ভালো নেই সামতানেরা...

সামতান রহমান। বয়সে তরুণ। পড়ালেখা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সংসারের হাল ধরতে মাস্টার্স শেষে বেরিয়ে পড়েন চাকরির সন্ধানে। পরিচিত একজনের হাত ধরে জড়িয়ে পড়েন বীমা পেশায়। বেশিরভাগ পেশার ক্ষেত্রে যেখানে প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, বীমা পেশা সেখানে বাধাহীন। আছে অবারিত আয়ের সুযোগ আর কর্মের স্বাধীনতা। তাই কিছু দিনের মধ্যেই ভালোবেসে ফেলেন সম্ভাবনাময় এই বীমা খাতকে। আরো উদ্যোম নিয়ে শুরু হয় তার পথচলা।

নন-লাইফ বীমা কোম্পানি বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্সের একটি ব্রাঞ্চের এসিসটেন্ট ম্যানেজার হিসেবে পেশা শুরু হলেও কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি ব্রাঞ্চ ইনচার্জ। থার্ড পার্টি মটর ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক থাকায় ইনকামও ছিল ভালো। রাজধানীর উত্তরায় ছিল পরিপাটি অফিস। ছিল কর্মচঞ্চল কিছু সহকর্মী। সব মিলিয়ে ভালোই যাচ্ছিল সামতান রহমানের দিনগুলো। পেশাগত মান উন্নয়নের মাধ্যমে আরো বহুদূর যাওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু হঠাৎ-ই যেন স্বপ্নভঙ্গ।

কেন ভাঙলো তার স্বপ্ন! সে কথাই জানিয়েছেন সামতান রহমান। ইন্স্যুরেন্সনিউজবিডি’কে তিনি বলেন, থার্ড পার্টি মটর ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক থাকায় এটাই ছিল তার আয়ের মূল উৎস। এটাকে কেন্দ্র করেই গড়ে তুলেছিলেন ব্যবসার মূল নেটওয়ার্ক। অফিসের টার্গেট পূর্ণ হতো এই একটি পলিসি থেকেই। কিন্তু হঠাৎ করেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে থার্ড পার্টি মটর ইন্স্যুরেন্স পলিসি বাতিল করায় বন্ধ হয়ে গেছে তার প্রিমিয়াম সংগ্রহ।

যার প্রভাব পড়েছে বেতন-ভাতায়। গেলো বছরের ডিসেম্বরে এই পলিসি বাতিল করার পর থেকে বন্ধ রয়েছেন এর নবায়ন এবং নতুন পলিসি বিক্রি। আবার লকডাউনের কারণে অন্য বীমা পলিসিও বিক্রি করতে পারছেন না। সব মিলিয়ে টার্গেট পূরণ না হওয়ায় এখন বেতন-ভাতা প্রায় বন্ধ। এরইমধ্যে অফিসের বেশ কয়েকজন কর্মী ছাটাই করেছেন। তবে বাকীদের নিয়ে পড়েছেন বিপদে। কোম্পানি থেকে কিছু টাকা দেয়ার কথা থাকলেও এখনো হাতে পাননি। সামনে ঈদ...., কিন্তু কোম্পানির দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার নেই সামতান রহমানের।

শুধু সামতান রহমান-ই নয়, এমন অনেক বীমা কর্মী রয়েছেন যাদের অবস্থা এখন খুবই করুণ। একদিকে করোনা মহামারীর কারনে লকডাউন, অন্যদিকে কমিশন বন্ধ। আবার থার্ড পার্টি মটর ইন্স্যুরেন্স করার বাধ্যবাধকতাও উঠিয়ে নিয়েছে সরকার। এ অবস্থায় তারা না পারছেন পেশা বদল করতে, আবার না পারছেন ভালো ব্যবসা করতে। উভয় সঙ্কটে পড়ে এখন তারা দিশেহারা। করোনাকালে বীমা কর্মীদের হাল-হকিকত তুলে ধরতে বেশ কয়েকটি নন-লাইফ কোম্পানির মাঠ কর্মীদের সাথে কথা বলেছেন ইন্স্যুরেন্সনিউজবিডি'র সিনিয়র রিপোর্টার আবদুর রহমান আবির, যা নিয়ে আজকের এই আয়োজন।

ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির রংপুর ব্রাঞ্চ ইনচার্জ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, করোনা মহামারী সংক্রমন রোধে চলমান দফায় দফায় লকডাউনের কারণে আমি তেমন কোন ব্যবসা করতে পারছি না। গেলো বছরের যতটুকু ব্যবসা হয়েছে, এ বছর তাও হয়নি। আগে কমিশন দিয়ে ব্যবসা হতো, এখন সেটাও বন্ধ। তবে অন্য কোম্পানি সেটা এখনো চালু রেখেছে। যার কারণে ব্যাংক ম্যানেজার ও গ্রাহকরা আমাদের ব্যবসা দিতে চায় না। তারা বলে, অমুক কোম্পানি এতো এতো কমিশন দিতে চায় কিন্তু আপনি কেন দিবেন না!এ কারণে নতুন ব্যবসা তো দূরের কথা, নবায়ন ব্যবসাও আসছে না। 

এদিকে আমি কাজের ওপর স্যালারি পাই। অর্থাৎ স্যালারি ভিত্তিতে আমার নিয়োগ হলেও ব্যবসার টার্গেট পূরণ না হলে স্যালারি কাটা যায়। আমার অফিসে কয়েক’জন সহকর্মীও রয়েছে, যাদের বেতন-ভাতা আসতো এই ব্যবসা আহরণ থেকেই। এখন ব্যবসা কমে যাওয়ায় তাদের বেতন-বোনাস নিয়ে পড়েছি বিপাকে। প্রতিদিন সকাল থেকে সবাই আমাকে ফোন করা শুরু করে। ঈদ চলে আসছে, কবে টাকা পয়সা পাবো...। তাদের কথা দিয়েছি ঈদের আগেই কিছু একটা করবে কোম্পানি। এখন যদি অন্যথা হয় তাহলে আমার বেইজ্জতির শেষ থাকবে না। স্ত্রী-সন্তানকেই বা কি বলব...।

২০০১ সাল থেকে বীমা পেশায় আছেন উল্লেখ করে মার্কেন্টাইল ইন্স্যুরেন্সের বীমা এজেন্ট এবং খুলনার দিঘোলিয়া অঞ্চলের বাসিন্দা মশিউর রহমান বলেন, ফিক্সড বেতনে নিয়োগ দিয়েছে কোম্পানি। তবে প্রিমিয়াম আয়ের ওপর নির্ভর করে কোন মাসে অর্ধেক, কোন মাসে এক-তৃতীয়াংশও বেতন আসে। আগে যাই বেতন আসতো লকডাউনের কারণে এখন তাও আসছে না। ব্যবসার এই অবস্থায় কোম্পানিকে কিছু বলতেও পারছি না আবার কিছু করতেও পারছি না। কেমনে যে চলতি, তা আল্লাহই ভালো জানেন।

সিলেটের চৌহাট্টায় পিপলস ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর মো. এনামুজ্জামান জানান, আমি কোম্পানির স্থায়ী কর্মকর্তা। তাই বেতন-ভাতা নিয়েও আমাকে কোন টেনশন করতে হয় না। তবে সরকারের অবিবেচক সিদ্ধান্তের ফলে আমাদের কর্মীদের খুব ক্ষতি হয়েছে। থার্ড পার্টি মটর ইন্স্যুরেন্স বন্ধ করায় প্রিমিয়াম আয় অনেকটাই কমে গেছে। আগে আমাদের কর্মীরা অনেকটা বসে বসেই ইনকাম করতো। তাছাড়া লকডাউনের কারণে আমাদের অঞ্চলে এলসি খোলাও প্রায় বন্ধ। তাই অন্যান্য ব্যবসাও তেমন হচ্ছে না। সব মিলিয়ে কর্মীদের অবস্থা বেশ খারাপ।

গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের নারায়ণগঞ্জ ব্রাঞ্চের ম্যানেজার ফরহাদ হোসেন, যিনি বীমা কোম্পানিটির এজেন্ট জেসমিন ফরহাদের স্বামী, তিনি বলেন, কোম্পানি থেকে স্যালারি নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে বেতন আসছে কমিশন হিসেবে। তাও আবার এজেন্ট কোডে নয়। আইডিআরএ থেকে এজেন্ট সিস্টেম বাতিল ঘোষণার পরই আমাদের এজেন্টরা ঝুলন্ত অবস্থায় আছে। একদিকে ঝুলন্ত অবস্থা, অন্যদিকে লকডাউনের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটাই বন্ধ। এসব কারণে করুণ অবস্থার মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছে বীমা কর্মীরা।

এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের ফেনী ব্রাঞ্চের সাবেক ইনচার্জ হুমায়ুন কবির বলেন, ১৯৮৯ সাল থেকে আমি বীমা পেশায় আছি। আর এশিয়া ইন্স্যুরেন্সে  শুরু করি ২০১৫ সালে। তবে গত এপ্রিলে আমি গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সে যোগদান করেছি। বর্তমানে আমাদের ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ। কমিশন ভিত্তিতে আমাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ব্যবসা না থাকায় এখন কোন কমিশনও নেই। এতো বছর কাজ করার পরও সংকটের সময় আমাদের খোঁজ নেয়ার দায় নেই কোম্পানির। এখন করোনা পরিস্থিতে আমরা কি করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ)’র সেক্রেটারি জেনারেল এবং এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমাম শাহীন বলেন, আমি সব কোম্পানির কথা বলতে পারছি না। তবে আমার কোম্পানিতে কর্মরত বীমা কর্মীদের বেতন-ভাতা সময়মতো পরিশোধ করার চেষ্টা করেছি। এরইমধ্যে ঈদুল আযহার বেতন-বোনাসও দেয়া হয়েছে। করোনার কারণে যারা ভালো ব্যবসা করতে পারেনি তাদেরও আমরা বেতন-বোনাস দিয়েছি। পরবর্তীতে তারা ভালো ব্যবসা করবে এই আশা নিয়ে আমরা তাদের বেতন দিয়ে যাচ্ছি।

লকডাউনের কারণে যেসব বীমা কর্মীর আয় বন্ধ হয়ে গেছে তাদের জন্য ইন্স্যুরেন্স ফোরামের পক্ষ থেকে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফোরামের পক্ষ থেকে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তাছাড়া সেই সুযোগও নেই। বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ’র মতো কোন সংগঠন নয় ইন্স্যুরেন্স ফোরাম। আসলে ফিজিক্যাল মিটিং ছাড়া এ বিষয়ে কোন আলোচনারও সুযোগ নেই। তবে সবাই নিজ নিজ কোম্পানির অবস্থান থেকে কর্মীদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করছে।

এ বিষয়ে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা তালুকদার মো. জাকারিয়া হোসেন ইন্স্যুরেন্সনিউজবিডি’কে বলেন, করোনাকালে আমরা কোন কর্মীকে ছাঁটাই করিনি, তাদের বেতন-বোনাস বন্ধও করিনি, কারো বেতন কাটিওনি। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আমাদের সবার বেতন-বোনাস দেয়া হয়েছে। একেবারেই যাদের ব্যবসা নেই তাদেরকেও আমরা মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি।