মাইনুল হক মিজি: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ সুরক্ষা ও শিল্প-বাণিজ্যের সম্প্রসারণে বীমা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে এ শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য দক্ষ জনশক্তি, পেশাগত দক্ষতা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য একটি স্বচ্ছ ও ন্যায্য বেতন কাঠামো প্রয়োজন।
মার্কেটিং কর্মকর্তাদের আয়ের অনিশ্চয়তা:
নন-লাইফ বীমায় নতুন ব্যবসা সংগ্রহ, করপোরেট গ্রাহক সৃষ্টি, গ্রাহকসম্পর্ক বজায় রাখা এবং প্রিমিয়াম আয় বৃদ্ধিতে মার্কেটিং কর্মকর্তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অথচ কিছু প্রতিষ্ঠানে তাঁদের নির্ধারিত মাসিক মূল বেতন নেই অথবা আয় সম্পূর্ণভাবে ব্যবসা সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল।
কমিশন ও কর্মদক্ষতাভিত্তিক প্রণোদনা ব্যবসা বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও তা নির্ধারিত মূল বেতনের বিকল্প হওয়া উচিত নয়। এ ধরনের অনিশ্চিত আয় কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
মেধাবী জনশক্তি আকর্ষণে বাধা:
ব্যাংক, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য করপোরেট খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বীমা শিল্পকে দক্ষ ও মেধাবী জনশক্তি আকর্ষণ করতে হয়। বেতন, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ ও কর্মজীবনের অগ্রগতির সুযোগ সুস্পষ্ট না হলে নতুন স্নাতকদের এ পেশায় আগ্রহ কমতে পারে। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ধরে রাখা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বীমা শিল্পে বেতন বৈষম্য কমাতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে:
বিভিন্ন পদ ও দায়িত্ব অনুযায়ী বাস্তবসম্মত ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ; একই পদে বেতনের পার্থক্যের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা ও দায়িত্বের ভিত্তিতে যৌক্তিক মানদণ্ড অনুসরণ; বর্ধিত দায়িত্ব ও পদমর্যাদার যথাযথ প্রতিফলন নিশ্চিত করা; মূল বেতনের পাশাপাশি স্বচ্ছ কমিশন ও কর্মদক্ষতাভিত্তিক প্রণোদনা চালু রাখা; নিয়মিত বেতন পর্যালোচনা: মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, শ্রমবাজার ও কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় বেতন কাঠামো পর্যালোচনা এবং আন্ডাররাইটিং, দাবি নিষ্পত্তি, পুনর্বীমা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ও গ্রাহকসেবায় পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা:
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) উচিত প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধানের আওতায় বীমা কোম্পানিগুলোর বেতননীতি পর্যালোচনা এবং একটি গ্রহণযোগ্য ন্যূনতম মানদণ্ড প্রণয়নের সম্ভাবনা বিবেচনা করা।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ), কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং মানবসম্পদ বিভাগ এ উদ্যোগে ভূমিকা রাখতে পারে। বেতননীতি প্রণয়নের সময় কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, প্রিমিয়াম আয়, পরিচালন ব্যয় ও কর্মীসংখ্যা বিবেচনা করা জরুরি। প্রয়োজনে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা:
বীমার আওতা বৃদ্ধি পেলে শিল্পায়ন, অবকাঠামো, আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন, জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে। এর ফলে আন্ডাররাইটিং, দাবি ব্যবস্থাপনা, পুনর্বীমা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, কমপ্লায়েন্স, তথ্যপ্রযুক্তি ও মার্কেটিংয়ে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বীমা ব্যবসার বৈধ ও টেকসই সম্প্রসারণ প্রিমিয়াম আয় এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। এর মাধ্যমে সরকারের কর ও অন্যান্য প্রযোজ্য রাজস্ব আহরণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের বীমা শিল্পে ন্যায্য ও স্বচ্ছ বেতন কাঠামো প্রতিষ্ঠা শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারিদের স্বার্থ রক্ষার বিষয় নয়; এটি দক্ষ জনশক্তি আকর্ষণ, অভিজ্ঞ কর্মী ধরে রাখা এবং পেশাগত মান উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
তাই আইডিআরএ, বিআইএ এবং বীমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগে একটি বাস্তবসম্মত বেতননীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বীমা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
লেখক: মাইনুল হক মিজি, এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স পিএলসি।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।