স্বাস্থ্যবীমার শক্ত ভিত গড়ে তুলছে তাইওয়ান, বাংলাদেশ কি পিছিয়ে?

নিজস্ব প্রতিবেদক: চিকিৎসার খরচ বাড়ছে। জনসংখ্যায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বয়সজনিত রোগের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ও হৃদরোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে। একই সময়ে নতুন চিকিৎসা প্রযুক্তি ও ওষুধের ব্যবহার বাড়ায় স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশ যখন এই চাপ সামাল দিতে লড়াই করছে, তখন তাইওয়ান দেখাচ্ছে ভিন্ন একটি চিত্র।

২০২৫ সালে তাইওয়ানের জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা (ন্যাশনাল হেলথ ইন্স্যুরেন্স-এনএইচআই) তহবিল প্রায় ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে। একই সময়ে তহবিলটির সঞ্চিত রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬.৫৮ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, চলমান স্বাস্থ্য ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের ব্যয়ের জন্যও তহবিলটি সঞ্চয় বাড়াতে পেরেছে।

তাইওয়ানের জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তহবিলটির মোট প্রিমিয়াম আয় হয়েছে প্রায় ২৭.৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সুবিধা বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৬.৭ বিলিয়ন ডলার। চিকিৎসা ব্যয় বাড়লেও আয় ব্যয়ের চেয়ে বেশি থাকায় তহবিলটি উদ্বৃত্ত অবস্থানে রয়েছে।

গত কয়েক বছরে তহবিলটির আর্থিক ভিত্তিও শক্ত হয়েছে। ২০২৩ সালের শেষে এর রিজার্ভ ছিল প্রায় ৪.৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ৫.১৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫ সালের শেষে দাঁড়ায় ৬.৫৮ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, মাত্র দুই বছরে রিজার্ভ প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য ব্যয় মোকাবিলায় দেশটির আর্থিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

তবে এই অবস্থানে পৌঁছানো সহজ ছিল না। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০২০ ও ২০২১ সালে তাইওয়ানের স্বাস্থ্য বীমা তহবিল ঘাটতির মুখে পড়েছিল। পরে দেশটি প্রিমিয়াম কাঠামোতে পরিবর্তন আনে, ঝুঁকিভিত্তিক অর্থায়ন জোরদার করে, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা বাড়ায় এবং স্বাস্থ্য ব্যয়ের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করে। কয়েক বছরের মধ্যে তহবিলটি আবার উদ্বৃত্ত অবস্থায় ফিরে আসে। এটি দেখায়, একটি স্বাস্থ্যবীমা তহবিলের স্থিতিশীলতা শুধু অর্থের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না; নীতিগত ধারাবাহিকতা ও ব্যয় ব্যবস্থাপনাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

তাইওয়ানের প্রায় ৯৯.৯ শতাংশ জনগোষ্ঠী জাতীয় স্বাস্থ্যবীমার আওতায় রয়েছে। এর ফলে চিকিৎসা ব্যয়ের ঝুঁকি ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর এককভাবে পড়ে না; বরং তা পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি এখানেই।

রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনেও একটি বাস্তব কারণ রয়েছে। জনসংখ্যার বার্ধক্য বাড়লে চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা, নতুন ওষুধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য আরও বেশি অর্থের প্রয়োজন হয়। বড় রিজার্ভ তহবিল থাকলে এসব ব্যয় মোকাবিলায় অর্থায়নের সক্ষমতা তৈরি হয়। একই সঙ্গে মহামারি বা অন্য কোনো জনস্বাস্থ্য সংকট দেখা দিলে দ্রুত অর্থ বরাদ্দ দেয়ার সুযোগ থাকে।

প্রায় ২ কোটি ৩৫ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ। ২০২৫ সালে দেশটির বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ৩.৩৫ শতাংশ, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। উচ্চ কর্মসংস্থান এবং নিয়মিত আয়ভিত্তিক অর্থনীতি স্বাস্থ্যবীমা তহবিলে ধারাবাহিক প্রিমিয়াম প্রবাহ নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছে।

এবার বাংলাদেশের দিকে তাকানো যাক।

প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বাড়ছে। অর্থনীতির আকারও বাড়ছে। তবে স্বাস্থ্য অর্থায়নের বড় অংশ এখনো ব্যক্তি পর্যায়ের ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি, সেবা খাত ও প্রবাসী আয় হলেও স্বাস্থ্যবীমা এখনো সার্বজনীন ব্যবস্থায় রূপ নেয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশের বেশি এখনো জনগণকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়। বিভিন্ন গবেষণায় এ হার প্রায় ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উচ্চ হার। এর অর্থ হলো, অসুস্থতা শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি পরিবারের জন্য আর্থিক সমস্যাও তৈরি করে।

চিকিৎসার খরচ মেটাতে অনেক পরিবার সঞ্চয় ভাঙে, ঋণ নেয় কিংবা সম্পদ বিক্রি করে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয় পরিবারকে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে ফেলে। অন্যদিকে দেশে স্বাস্থ্যবীমার আওতা এখনো সীমিত। ফলে অধিকাংশ মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসা ব্যয়ের ঝুঁকি নিজেরাই বহন করেন।

এখানেই বাংলাদেশের জন্য তাইওয়ানের অভিজ্ঞতা তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটির অভিজ্ঞতা দেখায়, স্বাস্থ্যবীমা শুধু চিকিৎসার বিল পরিশোধের একটি ব্যবস্থা নয়। এটি এমন একটি অর্থায়ন কাঠামো, যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ একই তহবিলের মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি ভাগাভাগি করে। এতে ব্যক্তি পর্যায়ের আর্থিক চাপ কমে, স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ে এবং বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাও তৈরি হয়।

তাইওয়ানের অভিজ্ঞতা আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করে। স্বাস্থ্যবীমার সফলতা শুধু বেশি অর্থ বরাদ্দের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য বিস্তৃত জনগোষ্ঠীকে একই ঝুঁকি ভাগাভাগির কাঠামোর আওতায় আনা, নিয়মিত প্রিমিয়াম প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি তাই কেবল নতুন কোনো স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্প চালুর নয়। প্রশ্ন হলো, স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়তে থাকলে এবং জনসংখ্যার গঠন পরিবর্তিত হলে সেই চাপ মোকাবিলার জন্য দেশটি কী ধরনের অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

তাইওয়ানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, স্বাস্থ্যবীমা শুধু স্বাস্থ্য খাতের একটি কর্মসূচি নয়; এটি মানুষের আর্থিক সুরক্ষা, শ্রম উৎপাদনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় যখন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, তখন বাংলাদেশের জন্যও স্বাস্থ্যবীমাকে আর কেবল একটি বিকল্প উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে।