মৃত্যুফাঁদে বাংলাদেশের জলপথ, বীমার বাইরে অধিকাংশ যাত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। প্রায় ৭০০ নদী, খাল ও জলপথের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নদী, খাল ও জলপথ মিলিয়ে প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার জলপথ রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথ চলাচলের উপযোগী থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে তা কমে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কিলোমিটারে নেমে আসে। দেশের মোট যাত্রী পরিবহনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবং বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন এখনো নৌপথনির্ভর।

কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথই প্রতি বছর শত শত মানুষের প্রাণহানি, বিপুল সম্পদহানি এবং অসংখ্য পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নৌ-দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ যাত্রী, নাবিক কিংবা ব্যবসায়ী কার্যকর কোনো বীমা সুরক্ষার আওতায় নেই। ফলে দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে তাদের ভাগ্যে জোটে অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং আর্থিক দুর্ভোগ।

বাড়ছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে প্রাণহানি

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ১২৭টি নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৫৮ জন নিহত, ১৩৯ জন আহত এবং ৩৮ জন নিখোঁজ হয়েছেন। দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে লঞ্চডুবি, ট্রলারডুবি, কার্গো জাহাজের সংঘর্ষ, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং প্রতিকূল আবহাওয়াজনিত ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য।

অন্যদিকে নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন নদী ও জলাশয় থেকে ৫৪১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এসব মৃত্যুর সবগুলো নৌ-দুর্ঘটনাজনিত নয়; এর মধ্যে হত্যা, আত্মহত্যা, ডুবে মৃত্যু এবং অন্যান্য ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তা সত্ত্বেও এই পরিসংখ্যান দেশের জলপথ নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের নৌ-দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মানবিক ভুল, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, নৌযানের স্থিতিশীলতা হারানো, বৈরী আবহাওয়া, নাব্যতা সংকট এবং দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা। একটি গবেষণায় ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সময়কালের ৬৭টি বড় যাত্রীবাহী নৌ-দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় ৫৬ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ছিল মানবিক ভুলজনিত সংঘর্ষ এবং প্রায় ২১ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে ঝড় ও স্থিতিশীলতা হারানোর কারণে।

২০২৬ সালেও একই চিত্র

নৌপথে নিরাপত্তা সংকট যে এখনো কাটেনি, তার প্রমাণ মিলেছে ২০২৬ সালেও। গত ১৮ মার্চ রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকায় দুটি লঞ্চের সংঘর্ষে একটি ছোট নৌকা চাপা পড়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় একজন নিহত হন, কয়েকজন আহত হন এবং কয়েকজন নিখোঁজ হন। দুর্ঘটনার পর সরকার ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং সংশ্লিষ্ট লঞ্চগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়।

তবে এই দুর্ঘটনা আবারও একটি পুরোনো প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে, নিহত ও আহত যাত্রীদের জন্য কার্যকর বীমা সুরক্ষা কোথায়? দুর্ঘটনার পর সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেয়া হলেও কোনো বাধ্যতামূলক যাত্রী বীমা কাঠামোর আওতায় স্বয়ংক্রিয় ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে এখনো দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও সীমিত সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি

নৌপথ শুধু যাত্রী পরিবহনের মাধ্যম নয়; এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাও। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের নৌপথে বছরে প্রায় ১৯৪ মিলিয়ন টন পণ্য পরিবহন করা হয়।

প্রতিবছর বড় ধরনের লঞ্চডুবি, কার্গো জাহাজ দুর্ঘটনা, পণ্যবাহী ট্রলারডুবি এবং সংঘর্ষের ঘটনায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ নদীগর্ভে হারিয়ে যায়। কৃষিপণ্য, মাছ, নির্মাণসামগ্রী, ভোগ্যপণ্য ও শিল্পকারখানার কাঁচামালসহ নানা ধরনের পণ্য নদীতে তলিয়ে যায়, যার বড় অংশই আর উদ্ধার করা সম্ভব হয় না।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি মিলিয়ে প্রতি বছর নৌ-খাতে শত কোটি টাকারও বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। কিন্তু এর বড় অংশই কোনো বীমা সুরক্ষার আওতায় না থাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের নিজেদেরই বহন করতে হয়।

বীমা সুরক্ষার বাইরে অধিকাংশ যাত্রী

বাংলাদেশে মোটরযানের ক্ষেত্রে বীমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা থাকলেও নৌ-যাত্রীদের জন্য কার্যকর বাধ্যতামূলক বীমা ব্যবস্থা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বর্তমানে অধিকাংশ যাত্রীবাহী লঞ্চের টিকিটের সঙ্গে কোনো স্বয়ংক্রিয় যাত্রী বীমা যুক্ত নেই। ফলে দুর্ঘটনায় নিহত বা আহত যাত্রীরা সাধারণত সরকারি অনুদান অথবা মালিকপক্ষের সীমিত সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। বীমা কোম্পানির কাছ থেকে নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।

বীমা খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ব্যাংক ঋণ বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু পণ্য চালানে বীমা করা হলেও দেশের অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ নৌপথে পরিবহন হওয়া পণ্য ও যাত্রী এখনো বীমা সুরক্ষার বাইরে রয়েছে।

কেন মিলছে না ক্ষতিপূরণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, নৌ-দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে।

প্রথমত, অধিকাংশ নৌযানের জন্য যাত্রী দায়বদ্ধতা বীমা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করা হয়নি।

দ্বিতীয়ত, নৌযানের ফিটনেস, নিবন্ধন ও বীমা সংক্রান্ত নিয়ম বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বলতা রয়েছে।

তৃতীয়ত, অনেক ছোট নৌযান ও ট্রলার অনিবন্ধিত অবস্থায় চলাচল করে, ফলে তারা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা বা বীমা কাঠামোর আওতায় আসে না।

চতুর্থত, দুর্ঘটনার পর দাবি নিষ্পত্তির জন্য কোনো সমন্বিত ও দ্রুতগতির নৌ-বীমা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নিম্নআয়ের মানুষ

নৌ-দুর্ঘটনায় নিহতদের বড় অংশই জেলে, কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে বা পঙ্গু হলে পুরো পরিবার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে পড়ে। অন্যদিকে কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পণ্যবাহী ট্রলার ডুবে গেলে বহু বছরের সঞ্চিত পুঁজি এক মুহূর্তে হারিয়ে যেতে পারে।

বীমা না থাকায় এসব ক্ষতির ভার সরাসরি পরিবার ও ব্যবসায়ীদের কাঁধেই এসে পড়ে।

বিশ্ব কী করছে

বিশ্বের অনেক দেশেই নৌ-যাত্রীদের সুরক্ষায় বাধ্যতামূলক বীমা ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

ভারত, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে যাত্রীবাহী নৌযানের টিকিটের সঙ্গে ক্ষুদ্র পরিমাণ বীমা প্রিমিয়াম যুক্ত থাকে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বীমা কোম্পানির মাধ্যমে যাত্রী বা তার পরিবারকে প্রদান করা হয়।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) এবং বিভিন্ন দেশের নৌ-আইন যাত্রী দায়বদ্ধতা বীমা, তৃতীয় পক্ষ দায়বদ্ধতা বীমা এবং কার্গো বীমাকে নিরাপদ নৌ-পরিবহনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।

বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা

বিশেষজ্ঞদের মতে, নৌ-যাত্রী বীমা বাংলাদেশের বীমা শিল্পের জন্য একটি বড় সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।

প্রতিদিন লাখো মানুষ নৌপথ ব্যবহার করেন। টিকিটপ্রতি মাত্র ১ থেকে ২ টাকা অতিরিক্ত প্রিমিয়াম যুক্ত করলেও একটি জাতীয় যাত্রী বীমা তহবিল গঠন করা সম্ভব। এতে দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার দ্রুত আর্থিক সহায়তা পেতে পারে।

একই সঙ্গে কার্গো, ট্রলার, মাছ ধরার নৌযান এবং অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের জন্য বিশেষায়িত মেরিন বীমা সম্প্রসারণ করা গেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

যা করা প্রয়োজন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাত্রী বীমা ছাড়া কোনো যাত্রীবাহী নৌযানের রুট পারমিট ও ফিটনেস নবায়ন না করা, টিকিটের সঙ্গে বাধ্যতামূলক মাইক্রো-ইন্স্যুরেন্স যুক্ত করা, ডিজিটাল টিকিটিং ও যাত্রী নিবন্ধন চালু করা এবং নৌপরিবহন অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ ও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

একইসঙ্গে ফিটনেসবিহীন ও অনিবন্ধিত নৌযানের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান, নাবিকদের প্রশিক্ষণ এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী দ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নৌপথের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু পর্যাপ্ত বীমা সুরক্ষা ছাড়া এই খাতের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। ২০২৫ সালের ১২৭টি নৌ-দুর্ঘটনা এবং ২০২৬ সালের সদরঘাট দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে শুধু তদন্ত কমিটি গঠন বা সাময়িক অনুদান দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

নৌপথ ব্যবহারকারী প্রতিটি যাত্রী এবং পরিবাহিত প্রতিটি পণ্যের জন্য ন্যূনতম বীমা সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে হাজারো পরিবার আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে। একই সঙ্গে দেশের নৌ-পরিবহন খাত আরও নিরাপদ, আধুনিক ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। এ জন্য এখনই একটি আধুনিক, বাধ্যতামূলক ও কার্যকর নৌ-যাত্রী এবং মেরিন বীমা কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সময়ের দাবি।