বাংলাদেশের বীমায় ২০১৩ সাল: এক আনুস হরিবিলিস

শিপন ভূঁইয়া: আনুস হরিবিলিস (Annus Horribilis) একটি ল্যাটিন শব্দগুচ্ছ, যার আভিধানিক অর্থ ‘ভয়াবহ বছর’ বা ‘দুর্যোগপূর্ণ বছর’। এটি সাধারণত এমন একটি বছরকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক, হতাশাজনক বা নানা বিপর্যয়ে পরিপূর্ণ।

১৯৯২ সালে এক ভাষণে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁর রাজপরিবারকে ঘিরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সংকট ও বিতর্কের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে এই শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। এরপর থেকে ‘আনুস হরিবিলিস’ শব্দগুচ্ছটি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা খাতের জন্য বিশেষভাবে কঠিন ও সংকটময় সময়কে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশের বীমা খাতের ক্ষেত্রে ২০১৩ সালকে অনেকেই একটি ‘আনুস হরিবিলিস’ হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণ ওই বছর একসঙ্গে ১৩টি নতুন লাইফ বীমা কোম্পানিকে ব্যবসার অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। সে সময় সিদ্ধান্তটি নিয়ে বীমা খাতে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়, যা এখনো বিভিন্ন মহলে আলোচনার বিষয়।

‘আনলাকি থার্টিন’ বা অশুভ ১৩ সংখ্যাকে ঘিরেও পশ্চিমা বিশ্বে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে। ধারণা করা হয়, এর উৎস পবিত্র বাইবেলে বর্ণিত শেষ নৈশভোজের ঘটনা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন যিশুখ্রিস্ট এবং তার অনুসারীরা। তাদেরই একজন জুডাস পরবর্তীতে যিশুখ্রিস্টকে রোমানদের হাতে তুলে দেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সেই নৈশভোজে ১৩তম আসনে জুডাস বসেছিলেন। সেখান থেকেই ১৩ সংখ্যাকে ঘিরে অশুভ ধারণার প্রচলন ঘটে।

বাংলাদেশের বীমা খাতের ক্ষেত্রে ২০১৩ সালকে অনেকেই প্রতীকী অর্থে এমন একটি ‘আনলাকি থার্টিন’ হিসেবে দেখেন, যা খাতটির দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ককে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছিল।

১৯৯০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে নিবন্ধিত বীমা প্রতিষ্ঠানের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি অনুমোদন পেয়েছে বিগত সরকারের আমলে। ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে ৭২টি বীমা প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে।

বর্তমানে দেশে ৮২টি বীমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের মতে, দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বাজারের আকার বিবেচনায় এত সংখ্যক বীমা কোম্পানির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশে একটি লাইফ বীমা কোম্পানির ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি টাকা এবং একটি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে ৪০ কোটি টাকা। একই সঙ্গে কোম্পানির মোট পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ৬০ শতাংশ উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের যৌথভাবে ধারণ করতে হয়। সে হিসাবে একটি লাইফ বীমা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোক্তাদের ন্যূনতম ১৮ কোটি টাকার অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয়।

আইডিআরএ ২০১৩ সালে জীবন বীমার সলভেন্সি মার্জিন রেগুলেশনের খসড়া প্রকাশ করেছিল। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অথচ এই বিধিমালা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা ও দায় পরিশোধের সামর্থ্য যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সলভেন্সি মার্জিন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

আনুস হরিবিলিস বা আনলাকি থার্টিন, যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, বাংলাদেশের বীমা খাত এখনো নানা কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই কোম্পানির সংখ্যা, আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন এবং কার্যকর তদারকির বিষয়গুলো নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সময়োপযোগী সংস্কার ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশের বীমা খাত আরও টেকসই ও আস্থাশীল অবস্থানে পৌঁছাবে, এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট সবার।

লেখক: কলামিস্ট (ইন্সুরেন্স সেক্টর)