অর্থনৈতিক সংকটে বেকারত্ব বীমাই সমাধান: আইএমএফ গবেষণা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, ঋণ সংকট এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন একসঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছে। উন্নত দেশগুলো দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদের হার বজায় রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। আর উন্নয়নশীল দেশগুলো সীমিত বাজেট ও ঋণ ঝুঁকির কারণে নীতি প্রয়োগে অনেক বেশি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এই বাস্তব পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, আয়-সুরক্ষা নীতির মধ্যে বেকারত্ব বীমা সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজ করা একটি স্বয়ংক্রিয় স্থিতিশীল নীতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘন ঘন এবং ভিন্ন প্রকৃতির হয়ে উঠেছে। ফলে প্রচলিত রাজস্ব সহায়তা নীতি সব পরিস্থিতিতে সমানভাবে কাজ করছে না। কারণ অর্থনৈতিক সংকট সব পরিবারকে একইভাবে আঘাত করে না। কেউ সরাসরি চাকরি হারায়, কেউ আংশিক আয় হারায়, আবার কেউ চাকরি থাকলেও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে খরচ কমিয়ে দেয়। এই ভিন্ন ভিন্ন আচরণের কারণে একক নীতি সব মানুষের জন্য একই ফল দিতে পারে না।
আইএমএফ-এর বিশ্লেষণে একটি উন্নত অর্থনৈতিক কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে পরিবারগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একদল হলো 'হ্যান্ড-টু-মাউথ' পরিবার, যারা আয়ের বড় অংশ সঙ্গে সঙ্গে খরচ করে এবং খুব কম সঞ্চয় রাখে। অন্যদল হলো 'বাফার-স্টক সেভার' পরিবার, যারা সঞ্চয়ের মাধ্যমে ঝুঁকি মোকাবিলা করে। এই দুই ধরনের আচরণই নীতির প্রভাবকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করে এবং কেন একই নীতি সব ক্ষেত্রে সমান ফল দেয় না তা স্পষ্ট করে।
একই বাজেট সীমার মধ্যে বেকারত্ব বীমা, লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা এবং সর্বজনীন নগদ হস্তান্তর- এই তিনটি নীতি তুলনা করে দেখা গেছে, বেকারত্ব বীমা সবচেয়ে কার্যকর। এটি শুধু চাকরি হারানো মানুষের আয় প্রতিস্থাপন করে না, বরং কর্মরত মানুষের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমিয়ে ভোগব্যয় স্থিতিশীল রাখে। এর ফলে বাজারে চাহিদা বজায় থাকে এবং অর্থনীতি দ্রুত পুনরুদ্ধারের পথে এগোয়।
তুলনামূলক ব্যয়ের হিসাবেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। বেকারত্ব বীমা সম্প্রসারণে প্রয়োজন হয় সবচেয়ে কম অর্থনৈতিক চাপ, যেখানে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তায় তার চেয়ে বেশি এবং সর্বজনীন নগদ হস্তান্তরে সবচেয়ে বেশি ব্যয় লাগে। একই বাজেটের মধ্যে এই পার্থক্য স্পষ্টভাবে দেখায় যে বেকারত্ব বীমা সবচেয়ে বেশি কার্যকর এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী নীতি।
এশিয়ার বাস্তব চিত্র এই গবেষণাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত অঞ্চলে মাত্র প্রায় ১৪ শতাংশ বেকার ব্যক্তি আনুষ্ঠানিক নগদ সহায়তার আওতাভুক্ত। অর্থাৎ বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক বেকারত্ব সুরক্ষা ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।
এশিয়ার অধিকাংশ দেশে বেকারত্ব বীমা ব্যবস্থা এখনো সীমিত বা অসম্পূর্ণ অবস্থায় আছে। পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশ যেমন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ব্যবস্থা থাকলেও দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে এখনো পূর্ণাঙ্গ কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে সংকটের সময় শ্রমবাজারে আঘাত সরাসরি মানুষের আয়ে পড়ে এবং সরকারি সহায়তা সীমিত থাকে।
সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের দিক থেকেও বড় বৈষম্য দেখা যায়। এশিয়ায় গড় সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় সাত শতাংশের কাছাকাছি, যেখানে উন্নত অর্থনীতিতে এই হার অনেক বেশি। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে এই হার তিন শতাংশেরও নিচে, যা বেকারত্ব ও আয়-সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে তোলে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বেকারত্ব বীমা একটি 'আস্থা সুরক্ষা ব্যবস্থা' হিসেবে কাজ করে। এটি মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার ভয় কমিয়ে দেয়। ফলে মানুষ অপ্রয়োজনীয়ভাবে খরচ কমায় না এবং ভোগব্যয় স্থিতিশীল থাকে। এর ফলে বাজারে চাহিদা ধরে থাকে, ব্যবসা স্থিতিশীল থাকে এবং শ্রমবাজারেও চাপ কমে আসে। এই প্রক্রিয়াই বেকারত্ব বীমাকে একটি শক্তিশালী স্বয়ংক্রিয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীল নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
গবেষণার এই ফলাফল দেখায়, সংকটের সময় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে বেকারত্ব বীমা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি। এটি শুধু আয় সুরক্ষা নয়, বরং চাহিদা স্থিতিশীল রাখা এবং শ্রমবাজারে আঘাত কমানোর একটি কার্যকর উপায় হিসেবে কাজ করে।



