আইডিআরএ: সরকার ও নতুন চেয়ারম্যানের কাছে প্রত্যাশা

শিপন ভূঁইয়া: আধুনিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো বীমা। ব্যক্তি, পরিবার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে অপ্রত্যাশিত আর্থিক ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দিয়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বীমার পেনিট্রেশন এখনও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় গঠন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বীমা খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের বীমা শিল্পের সুশৃঙ্খল উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ, গ্রাহকের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং বীমা কোম্পানিগুলোর তদারকির উদ্দেশ্যে ২০১১ সালে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি বীমা খাতের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও শিল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি এবং জনগণের আস্থা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

আইডিআরএর সর্বশেষ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ড. এম আসলাম আলম। তিনি চলতি বছরের মার্চ মাসে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। সম্প্রতি সরকার আইডিআরএর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মীর নাদিয়া নিভিনকে নিয়োগ দিয়েছে। দেশ-বিদেশে তার পেশাগত অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তিনি গণতান্ত্রিক সুশাসন ও সংস্কার কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন। এছাড়া তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন বিশ্বের খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন এবং সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সর্বশেষ তিনি নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগকে ঘিরে বীমা খাতের অংশীজনদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের বীমা শিল্প এখনও নিম্ন বীমা পেনিট্রেশন, গ্রাহক আস্থার ঘাটতি, কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা, দাবি নিষ্পত্তি নিয়ে অভিযোগ এবং সুশাসনের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এসব সমস্যা দূর করতে কার্যকর ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ভূমিকা অপরিহার্য।

একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষমতার ওপর। অতীতেও আইডিআরএর নেতৃত্বে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিরা দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে বিভিন্ন সময়ে সংস্থাটির কার্যকারিতা, নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা এবং বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর কার্যকর নজরদারি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও সমালোচনা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে দাবি পরিশোধ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে অনেক গ্রাহকের অভিযোগ বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থাকে দুর্বল করেছে।

বাংলাদেশের বীমা শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী, কার্যকর এবং স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে আইডিআরএ গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইন প্রয়োগ এবং শিল্পের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করবে- এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট সবার।

একই সঙ্গে সরকারের কাছেও প্রত্যাশা থাকবে, আইডিআরএকে তার আইনগত দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। একটি শক্তিশালী ও কার্যকর আইডিআরএ কেবল বীমা খাতের উন্নয়নই ত্বরান্বিত করবে না, বরং দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

লেখক: কলামিস্ট (ইন্সুরেন্স সেক্টর)