আইন লঙ্ঘন করে বীমা, দাবি পরিশোধে আইডিআরএ’র নির্দেশ

আবদুর রহমান আবির: জাহাজের দুর্ঘটনা পলিসির কভারেজ শুরুর আগে হওয়ায় পুনর্বীমাকারী সাধারণ বীমা করপোরেশন জাহাজটির ক্ষয়ক্ষতির দায় অস্বীকার করেছে। অথচ জাহাজটির বীমা দাবির ৫ কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) । নির্দেশটি দেয়া হয় ২০২১ সালের ১৬ মার্চ।

আইনে কোন কোম্পানিকে বীমা দাবি পরিশোধে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদানের ক্ষমতা দেয়া হয় নাই। ফলে বীমা দাবি পরিশোধের এ নির্দেশকে ক্ষমতার অপব্যবহার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে বীমা দাবি পরিশোধ না করে গ্রাহক স্বার্থ ক্ষুন্ন করলে সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে শাস্তি প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি বীমা দাবি পরিশোধে সক্ষমতা হারালে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির লাইসেন্স বাতিলেরও ক্ষমতা দেয়া হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে।

এমভি আলোর মিছিল নামক জাহাজটির বীমা পলিসি দুর্ঘটনার দিনই ইস্যু করা হয়। কিন্তু প্রিমিয়ামের টাকা পলিসি ইস্যুর দু’দিন পরে বীমাকারীর ব্যাংক একাউন্টে জমা করায় দুর্ঘটনার পর পলিসি ইস্যু করা হয়েছে বলে দাবি করছে এসবিসি।

অন্যদিকে বীমা আইন লঙ্ঘন করে পলিসি ইস্যু করা এবং সেই পলিসির আওতায় দাবি উত্থাপন করা- এই কর্মকাণ্ডে বীমাকারী কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্সের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তাই জাহাজ দুর্ঘটনার সঠিক খবর জেনেও মোটা অংকের দাবি আদায়ে আইন লঙ্ঘন করে পলিসি ইস্যু করে দাবি উত্থাপন করা হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের জারি করা ২০১১ সালের ২৯ নং সার্কুলার অনুসারে প্রিমিয়ামের টাকা নগদায়ন হওয়ার আগেই পলিসি ইস্যু করা বীমা আইনের লংঘন।  

যে কারণে বীমা দাবিটি নাকোচ করে এসবিসি:

এমভি আলোর মিছিল জাহাজটি দুর্ঘটনায় পড়ে ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর। ওই দিনই জাহাজটির বীমা পলিসি ইস্যু করে কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স। প্রিমিয়াম বাবদ ১০ লাখ ৫৬ হাজার ২৫০ টাকার ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (চেক নং-১০৮১১৯৯) একটি চেক নিয়ে গ্রাহককে মানি রিসিপ্ট প্রদান করে বীমা কোম্পানিটি। মানি রিসিপ্টে এই চেকের বর্ণনা দেয়া হলেও প্রিমিয়াম জমা হয় অন্য ১টি চেক ও ১টি পেঅর্ডারের মধ্যমে। যার  মধ্যে ৬ নভেম্বর জমা হয় ৬ লাখ ৫৬ হাজার ২৫০ টাকা এবং ৭ নভেম্বর ৪ লাখ টাকা। এভাবে পলিসি ইস্যুর পরের দুই দিনে বীমাকারীর একাউন্টে প্রিমিয়াম জমা করা বাস্তব সম্মত নয় বলে মনে করে এসবিসি।

বীমা দাবিটি নাকোচ করে ২০২১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ইস্যু করা ওই চিঠিতে এসবিসি জানিয়েছে, বীমা আইন ২০১০ এর ১৮(৩) ধারা অনুসারে প্রিমিয়াম বীমাকারির হিসাবে জমা হওয়ার তারিখ থেকেই বীমা কভারেজ শুরু হয়। কিন্তু দুর্ঘটনাটি হয়েছে পলিসির আবরিত ঝুঁকি শুরুর আগেই। তাই আলোচ্য বীমা দাবিতে পুনর্বীমাকারী হিসেবে সাধারণ বীমা করপোরেশনের কোন দায় নেই।

প্রিমিয়াম জমার বিষয়ে যা বলা হয়েছে বীমা আইন ও সার্কুলারে:

বীমা আইন ২০১০ এর ১৮ (৩) ধারায় বলা হয়েছে, কোন বীমাকারী বাংলাদেশে নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসা সংক্রান্ত কোন বীমা ঝুঁকি গ্রহণ করিবে না যদি না বীমাকারী প্রদেয় প্রিমিয়াম বা বিধি দ্বারা নির্ধারিতভাবে প্রদেয় প্রিমিয়ামের অংশ বিশেষ পাইয়া থাকে কিংবা নির্ধারিত ঐরূপ পদ্ধতি বা সময়ের মধ্যে এরূপ ব্যক্তি দ্বারা প্রদেয় প্রিমিয়াম পরিশোধের নিশ্চয়তা প্রদান করা হইয়া থাকে।

অন্যদিকে প্রিমিয়াম জমা বিষয়ে বীমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ২০১১ সালের ২৪ নভেম্বর প্রজ্ঞাপন নং: জেন-২৯/২০১১ জারি করে।

এতে বলা হয়েছে, বীমা পলিসির প্রিমিয়াম ৫ হাজার টাকার বেশি হলে কোম্পানিকে অবশ্যই ডিডি, পে-অর্ডার, ক্রেডিট অ্যাডভাইজ, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার অথবা অ্যাকাউন্টপেয়ি চেকের মাধ্যমে নিতে হবে।

আর বীমা দলিলাদি অবশ্যই চেকের অর্থ পাওয়ার পরে ইস্যু করতে হবে। যেকোন কভার নোট, পলিসি, এনডোর্সমেন্ট অথবা অন্য যেকোন বীমা বিষয়ক দলিল ইস্যু করার আগে বীমা কোম্পানিকে সম্পূর্ণ প্রিমিয়াম গ্রহণ করতে হবে। ডিডি, পে-অর্ডার অথবা চেক নম্বর এবং তারিখ মানি রিসিপ্টে উল্লেখ করতে হবে।

 আইনের ব্যাখ্যায় যা বলছেন বীমা খাত সংশ্লিষ্টরা:

কখন থেকে বীমা ঝুঁকি শুরু হয়- তা নিয়ে কথা বলা হয় বীমা খাত সংশ্লিষ্টদের সাথে। বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা থাকায় কেউ তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপকালে যা জানা গেছে-

প্রিমিয়ামের টাকা নেয়া হয় মানি রিসিপ্টের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম পরিশোধের একটি দলিল মানি রিসিপ্ট। কিন্তু প্রতিটি মানি রিসিপ্টে শর্ত দেয়া হয়- চেক বা পে-অর্ডারের টাকা নগদায়ন হওয়ার পর মানি রিসিপ্টটি প্রিমিয়াম পরিশোধের আইনগত দলিল হিসেবে গণ্য হবে। ফলে প্রিমিয়ামের টাকা নগদায়ন না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিটি বীমা পলিসিতে আবরিত হিসেবে ধরা হয় না।

আইডিআরএ’র নির্দেশনা অনুসারেও (সার্কুলার ২৯) প্রিমিয়াম নগদায়ন না হওয়া পর্যন্ত পলিসি ইস্যু করা আইনের লঙ্ঘন। তবে সার্কুলারটিতে পলিসি বাতিলের যেমন কোন নির্দেশনা নেই; তেমনি প্রিমিয়ামের টাকা নগদায়ন না হলে বীমা কভারেজ শুরুরও সুযোগ দেয়া হয়নি। তাই বীমা কভারেজ কখন থেকে শুরু হবে তার সিদ্ধান্তটি নির্ভর করে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে।

প্রিমিয়াম জমা দেয়া বাবদ দাখিল করা চেক নগদায়ন হতে ব্যাংকিং লেনদেন সময়সূচী অনুসারে বিলম্ব হলেও দাখিল করার দিনে চেকের বিপরীতে গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ থাকলে বিলম্বে চেক নগদায়নের দায় গ্রাহকের ওপর বর্তায় না। তবে কোন কারণে গ্রাহক প্রিমিয়াম জমার জন্য দাখিলকৃত চেক ডিসঅনার হলে অথবা পরিবর্তিত অন্য কোনো চেক বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে প্রিমিয়াম জমা করলে ক্ষতিয়ে দেখা প্রয়োজন প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হয়েছে কিনা।    

পলিসির বিপরীতে মানি রিসিপ্ট, বীমার দলিল ও পলিসি সংক্রান্ত অন্যান্য ডকুমেন্ট বীমা কোম্পানি ইস্যু করে থাকে।  কিন্তু প্রিমিয়ামের টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে জমা নেয়া হলে ঠিক কোন সময়ে প্রিমিয়ামের অর্থ জমা হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়। একইসাথে সেই সময় থেকেই বীমার কভারেজের শুরু নির্ধারণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে কোন কারণে জালিয়াতি বা প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হলে ব্যাংক স্টেটমেন্টের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। তাই আন্তর্জাতিক বীমা প্র্যাকটিস অনুসারে ব্যাংকিং চ্যানেলে যেমন প্রিমিয়াম জমা নেয়া হয় তেমনি প্রিমিয়াম বাবদ গ্রাহকের দাখিলকৃত চেক নগদায়ন হওয়ার সময় থেকেই বীমা কভারেজের শুরু নির্ধারণ করা হয়।

বীমা দাবি পরিশোধের আইডিআরএ’র নির্দেশ দেয়ার ক্ষমতা প্রসঙ্গে আইন বিশেষজ্ঞের মতামত:

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কোন কোম্পানিকে বীমা দাবি পরিশোধে নির্দেশ দিতে পারবে কি-না এমন প্রশ্নের লিখিত জবাবে ২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর আইডিআরএ’র প্যানেল আইনজীবী অ্যাডভোকেট এ এস এম আবদুল মোবিন বলেন, বীমা আইন ২০১০ কিংবা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন ২০১০ এর কোন বিধানে সুনির্দিষ্টভাবে কোন বীমা কোম্পানিকে বীমা দাবি পরিশোধে কর্তৃপক্ষের নির্দেশ প্রদানের কোন বিধান নেই।

তবে তিনি ওই মতামতে আরো উল্লেখ করেন, বীমা আইন ২০১০ এর ৭১ এবং ৭৩ ধারায় বীমা দাবির বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। বীমা আইন ২০১০ এর ৭২ ধারায় বিলম্বে দাবি পরিশোধের উপর সুদ প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে।

যে কারণে কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্সের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ:

আইন লঙ্ঘন করে পলিসি ইস্যু এবং তার ওই পলিসির আওতায় বীমা দাবি উত্থাপন নিয়ে আলাপ করা হয় বীমা খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। আলাপকালে তারা বলেন, আলোর মিছিল জাহাজটির পলিসি ইস্যু ও বীমা দাবি উত্থাপন নিয়ে কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্সের ভূমিকা সন্দেহজনক।

এই সন্দেহের কারণ হিসেবে তারা বলেন, আইডিআরএ জারি করা ২০১১ সালের ২৯ নং সার্কুলারে চেক বা পে অর্ডার নগদায়ন হওয়ার আগে পলিসি ইস্যু করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের এমন নির্দেশ লঙ্ঘন করে পলিসি ইস্যু করা উদ্দেশ্যমূলক কিনা তা ক্ষতিয়ে দেখা দরকার।

তাদের মতে, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্সের দাবি অনুসারে পলিসি ইস্যুর দিনই এসটিসি শিপিং লাইন্সের জাহাজটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। অন্যদিকে গ্রাহকের দেয়া চেক নগদায়ন হওয়ার আগেই অন্য একটি চেক এবং একটি পে অর্ডারের মাধ্যমে প্রিমিয়াম বাবদ টাকা জমা করা হয়। নতুন করে দেয়া ওই চেক ও পে অর্ডারের টাকাও নগদায়ন হয় পরের দু’দিনে। ফলে পুনর্বীমা কোম্পানির কাছ থেকে পুনবীমা দাবির মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিতে কারসাজি বা জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহের সৃষ্টি করে। তাই যথাযথ সংস্থার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সঠিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

বীমা দাবি আদায়ের স্বপক্ষে কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্সের স্টেটমেন্ট ও তার পর্যালোচনা:

আলোর মিছিল জাহাজটির বীমা দাবি পরিশোধের পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরে একটি লিখিত স্টেটমেন্ট দিয়েছে কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স। লেটারহেড প্যাডের ওই স্টেটমেন্টটিতে স্বাক্ষর করেছেন কোম্পানিটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান তারেক। তবে স্টেটমেন্টটি কোন এড্রেসিং করা হয়নি।

প্রিমিয়াম জমা নেয়া ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন করা হয়নি বলে দাবি বীমা কোম্পানির। বীমা আইন ২০১০ এর ১৮(৩) ধারা ও আইডিআরএ’র ২৯ ও ২৬ নং সার্কুলারের ২য় অনুচ্ছেদের বিধান অনুসারেই প্রিমিয়াম জমা হয়েছে।

এক্ষেত্রে স্টেটমেন্টটিতে যেসব যুক্তি তুলে ধরা হয় তা এখানে উপস্থাপন করা হলো-

বীমা গ্রাহক এসটিসি শিপিং লাইনস ৫ নভেম্বর ২০১৭ তারিখে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ১০ লাখ ৫৬ হাজার ২৫০ টাকা একটি চেক (চেক নং- ১০৮১১৯৯) কোম্পানিটির প্রগতি স্মরণী অফিসে জমা দেয়ায় মানি রিসিপ্ট (প্রিমিয়াম জমা দেয়ার রশিদ) ও পলিসি সংক্রান্ত দলিল হস্তান্তর করা হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর চেকটি বাউন্স হওয়ার আশংকায় ব্যাংকে চেকটি জমা না করার অনুরোধ করেন। পরে ওই দিনই (৫ নভেম্বর ২০১৭) এনসিসি ব্যাংকের অপর একটি চেক প্রদান করে। তবে সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় বীমা কোম্পানির শাখা অফিস চেকটি ওইদিন ব্যাংকে জমা করতে পারেনি। ফলে পরের দিন ৬ নভেম্বর চেকটি ব্যাংকে জমা করা হয়। একই ব্যাংকের চেক হওয়ায় ওই দিনই তা নগদায়ন হয়। এনসিসি ব্যাংকের (০০৮৭-০৩১০০০৯৮১৪ নং একাউন্ট থেকে) ওই চেকের মাধ্যমে ১০ লাখ ৫৬ হাজার ২৫০ টাকা প্রিমিয়ামের মধ্যে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ২৫০ টাকা পরিশোধ করেন।

এর পরের দিন অর্থাৎ ৭ নভেম্বর এনসিসি ব্যাংকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে (পে-অর্ডার নং- পিও-১৭৭১৬১১২) প্রিমিয়ামের বাকি ৪ লাখ টাকা জমা করেন।

বীমা কোম্পানিটির যুক্তি ২৯ নং সার্কুলার অনুসারে ৫ হাজার টাকার ওপরে কোন প্রিমিয়াম নগদে নেয়ার সুযোগ নেই। তাই চেক নেয়া হয়েছে। অপর দিকে ২৬ নং সার্কুলার অনুসারে পে-অর্ডার বা ব্যাংক ড্রাফট জমা নেয়ার পরের ২ দিনে প্রিমিয়াম নগদায়নের বৈধতা দেয়া হয়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্টেটমেন্টটিতে ২৯ নং সার্কুলারের আংশিক বর্ণনা করে মতামতটি দেয়া হয়েছে। ২৯ নং সাকুলারে প্রিমিয়াম নগদায়নের আগে পলিসি সংক্রান্ত দলিল হস্তান্তরের নির্দেশ কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অপর দিকে ২৬ নং সার্কুলার অনুসারে পে-অর্ডার বা ব্যাংক ড্রাফট জমা গ্রহণযোগ্য বলা হলেও পে-অর্ডার বা ব্যাংক ড্রাফট জমার আগেই পলিসির সংক্রান্ত দলিল হস্তান্তরের কোন অনুমোদন দেয়া হয় নাই। যা স্টেটমেন্টটিতে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

এছাড়া স্টেটমেন্টটিতে দাবি করা হয়েছে, বীমা আইন ২০১০ এর ১৮(৩) ধারা অনুসারে প্রিমিয়াম নেয়ার নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। একই সাথে প্রিমিয়াম আংশিক পাওয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ট্যারিফ রেট অনুসারে মেরিন হাল পলিসি অংশ বিশেষ প্রিমিয়াম নেয়ার আইনগত বৈধতা রয়েছে। তাই বীমা গ্রাহক যেহেতু একটি চেক ও অপরটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে প্রিমিয়াম দিয়েছেন, সেক্ষেত্রে আইনের কোন ব্যত্যায় হয় নাই। কোম্পানিটির আরো দাবি, বীমা আইন পার্লামেন্টে পাস করা হয়েছে। অপর দিকে ২৯ নং সার্কুলার আইডিআরএ জারি করেছে। তাই সার্কুলারটি আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে এক্ষেত্রে আইন-ই গ্রহণযোগ্য। সার্কুলার ইনভেলিড বলে গণ্য হবে।

আইনের এ জটিলতা নিয়ে আলাপ করে জানা গেছে, স্টেটমেন্টটিতে এক দিকে সার্কুলারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে অপরদিকে প্রিমিয়াম জমা নেয়ার আইনগত যুক্তি দাঁড় করাতে আংশিকভাবে সার্কুলারের ব্যাখ্যা দিয়েছে। যা একদিকে স্ববিরোধী অন্যদিকে অপকৌশল হিসেবে ধরে নেয়ার সুযোগ থাকে।

এছাড়া ব্যাংকিং সময় শেষ হওয়ার কারণে চেক জমা দিতে না পারার যে যুক্তি দেখানো হয়েছে তা কোম্পানির মনগড়া বক্তব্য কিনা তার সত্যতা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত সাপেক্ষেই নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে বাউন্স হবে এমন চেক জমা দিয়ে পলিসি দলিল নিয়ে পরে বাউন্স হওয়ার আশঙ্কায় প্রিমিয়াম বাবদ নতুন চেক জমা করা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে পর্যাপ্ত টাকা বিহীন কোন একাউন্টের চেক প্রদান করে পলিসিপত্র গ্রহণ করা জালিয়াতি।

স্টেটমেন্টটিতে আরো দাবি করা হয়, আলোর মিছিল জাহাজটির ‘টোটাল লস অনলি’ কভারেজ নেয়া। তাই ৫ নভেম্বর বিকাল ৩.৩০ মিনিটে যখন ডুবোচরে আটকে যায় তখন থেকেই জাহাজটি দুর্ঘটনায় পরেছে এমন মনে করার সুযোগ নেই। জাহাজটির টোটাল লস হয় ৬ নভেম্বর রাত ৪.৩০ মিনিটে। তাই ৫ নভেম্বর প্রিমিয়ামের টাকা নগদায়ন হওয়ার আগেই পলিসি ইস্যুর অভিযোগ করা হয়েছে তা সঠিক নয়।

তবে বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, আলোর মিছিল জাহাজটি ৬ নভেম্বর রাতে টোটাল লস হলেও ৫ নভেম্বর জাহাজটির টোটাল লসের পূর্ব লক্ষণ বা আলামত হিসেবে ধরে নেয়ার হবে। তাই স্টেটমেন্টে টোটাল লস অনলি সম্পর্কে দেয়া মতামতটি তাদের নিজস্ব মত। এক্ষেত্রে আইনগত ভিত্তি যথাযথ প্রতিষ্ঠানের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে।

যেভাবে জাহাজটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে:

নথিপত্রের তথ্য অনুসারে, ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর সকালে জাহাজটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে দুই হাজার মেট্রিক টন বিদেশি পাথর নিয়ে নারায়ণগঞ্জের পাগলায় আসার পথে লক্ষ্মীপুরের রামগতি বয়ার কাছে ডুবো চরে আটকে যায়। পরে ৬ নভেম্বর রাতে ভাটার টানে পানি কমে গেলে পাথরের ওজনে জাহাজটির তলা ফেটে ডুবে যায়।

এ বিষয়ে এসটিসি শিপিং লাইন্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, আমি সঠিকভাবেই প্রিমিয়ামের টাকা জমা দিয়ে সঠিকভাবে পলিসি করেছি। সঠিকভাবে পলিসি করার কারণেই বীমা কোম্পানি আমাকে পলিসি সংক্রান্ত সকল দলিলাদি হস্তান্তর করেছে। তাই দাবি পাওয়া আমার আইনগত অধিকার।  কিন্তু দাবিটি আদায়ে ২০১৭ সাল থেকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছি। দাবিটি পরিশোধযোগ্য না হলে বীমা কোম্পানি অনেক আগেই দাবিটি নাকচ করতে পারতো। কিন্তু দাবি নাকচ না করে আমাকে হয়রানি করায় ব্যাংকের দায় বেড়েই চলছে। অন্যদিকে চড়মভাবে মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এ ক্ষেত্রে আমি দাবি পরিশোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা যেমন চাচ্ছি তেমনি যারা আমাকে হয়রানি করে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন করাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে জানতে কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির এই বীমা পলিসির ইস্যু কর্মকর্তা (তৎকালীন ডিএমডি ও ইনচার্জ, প্রগতি স্মরণী ব্রাঞ্চ) এবং বর্তমান মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান তারেক এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি কথা বলার বিষয় উল্লেখ করে মেসেজ দিলেও তিনি সাড়া দেননি।

পরবর্তীতে কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক ও দাবি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ ইকবাল মজুমদারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি একটি মিটিংয়ে আছেন বলে জানান।

এ বিষয়ে সাধারণ বীমা করপোরেশনের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (পুনর্বীমা বিভাগ) ওয়াসিফুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি বোর্ডের সিদ্ধান্তের সাথে জড়িত। তাই এ বিষয়ে আমার কিছু না বলাই ভালো।

আইডিআরএ’র নির্বাহী পরিচালক (যুগ্মসচিব) ও মূখপাত্র এস এম শাকিল আখতারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কর্তৃপক্ষের উর্ধ্বতন নির্বাহী কর্মকর্তা (নন-লাইফ) মোহাম্মদ মোর্শেদুল মুসলিমকে তার ফোনটি ধরিয়ে দেন। মোর্শেদুল মুসলিম বলেন, এসটিসি শিপিং লাইন্সের কাছ থেকে প্রিমিয়াম বাবদ নেয়া চেক নগদায়ন হওয়ার আগেই বীমা দলিল ইস্যু করে আইন লঙ্ঘন করেছে কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স। তবে ওই বীমা পলিসি বৈধ না অবৈধ- সে বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞের মতামত না নিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।

প্রিমিয়াম গ্রহণের আগেই ইস্যু করা এই বীমা পলিসির বিপরীতে এসটিসি শিপিং লাইন্সের উত্থাপিত দাবি পরিশোধ করতে কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স ও সাধারণ বীমা করপোরেশনকে দেয়া আইডিআরএ’র নির্দেশের বিষয়ে মোর্শেদুল মুসলিম বলেন, অনেক বিষয় আলোচনা-পর্যালোচনা ও শুনানী শেষে এই নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাই এ বিষয়ে এখন কিছু বলার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন আইডিআরএ’র এই কর্মকর্তা।