নদী নেয় ঘর, বন্যা নেয় সঞ্চয়- দুর্যোগের পর মানুষের পাশে থাকবে কে?

প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম

রাজ কিরণ দাস: বাংলাদেশে বন্যা এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি লাখো মানুষের জন্য বড় আর্থিক ঝুঁকির নাম। নদীর পানি বাড়লে ডুবে যায় ঘরবাড়ি, নদী ভাঙনে হারিয়ে যায় বসতভিটা। নষ্ট হয় ফসল, ক্ষতিগ্রস্ত হয় গবাদিপশু, বন্ধ হয়ে যায় ছোট ব্যবসা।

কিন্তু পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, আবার শুরু করবেন কীভাবে?

কারণ বন্যার ক্ষতি শুধু কয়েক দিনের দুর্ভোগ তৈরি করে না; এটি একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয়, সম্পদ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করে। অথচ বাংলাদেশে বন্যা ও জলবায়ু ঝুঁকির জন্য কার্যকর বীমা সুরক্ষা এখনো সীমিত। ফলে দুর্যোগের পর অনেক মানুষকে নির্ভর করতে হয় ত্রাণ, ঋণ কিংবা আত্মীয়স্বজনের সহায়তার ওপর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় শুধু ত্রাণ ও পুনর্বাসন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, যা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করবে। এই জায়গায় বন্যা বীমা ও জলবায়ু ঝুঁকি বীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কুড়িগ্রামসহ ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে বন্যার দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকি

বাংলাদেশের নদী তীরবর্তী মানুষের জীবন দীর্ঘদিন ধরে বন্যার ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ প্রায় প্রতিবছর বন্যার ক্ষতির মুখে পড়ে।

২০২৬ সালের বর্ষা মৌসুমেও দেশের কয়েকটি এলাকায় বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কয়েকটি নদী অববাহিকা ও নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন নদীর পানি পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে সংস্থাটি।

উত্তরাঞ্চলেও ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমারসহ কয়েকটি নদীর পানি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ নতুন করে দুর্ভোগের আশঙ্কায় রয়েছে। পানিবন্দি মানুষের পাশাপাশি অনেক পরিবার ঘরবাড়ি, গবাদিপশু ও কৃষি সম্পদের ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ে। এসব ক্ষতি সামাল দেয়ার মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সুরক্ষা না থাকায় তাদের পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র নদীর পানি বৃদ্ধি, সম্ভাব্য প্লাবন ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বিষয়ে নিয়মিত আগাম তথ্য প্রদান করে।

বন্যার আর্থিক আঘাত: হারানো সম্পদ ও অনিশ্চিত জীবিকা

বন্যার সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। কারণ তাদের অধিকাংশের সম্পদ বলতে থাকে একটি কাঁচা ঘর, কিছু কৃষিজমি, কয়েকটি গবাদিপশু কিংবা ছোট একটি ব্যবসা। একটি বড় বন্যা এসব মানুষের জীবনের প্রধান অবলম্বনগুলো কেড়ে নেয়।

একজন কৃষকের জন্য বন্যা মানে শুধু জমির ফসল নষ্ট হওয়া নয়; এর অর্থ হলো পরবর্তী মৌসুমের জন্য বীজ, সার ও কৃষিকাজের অর্থ হারানো। একজন দিনমজুরের জন্য বন্যা মানে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোকান, পণ্য ও মূলধন ক্ষতিগ্রস্ত হলে আবার নতুন করে শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে নদী ভাঙনের শিকার মানুষের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বন্যার পানি কমে গেলেও অনেক পরিবার আর তাদের পুরোনো বসতভিটায় ফিরতে পারে না। নদী তাদের জমি, ঘরবাড়ি ও পরিচিত জীবনযাত্রা কেড়ে নেয়। ফলে তারা দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে পড়ে।

বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে, কিন্তু বীমা সুরক্ষা এখনো অপ্রতুল

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হলেও দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলায় বীমার ব্যবহার এখনো সীমিত। দেশের জিডিপির তুলনায় বীমা খাতের অবদান বা বীমার বিস্তার হার এখনো ১ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতিতে বীমার অংশগ্রহণ কম এবং সাধারণ মানুষের বড় অংশ এখনো বীমার আওতার বাইরে।

এর অন্যতম কারণ হলো বীমা সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি, গ্রামীণ এলাকায় বীমা সেবা পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতা, নিম্নআয়ের মানুষের প্রিমিয়াম দেয়ার সক্ষমতার অভাব এবং দুর্যোগভিত্তিক বিশেষ বীমা ব্যবস্থার সীমিত সুযোগ।

ফলে যেসব মানুষ সবচেয়ে বেশি বন্যার ঝুঁকিতে থাকে, তারাই সবচেয়ে কম আর্থিক সুরক্ষা পায়। দুর্যোগের পর ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অনেক পরিবারকে উচ্চ সুদের ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয় অথবা নিজেদের শেষ সম্বল বিক্রি করতে হয়।

কৃষি ও সম্পদ বীমায় প্রয়োজন নতুন উদ্যোগ

বাংলাদেশে কৃষি বীমা, ফসল বীমা ও সম্পদ বীমার সুযোগ থাকলেও তা এখনো ব্যাপকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। বন্যার মতো বড় দুর্যোগে সাধারণ মানুষের প্রয়োজন এমন বীমা ব্যবস্থা, যেখানে কম প্রিমিয়ামে সুরক্ষা পাওয়া যাবে এবং ক্ষতির পর দ্রুত অর্থ সহায়তা মিলবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বন্যা ঝুঁকির জন্য এমন বীমা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যা কৃষক, জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের পরিবারের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও সহজ করতে হবে, যাতে দুর্যোগের সময় মানুষ দ্রুত সহায়তা পায়।

২০২৪ সালের বন্যা: দুর্যোগের অর্থনৈতিক ক্ষতির ভয়াবহ বাস্তবতা

২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যা বাংলাদেশের দুর্যোগ ঝুঁকির বাস্তব চিত্র আবারও সামনে নিয়ে আসে। পূর্বাঞ্চলের ১১টি জেলায় ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ৫৭ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়েছিল।

ওই বন্যায় বহু পরিবার ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও জীবিকার ক্ষতির মুখে পড়ে। অনেক মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে আর্থিক সংকট মোকাবিলা করতে বাধ্য হয়। এই পরিস্থিতি দেখিয়েছে, দুর্যোগের পর শুধু ত্রাণ নয়, মানুষের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন কার্যকর ঝুঁকি সুরক্ষা ব্যবস্থা।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে বাংলাদেশের বন্যা ঝুঁকি

বাংলাদেশের বন্যা ঝুঁকি শুধু মৌসুমি বৃষ্টির কারণে তৈরি হচ্ছে না; জলবায়ু পরিবর্তনও এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। অতিবৃষ্টি, উজানের ঢল, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, নদীর তলদেশে পলি জমা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও বাড়তে পারে। ফলে বন্যা মোকাবিলায় শুধু বাঁধ, অবকাঠামো ও উদ্ধার কার্যক্রম নয়, আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সমাধান হতে পারে প্যারামেট্রিক বীমা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্যোগ মোকাবিলায় নতুন ধরনের বীমা ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যার মধ্যে প্যারামেট্রিক বীমা অন্যতম। এই ব্যবস্থায় ক্ষতির পরিমাণ আলাদাভাবে যাচাই করার পরিবর্তে নির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে অর্থ প্রদান করা হয়।

যেমন নির্দিষ্ট মাত্রার বৃষ্টিপাত, নদীর পানির উচ্চতা বা দুর্যোগের সূচক নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণ দেয়া যায়। এতে দীর্ঘ দাবি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া ছাড়াই দ্রুত অর্থ সহায়তা পাওয়া সম্ভব হয়।

বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য এই ধরনের বীমা একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।

ত্রাণ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা

বন্যা মোকাবিলায় সরকার, বীমা কোম্পানি, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দুর্যোগের সময় মানবিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বীমাকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অংশ করতে হবে।

কারণ বন্যার পানি কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর নেমে যায়। কিন্তু হারানো ঘর, নষ্ট ফসল, বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যবসা এবং ঋণের বোঝা থেকে বের হতে মানুষের অনেক বছর লেগে যায়।

তাই বন্যা বীমা শুধু একটি আর্থিক পণ্য নয়; এটি হতে পারে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নদী হয়তো ঘর কেড়ে নিতে পারে, বন্যা হয়তো বছরের সঞ্চয় ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু একটি কার্যকর বীমা ব্যবস্থা মানুষের পুনরায় জীবন শুরু করার পথ তৈরি করতে পারে।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।