পোশাক শ্রমিকদের জন্য স্বল্প খরচের ডিজিটাল ন্যানো ইন্স্যুরেন্স মডেল

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে কম খরচে স্মার্ট ন্যানো ইন্স্যুরেন্স চালুর আলোচনা এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। এটি শুধু একটি বীমা পণ্য নয়, বরং শ্রমিকদের জন্য একটি ডিজিটাল সামাজিক সুরক্ষা জাল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর আর্থিক ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। এই খাত থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩৯.৩৫ থেকে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। বিজিএমইএ তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ থেকে ৪৪ লাখ শ্রমিক এই খাতে সরাসরি কাজ করেন, যাদের বড় অংশ নারী ও নিম্ন আয়ের শ্রেণির। এই বিশাল শ্রমশক্তিই ন্যানো ইন্স্যুরেন্সের সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় লক্ষ্যগোষ্ঠী।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আরএমজি খাত বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে প্রায় ১০ থেকে ১৩ শতাংশ অবদান রাখে এবং প্রতি ১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির বিপরীতে প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি হয়। এই শ্রমভিত্তিক কাঠামো একদিকে যেমন অর্থনীতির শক্তি, অন্যদিকে তেমনি সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতি থাকলে বড় ঝুঁকির উৎসও।

বর্তমানে বাংলাদেশের বীমা প্রবেশ হার খুবই কম। বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফিনডেক্স অনুযায়ী, লাইফ বীমার প্রবেশ হার মাত্র ০.৪ থেকে ০.৫ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ফলে বড় একটি শ্রমিক জনগোষ্ঠী এখনো আনুষ্ঠানিক আর্থিক সুরক্ষার বাইরে রয়েছে।

ন্যানো বা মাইক্রো ইন্স্যুরেন্স হলো খুব কম প্রিমিয়ামের বিনিময়ে সীমিত কিন্তু জরুরি আর্থিক সুরক্ষা। এই মডেলে সাধারণত দুর্ঘটনা, হাসপাতালে ভর্তি সহায়তা, আংশিক জীবন সুরক্ষা এবং আয় ক্ষতিপূরণ অন্তর্ভুক্ত থাকে। সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো-কম খরচ, সহজ ডিজিটাল অ্যাকসেস এবং দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই মডেল বিশেষভাবে কার্যকর হয় যখন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যাপক ব্যবহার এই ধরনের ডিজিটাল বীমাকে বাস্তবায়নের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে।

বর্তমান সময়ে ফিনটেক ও বীমা খাত একসঙ্গে কাজ করার প্রবণতা বাড়ছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘এমবেডেড ফাইন্যান্সিয়াল প্রোটেকশন’। এতে শ্রমিকদের বেতন বা লেনদেনের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রিমিয়াম কেটে নেয়া যেতে পারে, মোবাইল অ্যাপে পলিসি ব্যবস্থাপনা সহজ হয় এবং দাবি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি শ্রমিকদের জন্য শুধু বীমা নয়, বরং একটি নিরবচ্ছিন্ন আর্থিক নিরাপত্তা জাল তৈরি করতে পারে।

গার্মেন্টস খাতকে আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যন্ত্রপাতির ঝুঁকি এবং অগ্নিঝুঁকি এখানে সাধারণ বিষয়। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধস এই খাতের নিরাপত্তা দুর্বলতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ, যেখানে ১ হাজার ১৩৪ জন শ্রমিক প্রাণ হারান।

এই প্রেক্ষাপট দেখায়, শ্রমিকদের জন্য শুধু আয়ের সুযোগ নয়, বরং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষাও অপরিহার্য।

বাংলাদেশে ইতিমধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান মোবাইল ও ডিজিটাল চ্যানেল ব্যবহার করে মাইক্রোইন্স্যুরেন্স বা স্বল্পমূল্যের বীমা পণ্য চালু করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গ্রামীণফোনের সঙ্গে যুক্ত ‘বিমা’ প্ল্যাটফর্ম, যা মোবাইল ব্যালেন্স বা সাবস্ক্রিপশন ভিত্তিতে লাইফ ও দুর্ঘটনা বীমা সেবা দিয়েছে। এছাড়া রবি এবং বাংলালিংকের মতো মোবাইল অপারেটরদের মাধ্যমেও বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের মোবাইল মাইক্রোইন্স্যুরেন্স সেবা চালু হয়েছে।

অন্যদিকে বেসরকারি বীমা খাতে গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং মেটলাইফ বাংলাদেশ ডিজিটাল ও গ্রুপ ভিত্তিক মাইক্রোইন্স্যুরেন্স পণ্য চালু করেছে, যা নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং আংশিকভাবে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য সহজলভ্য সুরক্ষা হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি ব্র্যাক-এর বিভিন্ন উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত মাইক্রোফাইন্যান্স ও সীমিত বীমা উদ্যোগও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

ন্যানো ইন্স্যুরেন্সের সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো এর কম খরচ এবং ব্যাপক পৌঁছানোর সক্ষমতা। তবে একই সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে-বীমা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, আস্থার ঘাটতি, টেকসই ব্যবসায়িক মডেল এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আধুনিকায়ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সরকার, বীমা কোম্পানি এবং ফিনটেক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করে, তবে এটি বাংলাদেশের শ্রমিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে।