ভারত পাকিস্তানের চেয়ে ১৩% বেশি ব্যয় করতে চায় কোম্পানিগুলো
নিজস্ব প্রতিবেদক: লাইফ বীমাখাতের খসড়া প্রবিধানে ব্যয়ের যে হার নির্ধারণ করা হয়েছে তা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। এসব দেশে ব্যয় হার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হলেও বাংলাদেশে ব্যয়ের হার বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বীমা কোম্পানিগুলো। ব্যয়ের হার নির্ধারণে খসড়া প্রবিধানের বিষয়ে মতামত চেয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ।
বীমা বিশ্লেষকদের মতে, ব্যয়ের হার বাড়ানোর যে প্রস্তাব করা তা গ্রাহক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করবে। এছাড়া লাইফ বীমাখাতের অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে যে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তা আরো বেড়ে যেতে পারে। তাই তারা মনে করছেন, ব্যয়ের এ হার চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বীমা বাজার, তাদের ব্যয়ে হার এবং বাংলাদেশের বীমা বাজার ও ব্যয়ের হার সঠিকভাবে পর্যালোচনা করে ব্যয়সীমা নির্ধারণের প্রবিধান অনুমোদন করা। এ বিষয়ে বীমা বিশ্লেষকদের সাথে মত বিনিময়েরও প্রস্তাব করেন তারা।
ভারত ও পাকিস্তান ব্যবস্থাপনা ব্যয় সংক্রান্ত বিধি ও প্রবিধানমালা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, লাইফ বীমাখাতে প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম সংগ্রহে নতুন কোম্পানির জন্য ব্যয়ের সীমা ভারতে ৯০ শতাংশ। পাকিস্তানে সর্বশেষ সংশোধনীতে নুতন কোম্পানির জন্য কোন বিধান নেই। পুরনো কোম্পানির জন্য ভারতে ৮০ শতাংশ ও পাকিস্তানে ৯০ শতাংশ। নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহে ব্যয়ের সীমা নতুন কোম্পানির জন্য ভারতে ২০ শতাংশ। পুরনো কোম্পানির জন্য ভারতে ১৫ শতাংশ ও পাকিস্তানে ১৫ শতাংশ।
অথচ বাংলাদেশে খসড়া প্রবিধানে ব্যয়ের সীমা প্রস্তাব করা হয়েছে প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম সংগ্রহে নতুন কোম্পানিগুলোর জন্য ৯৮ শতাংশ ও পুরনো কোম্পানির জন্য ৯৩ শতাংশ। নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহে নতুন কোম্পানির জন্য ২৫ শতাংশ ও পুরনো কোম্পানির জন্য ২০ শতাংশ।
এ হিসাবে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের তুলনায় খসড়া প্রবিধানে প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম সংগ্রহে নতুন কোম্পানির জন্য প্রথম বর্ষে ৮ শতাংশ ও নবায়নে ৫ শতাংশ এবং পুরনো কোম্পানির জন্য প্রথম বর্ষে ১৩ শতাংশ ও নবায়নে ৫ শতাংশ বেশি ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। আর পাকিস্তানের তুলনায় পুরনো কোম্পানির জন্য প্রথম বর্ষে ৩ শতাংশ ও নবায়নে ৫ শতাংশ বেশি ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রকাশিত বীমাকারীর (লাইফ) ব্যবসা ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা প্রবিধানমালা, ২০১৭ এর খসড়ায় বলা হয়েছে, ব্যবসা শুরুর প্রথম ৫ বছর বীমা কোম্পানিগুলো প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম আয়ের ৯৮ শতাংশ ও নবায়ন প্রিমিয়ামের ২৫ শতাংশ ব্যয় করতে পারবে। এছাড়া ষষ্ঠ থেকে দশম বছরে প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামের ৯৭ শতাংশ ও নবায়নের ২২ শতাংশ খরচের সুযোগ রাখা হয়েছে।
খসড়া প্রবিধান অনুসারে, দশম বছর পর ব্যবসা বলবৎ থাকলে প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে ১ থেকে ১০০ কোটি টাকার ৯৩ শতাংশ খরচ করতে পারবে বীমা কোম্পানিগুলো। আর ১০১ থেকে ৫০০ কোটি টাকা প্রিমিয়ামের ৯২ শতাংশ এবং ৫০১ থেকে তদুর্ধ টাকার প্রিমিয়ামের ৯১ শতাংশ খরচ করতে পারবে।
তবে নবায়ন প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ব্যবসা শুরুর দশম বছর পূর্ণ করা লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম সংগ্রহের ২য় বর্ষ থেকে পরবর্তী নবায়ন প্রিমিয়ামের ২০ শতাংশ ব্যবস্থাপনা ব্যয় করতে পারবে।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বশেষ বিধিমালা প্রকাশ করা হয় ২০১৬ সালের ৯ মে। এতে কোম্পানিগুলোর বয়স ও পলিসির মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে ব্যয়ের হার নির্ধারণ করা হয়। ওই বিধিমালার তফসিল ১ এর পার্ট বি-তে নতুন কোম্পানির জন্য ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রথম বর্ষে ৯০ শতাংশ ও নবায়নে ২০ শতাংশ। এই ব্যয়সীমা কার্যকর হবে শুধুমাত্র ১০ বছর বা তার বেশি মেয়াদের পলিসির ক্ষেত্রে। তবে ৫ থেকে ৭ বছর মেয়াদের পলিসির ক্ষেত্রে প্রথম বর্ষে এই হার ৭০ শতাংশ এবং নবায়নে ১৮ শতাংশ। আর ৮ থেকে ৯ বছরে মেয়াদের পলিসির ক্ষেত্রে প্রথম বর্ষে ব্যয়সীমা ৮০ শতাংশ এবং নবায়নে ১৯ শতাংশ।
লাইফ বীমা কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনার দশম বছর পরে ৫ থেকে ৭ বছরের পলিসির প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ৬০ শতাংশ এবং নবায়নে ১৫ শতাংশ। ৮ থেকে ৯ বছরের পলিসির প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ৭০ শতাংশ এবং নবায়নে ১৫ শতাংশ। এছাড়া ১০ বছর বা তার বেশি বছরের পলিসির ক্ষেত্রে প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামে সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ৮০ শতাংশ এবং নবায়নে ১৫ শতাংশ ব্যয়ের বিধান করা হয়েছে।
সর্বশেষ ২০১৩ সালের ৭ নভেম্বর ১০ বছরের বেশি বয়সী লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অব পাকিস্তান (এসইসিপি) । এতে ২০১৫ সালের জন্য প্রথম বর্ষে ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয় ৯০ শতাংশ এবং নবায়নে ১৫ শতাংশ ।
২০০৬ সালের ২৮ এপ্রিল জারিকৃত ৬ নম্বর সার্কুলারে নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা সংশোধন করে ২০১৩ সালের সার্কুলার জারি করে এসইসিপি। ২০১৫ সালের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ২০১৬ সালে এবং পরবর্তী বছরেও প্রযোজ্য হবে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।