বন্যার পর ত্রাণ নয়, প্রয়োজন আর্থিক সুরক্ষা: বাংলাদেশে দুর্যোগ বীমার বড় ঘাটতি

প্রকাশিত: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪২ পিএম

রাজ কিরণ দাস: বন্যার পানি নেমে গেলে কি দুর্যোগ শেষ হয়ে যায়? বাস্তবতা হলো, অনেক পরিবারের জন্য তখনই শুরু হয় সবচেয়ে কঠিন সময়। ভেসে যাওয়া ঘর, নষ্ট হওয়া আসবাবপত্র, হারানো ফসল আর বন্ধ হয়ে যাওয়া জীবিকা আবার নতুন করে গড়ে তোলার সংগ্রাম শুরু হয়।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভয়াবহ বন্যা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু মানুষের জীবন ও ঘরবাড়ির ক্ষতি করে না; এটি ধ্বংস করে তাদের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সম্পদ ও আর্থিক নিরাপত্তা।

টানা মৌসুমি বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট এই বন্যায় ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। পাহাড়ি জেলাগুলোতে ভূমিধস ও আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। কোমর-সমান পানিতে দাঁড়িয়ে সাকিও মারমা নিজের ডুবে যাওয়া বাড়ির চারপাশের কাদা পরিষ্কার করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, জিনু বড়ুয়া ফিরে দেখেছেন, বন্যার পানিতে তার ঘরের প্রায় সব জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে।

এই দুটি ঘটনা শুধু দুটি পরিবারের কষ্ট নয়; এটি বাংলাদেশের হাজারো মানুষের আর্থিক ঝুঁকির প্রতিচ্ছবি। কারণ দুর্যোগের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ আবার কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে? সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা বন্যার সময় খাবার, পানি, ওষুধ, আশ্রয় এবং জরুরি সহায়তা দেয়। কিন্তু একটি পরিবারকে আবার ঘর তৈরি করা, কৃষিকাজ শুরু করা কিংবা ব্যবসা চালু করার জন্য প্রয়োজন হয় বড় অঙ্কের অর্থ।

এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি সামাল দেয়ার জন্য প্রয়োজন এমন একটি আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে দুর্যোগের পর মানুষ দ্রুত সহায়তা পেতে পারে। আর এখানেই সামনে আসে দুর্যোগ বীমার প্রয়োজনীয়তা।

একটি বড় বন্যায় মানুষের ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে হারিয়ে যায় আসবাবপত্র, কৃষি সরঞ্জাম, গবাদিপশু এবং ব্যবসার পুঁজি। একজন কৃষকের ফসল নষ্ট হলে শুধু একটি মৌসুমের আয় হারায় না, বরং পরবর্তী চাষাবাদও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ছোট ব্যবসায়ীর দোকান বা পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে আবার নতুন করে শুরু করতে হয়।

অনেক পরিবার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের খরচ সামলাতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়। ফলে একটি বড় দুর্যোগ শুধু বর্তমান আয় কমায় না, ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পূর্বাঞ্চলের আকস্মিক বন্যায় প্রায় ৫৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই বন্যায় প্রায় ৩ লাখ ৩৯ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ও কৃষি খাতে সরাসরি আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৬৭ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার হিসেবে অনুমান করা হয়।

দুর্যোগের সময় সরকারি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম মানুষের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় প্রশাসন এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, নগদ সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হয়।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রাণ একটি পরিবারের তাৎক্ষণিক সমস্যা কমাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি পূরণ করতে পারে না। একটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ঘর পুনর্নির্মাণ, কৃষি সরঞ্জাম কেনা, গবাদিপশু ফিরিয়ে আনা বা ব্যবসা আবার শুরু করার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তা।

এই জায়গাতেই দুর্যোগ বীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতির মুখে পড়ে। কিন্তু এই ঝুঁকির তুলনায় দেশের বীমা সুরক্ষা এখনো খুব সীমিত।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বীমা গ্রহণের হার এখনো ১ শতাংশের নিচে। ফলে দেশের বড় একটি অংশ এখনো কোনো ধরনের বীমা সুরক্ষার আওতায় নেই।

বিশেষ করে বাড়িঘরের বন্যা বীমা, কৃষি বীমা, ক্ষুদ্র ব্যবসার দুর্যোগ বীমা এবং গবাদিপশু বীমার ব্যবহার এখনো খুব কম। ফলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে অধিকাংশ মানুষকে নিজেদের সঞ্চয়, ঋণ অথবা সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়।

বন্যায় সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষকরা। একটি মৌসুমের ফসল নষ্ট হলে শুধু আয় কমে না, বরং পরবর্তী চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষকদের সুরক্ষায় আবহাওয়া সূচকভিত্তিক বীমা চালু রয়েছে। নির্দিষ্ট মাত্রার বৃষ্টি, খরা বা বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়।

বাংলাদেশেও এ ধরনের কৃষি বীমার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। ধান, সবজি, মৎস্য এবং গবাদিপশুর মতো খাতে সহজ শর্তের বীমা চালু করা গেলে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা লাখো কৃষক উপকৃত হতে পারেন।

বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে প্যারামেট্রিক বীমা একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। এই ব্যবস্থায় ক্ষতির প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করার পরিবর্তে আগে থেকে নির্ধারিত কিছু তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত অর্থ দেয়া হয়।

যেমন, কোনো এলাকায় নদীর পানি নির্দিষ্ট সীমার ওপরে উঠলে বা নির্দিষ্ট পরিমাণ বৃষ্টি হলে দ্রুত বীমার অর্থ দেয়া সম্ভব। এতে দীর্ঘ দাবি যাচাই প্রক্রিয়া কমে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়।

যুক্তরাষ্ট্রে ন্যাশনাল ফ্লাড ইন্স্যুরেন্স প্রোগ্রাম (এনএফআইপি)-এর মাধ্যমে বন্যাপ্রবণ এলাকার বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সুরক্ষা দেয়া হয়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষ বন্যার পর সম্পদের ক্ষতি সামাল দিতে আর্থিক সহায়তা পায়।

ভারতে প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা-এর মাধ্যমে কৃষকদের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ফসল ক্ষতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। জাপানে সরকার ও বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করে বড় দুর্যোগের আর্থিক চাপ কমানোর ব্যবস্থা তৈরি করেছে।

এসব দেশের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকায়।

বড় ধরনের বন্যা বা জলবায়ু দুর্যোগে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে। তাই শুধু স্থানীয় বীমা কোম্পানির পক্ষে সব ঝুঁকি বহন করা কঠিন।

এক্ষেত্রে পুনর্বীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে স্থানীয় বীমা কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঝুঁকি ভাগ করে নেয়। ফলে বড় দুর্যোগের সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার সক্ষমতা বাড়ে এবং পুরো বীমা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশে একটি জাতীয় জলবায়ু ঝুঁকি বীমা কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে দুর্যোগ ঝুঁকির তথ্যভান্ডার তৈরি, কম খরচের মাইক্রো-ইন্স্যুরেন্স চালু, কৃষি ও সম্পদ বীমার বিস্তার এবং দ্রুত দাবি নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব।

সরকার, বীমা কোম্পানি, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশে এমন একটি বীমা কাঠামো তৈরি করা সম্ভব, যা দুর্যোগের পর মানুষকে শুধু সহায়তা নয়, দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগও দেবে।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।