ডেলিভারি রাইডারদের বীমা: কভারেজ আছে, কিন্তু কতটা কার্যকর

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে ই-কমার্স ও রাইড-শেয়ারিং খাতের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে ডেলিভারি রাইডারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতিদিন সড়কে উচ্চ ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা এই কর্মীদের সুরক্ষায় বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম বীমা সুবিধা চালু থাকলেও, বাস্তবে এই সুরক্ষা কতটা কার্যকর- তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।

প্ল্যাটফর্মভিত্তিক বীমা সুবিধা

দেশের বড় ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে ফুডপ্যান্ডা ডেলিভারির সময় দুর্ঘটনায় আহত রাইডারদের জন্য সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত বীমা কভারেজ প্রদান করে। এই সুবিধা বাইক, সাইকেল ও পথচারী- সব ধরনের রাইডারের জন্য প্রযোজ্য। পাশাপাশি নির্দিষ্ট পারফরম্যান্স অর্জনকারী রাইডারদের জন্য গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের মাধ্যমে ‘পান্ডা রাইডার্স পার্সোনাল অ্যাক্সিডেন্টাল ইন্স্যুরেন্স’ প্রদান করা হয়, যেখানে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বা স্থায়ী অক্ষমতায় ১ লাখ টাকা এবং আংশিক অক্ষমতায় ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা রয়েছে।

স্থানীয় রাইড-শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম পাঠাও তাদের বাইক ও পার্সেল রাইডারদের জন্য ‘সেফটি কভারেজ’ চালু রেখেছে। এর আওতায় ট্রিপ চলাকালীন দুর্ঘটনায় সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যয় এবং ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত আউটডোর সুবিধা পাওয়া যায়। এছাড়া গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের সঙ্গে যৌথভাবে অতিরিক্ত বীমা সুবিধাও নির্দিষ্ট শর্তে প্রদান করা হয়।

অন্যদিকে উবার তাদের মটো ও ফোর-হুইলার রাইডারদের জন্য বিনামূল্যে বীমা সুবিধা দিয়ে থাকে। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, এই কভারেজের আওতায় দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বা স্থায়ী অক্ষমতায় ২ লাখ টাকা এবং হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয়ে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা পাওয়া যায়।

কভারেজ কাঠামো: সীমাবদ্ধতা কোথায়

বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী, ডেলিভারি রাইডারদের জন্য দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুতে সাধারণত ১ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত কভারেজ থাকে। হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয় ২৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত কভার করা হয়।

তবে ইন্স্যুরেন্স খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, শহরের বর্তমান চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় এই কভারেজ অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রতুল। গুরুতর দুর্ঘটনায় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও আয়হানির চাপ মোকাবিলায় এই পরিমাণ সহায়তা যথেষ্ট নয়।

ট্রিপ-নির্ভর সুরক্ষা: বড় একটি ফাঁক

বেশিরভাগ প্ল্যাটফর্মের বীমা সুবিধা শুধুমাত্র ট্রিপ চলাকালীন সময়ের জন্য প্রযোজ্য। ফলে অফ-ডিউটি অবস্থায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা কভারেজের বাইরে থেকে যায়।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, রাইডারদের কাজের ধরন অনুযায়ী তারা দীর্ঘ সময় সড়কে অবস্থান করেন। তাই শুধুমাত্র ট্রিপ-নির্ভর কভারেজ বাস্তব ঝুঁকিকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না।

সচেতনতার অভাব ও ক্লেইম জটিলতা

অনেক রাইডার বীমার শর্ত, সুবিধা এবং ক্লেইম প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্তভাবে অবগত নন। ফলে দুর্ঘটনার পর অনেকেই প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

ইন্স্যুরেন্স বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কভারেজ থাকা যথেষ্ট নয়- ক্লেইম প্রক্রিয়া সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ না হলে তা কার্যকর সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে না।

ব্যক্তিগত বীমা: বিকল্প পথ

যেসব রাইডার কোনো প্ল্যাটফর্মের আওতায় নেই বা অতিরিক্ত সুরক্ষা চান, তারা ব্যক্তিগতভাবে দুর্ঘটনা বীমা গ্রহণ করতে পারেন। বর্তমানে বীমাফাই-এর মতো কিছু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্বল্প প্রিমিয়ামে ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বীমা পলিসি পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে সীমিত পরিসরে চিকিৎসা ব্যয় ও দুর্ঘটনাজনিত ঝুঁকি কভার করা হয়। তবে এসব পলিসির কভারেজ ও শর্ত ভিন্ন হতে পারে, ফলে গ্রহণের আগে বিস্তারিত যাচাই করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

যা করা প্রয়োজন

বিশ্লেষকদের মতে, ডেলিভারি রাইডারদের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান বীমা কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা জরুরি। বর্তমান কভারেজের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে বীমার পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে দুর্ঘটনার পর বাস্তব চিকিৎসা ব্যয় ও আয়হানির চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে শুধুমাত্র ট্রিপ চলাকালীন সময় নয়, অফ-ডিউটি অবস্থায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাকেও সুরক্ষার আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এছাড়া ক্লেইম প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করা জরুরি, যাতে দুর্ঘটনার পর রাইডাররা সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা পান। পাশাপাশি বীমা সুবিধা, শর্ত এবং দাবি প্রক্রিয়া সম্পর্কে রাইডারদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা তাদের প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে অবগত থাকতে পারেন এবং প্রয়োজনে তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেন।