ব্যাংক থেকে ই-কমার্স, দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাত এখন ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন পেমেন্ট, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং ক্লাউডভিত্তিক সেবার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এতে সেবা গ্রহণ সহজ হলেও একই সঙ্গে বাড়ছে সাইবার হামলা, তথ্য চুরি এবং ডিজিটাল জালিয়াতির ঝুঁকি।
নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংক থেকে ই-কমার্স, দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাত এখন ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন পেমেন্ট, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং ক্লাউডভিত্তিক সেবার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এতে সেবা গ্রহণ সহজ হলেও একই সঙ্গে বাড়ছে সাইবার হামলা, তথ্য চুরি এবং ডিজিটাল জালিয়াতির ঝুঁকি। ফলে বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে বাড়ছে সাইবার বীমার চাহিদা।
বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলা এখন বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। আগে সাইবার হামলাকে মূলত প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। একটি বড় সাইবার হামলা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কোনো প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকার ক্ষতির কারণ হতে পারে। এতে গ্রাহকের আস্থা কমে যায়। ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আইবিএমের ‘কস্ট অব আ ডেটা ব্রিচ রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, বিশ্বে একটি ডেটা ব্রিচের গড় ক্ষতি ৪ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৪ কোটি টাকার সমান। যুক্তরাষ্ট্রে এ ক্ষতির পরিমাণ ১০ দশমিক ২২ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১২৪ কোটি টাকা।
র্যানসমওয়্যার হামলা, তথ্য চুরি, আর্থিক জালিয়াতি এবং ডেটা ফাঁস এখন বিশ্বজুড়ে নিয়মিত ঘটনা। অনেক ক্ষেত্রে সাইবার আক্রমণের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এতে শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, গ্রাহক, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও ক্ষতির মুখে পড়ে।
এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি সাইবার বীমার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বড় ধরনের সাইবার ঘটনার পর আর্থিক ক্ষতি সামাল দেয়া, আইনি ব্যয় মোকাবিলা করা এবং দ্রুত কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে সাইবার বীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে সাইবার বীমার প্রিমিয়াম কিছুটা কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বীমা ও পুনর্বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ার ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম প্রিমিয়ামে কভারেজ পাচ্ছে। তবে আক্রমণের ধরন আরও জটিল হয়ে ওঠায় ভবিষ্যতে প্রিমিয়াম আবারও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে এ খাতের অন্যতম উদ্বেগ হলো বড় আকারের সমন্বিত সাইবার আক্রমণ। বিশেষ করে একই সময়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হলে ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। র্যানসমওয়্যার, রাষ্ট্র-সমর্থিত সাইবার কার্যক্রম এবং গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর হামলাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
নতুন করে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। ডিপফেইক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচয় জালিয়াতি, এআই-চালিত ফিশিং আক্রমণ, স্বয়ংক্রিয় ম্যালওয়্যার এবং ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ঘটনা বাড়ছে। আইবিএমের গবেষণায় দেখা গেছে, এআই-সম্পর্কিত নিরাপত্তা ঘটনার শিকার হওয়া প্রতিষ্ঠানের ৯৭ শতাংশের যথাযথ এআই অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল না। একই সঙ্গে ৬৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের কোনো এআই গভর্ন্যান্স নীতিমালাও ছিল না। ফলে ভবিষ্যতে এআই-সংশ্লিষ্ট ঝুঁকির জন্য বিশেষায়িত বীমা পণ্যের চাহিদা তৈরি হতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হলে বীমা কভারেজ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে অনেক বীমা কোম্পানি গ্রাহকদের কাছ থেকে মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন, ডেটা এনক্রিপশন, নিয়মিত ব্যাকআপ এবং নিরাপত্তা অডিটের প্রমাণ চায়। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে প্রিমিয়াম বেড়ে যেতে পারে, এমনকি বীমা আবেদনও বাতিল হতে পারে।
বাংলাদেশে সাইবার বীমা কার্যক্রম এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের কয়েকটি সাধারণ বীমা কোম্পানি এবং সাধারণ বীমা কর্পোরেশন সীমিত পরিসরে এ ধরনের কভারেজ সুবিধা দিয়ে থাকে। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এর ব্যবহার এখনও অনেক কম হলেও ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি খাত এবং বড় করপোরেট গ্রাহকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্সসহ কয়েকটি সাধারণ বীমা কোম্পানি আন্তর্জাতিক পুনর্বীমা অংশীদারদের সহায়তায় করপোরেট গ্রাহকদের জন্য সাইবার ঝুঁকি কভারেজের সুবিধা দিয়ে থাকে। এসব কভারেজ সাধারণত গ্রাহকের ঝুঁকির ধরন, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং ব্যবসার প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়।
সাইবার বীমার আওতায় সাধারণত ডেটা ফাঁস, হ্যাকিং, র্যানসমওয়্যার হামলা, ব্যবসা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতি, তথ্য পুনরুদ্ধার ব্যয়, সাইবার ঘটনার ফরেনসিক তদন্ত ব্যয়, গ্রাহককে অবহিত করার খরচ, আইনি ব্যয় এবং তৃতীয় পক্ষের ক্ষতিপূরণ দায় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। কিছু পলিসিতে সংকটকালীন জনসংযোগ ব্যয় এবং সাইবার চাঁদাবাজি মোকাবিলাসংক্রান্ত ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস), ই-কমার্স, টেলিযোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ও ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত থাকে। ফলে এসব খাত সাইবার অপরাধীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে সাইবার ঝুঁকির সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো ২০১৬ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি। ওই ঘটনায় প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় সাইবার আর্থিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সরকারি, আর্থিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য ফাঁস এবং সিস্টেমে অনুপ্রবেশের ঘটনাও ঘটেছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ প্রকাশ করা হয় না, তবু সংশ্লিষ্টদের মতে ডিজিটাল ঝুঁকিজনিত আর্থিক ক্ষতি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার ঝুঁকি এখন শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক ও আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। তাই প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে এ খাতের বিস্তারের পথে এখনও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সচেতনতার অভাব, নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি, দক্ষ জনবলের স্বল্পতা এবং সাইবার ঝুঁকি মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতা এর মধ্যে অন্যতম। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও সাইবার বীমাকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের অর্থনীতি হবে আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর ও তথ্যনির্ভর। তাই শুধু ফায়ারওয়াল বা অ্যান্টিভাইরাস দিয়ে সব ধরনের সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি আর্থিক সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। এ কারণেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সাইবার বীমা ধীরে ধীরে ব্যবসা সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হচ্ছে। আগামী দিনে বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মাঝারি আকারের ব্যবসাগুলোর মধ্যেও এ ধরনের বীমার ব্যবহার বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।