যাত অভিনেতা টম ক্রুজের মতো তারকাদের ক্ষেত্রে এই বীমা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারকা-নির্ভর প্রকল্পে শুটিং বিলম্ব মানেই বিপুল আর্থিক ক্ষতি।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় মিশন: ইম্পসিবল ৭-এর শুটিং একাধিকবার বন্ধ হয়ে যায়। কোভিড-১৯ সংক্রমণের একটি ঘটনার কারণে পুরো প্রযোজনা সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হয়েছিল। পরে টম ক্রুজ শুটিং সেটে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের পক্ষে অবস্থান নেন এবং নিয়ম ভঙ্গের ঘটনায় প্রকাশ্যে ক্ষোভও প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, স্টুডিও, প্রযোজক এবং বীমা কোম্পানিগুলো তাদের কাজ পর্যবেক্ষণ করছে। একটি শাটডাউন শুধু সিনেমার ক্ষতি করে না, এটি হাজারো মানুষের জীবিকাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা দেখিয়েছে যে আধুনিক চলচ্চিত্র শিল্পে বীমা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ঝুঁকি শুধু শুটিংয়ে সীমাবদ্ধ নয়। চলচ্চিত্র শিল্পে আইনি ঝুঁকিও বড় বিষয়। কপিরাইট লঙ্ঘন, মানহানি, গোপনীয়তা ভঙ্গ বা অনুমতি ছাড়া কারও বিষয়বস্তু ব্যবহারের অভিযোগে মামলা হতে পারে।
এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয় এররস অ্যান্ড ওমিশনস বা ইঅ্যান্ডও ইন্স্যুরেন্স। এই বীমা আইনি প্রতিরক্ষা ব্যয়, আদালত ব্যয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের খরচও বহন করে। তাই সিনেমা মুক্তির আগে অনেক স্টুডিও ও পরিবেশক ইঅ্যান্ডও বীমা বাধ্যতামূলক করে থাকে।
কোভিড-১৯ মহামারি চলচ্চিত্র বীমা খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি। মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার শুটিং বন্ধ হয়ে যায় এবং অসংখ্য চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রকল্প বিলম্বিত হয়। বীমা কোম্পানিগুলোকে বিপুল পরিমাণ দাবি মোকাবিলা করতে হয়।
এর পর থেকে মহামারি-সংক্রান্ত ঝুঁকি মূল্যায়নে বীমা কোম্পানিগুলো আরও কঠোর হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। সংক্রামক রোগ-সংক্রান্ত কভারেজ সীমিত করা হয়েছে অথবা আলাদা কাঠামোয় দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে হলিউডে দ্রুত বাড়তে থাকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার হামলা এবং জলবায়ু পরিবর্তন।
এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে অভিনেতাদের ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে কনটেন্টের মালিকানা, কপিরাইট ও ডিপফেক-সংক্রান্ত বিরোধ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন ধরনের বীমা প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে সাইবার হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে। শুটিং ফুটেজ চুরি, সম্পাদনার ফাইল নষ্ট হওয়া কিংবা মুক্তির আগেই সিনেমা ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঘটনা এখন বড় উদ্বেগ। র্যানসমওয়্যার হামলার ঝুঁকিও রয়েছে। এ কারণে সাইবার ইন্স্যুরেন্সের গুরুত্ব বাড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও চলচ্চিত্র শিল্পে পড়তে শুরু করেছে। দাবদাহ, বন আগুন, ঝড় ও বন্যার মতো ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আউটডোর শুটিং আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ফলে আবহাওয়াজনিত কভারেজের চাহিদাও বাড়ছে।
বীমা শিল্পের অন্যান্য খাতের মতো বিনোদন বীমা খাতেও প্রতারণামূলক দাবির ঝুঁকি রয়েছে। তবে হলিউডে বড় অঙ্কের কভারেজের কারণে দাবি যাচাই প্রক্রিয়া বেশ কঠোর। বীমা কোম্পানিগুলো সাধারণত মেডিকেল রিপোর্ট, আর্থিক নথি এবং স্বাধীন মূল্যায়নের মাধ্যমে দাবি যাচাই করে। তাই বড় ধরনের জাল দাবি সফল হওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় বহু চলচ্চিত্র ও টিভি প্রযোজনা বিলম্বিত হওয়ায় শত শত মিলিয়ন ডলারের বীমা দাবি উত্থাপিত হয়েছিল। মহামারি-সংক্রান্ত ব্যয়, শুটিং স্থগিতকরণ এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার খরচ ছিল এসব দাবির প্রধান অংশ।
মিশন: ইম্পসিবল – ডেড রেকনিং পার্ট ওয়ান-এর মতো বড় বাজেটের প্রকল্পগুলোও কোভিডজনিত বিলম্বের কারণে ব্যয় বৃদ্ধি দেখেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উৎপাদন বিলম্বের কারণে সিনেমাটির বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
এ ছাড়া যন্ত্রপাতি ক্ষতি, লোকেশন দুর্ঘটনা, স্টান্ট-সংক্রান্ত ঘটনা এবং ডিজিটাল ডেটা হারানোর মতো কারণেও নিয়মিত বীমা দাবি পরিশোধ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক চলচ্চিত্র শিল্পে বীমা ছাড়া কাজ করা প্রায় অসম্ভব। কারণ একটি বড় প্রকল্পে শত শত কর্মী, কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক লোকেশন এবং উচ্চমূল্যের তারকা জড়িত থাকেন। ফলে একটি মাত্র দুর্ঘটনা, আইনি বিরোধ বা শুটিং বিলম্ব পুরো প্রকল্পকে আর্থিক সংকটে ফেলতে পারে।
এ কারণেই আজকের হলিউডে বীমাকে শুধু সুরক্ষা নয়, বরং সফল চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হয়।



