৩৬ বছরেও ৮০ মতিঝিলের জমির মালিকানা পায়নি জেবিসি

মাসরুক খান: ঢাকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র মতিঝিলের ৮০ নম্বর প্লটে অবস্থিত এক সময়ের প্রধান কার্যালয়ের ১১ তলা বিশিষ্ট ভবন ও জমির মালিকানা ৩৬ বছরেও বুঝে পায়নি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা করপোরেশন। ১৯৮৯ সালে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান প্রুডেনশিয়াল অ্যাসুরেন্স কোম্পানি পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে জমিটি জেবিসির কাছে হস্তান্তর করলেও ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় বলছে জমিটির মালিক সরকার।

ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‘প্রুডেনশিয়াল হাউস’ নামে পরিচিত প্রায় ৮০ কোটি টাকা বাজারমূল্যের এই ভবন ও জমির মালিকানা নিয়ে সরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চলছে বিরোধ।

বিরোধের সূত্রপাত ও বর্তমান পরিস্থিতি

২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর জীবন বীমা করপোরেশন (জেবিসি) ৮০ মতিঝিলের জমিটি নিজেদের নামে নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ ঢাকা ডিসি অফিসে আবেদন করে। এর প্রায় এক বছর পর, ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর সেই আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে ডিসি অফিস।

ডিসি অফিসের দাবি, রিভিশনাল সার্ভে (আরএস) এবং সিটি জরিপের খতিয়ান নম্বর ১ ও দাগ নম্বর ১৫৭৩ এবং ১৪২৫-এ জমিটি ঢাকা ডিসি অফিসের নামে নথিভুক্ত থাকায় এটি সরকারি জমি।

এ ছাড়াও জীবন বীমা করপোরেশন জমা দেয়া দলিলে মালিকানা প্রমাণিত হয়নি; তাই জমিটি জেবিসির নামে নিবন্ধনের প্রশ্নই ওঠে না। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে আদালতে যাওয়ার পরামর্শও দেয়া হয় ঢাকার ডিসি অফিস থেকে ইস্যু করা ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবরের ওই চিঠিতে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

প্রুডেনশিয়াল অ্যাসুরেন্স বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) সদর দপ্তর স্থাপন করে ১৯৬৯ সালে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটি ঢাকার মতিঝিলে ৬ কাঠার ৮০ নম্বর প্লটটি ক্রয় করে। তবে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে প্রুডেনশিয়ালের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে জীবন বীমা করপোরেশন। এর আগে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত প্রুডেনশিয়াল অ্যাসুরেন্সের পক্ষে ব্যবসা পরিচালনা করে জেবিসি।

পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে প্রুডেনশিয়াল তাদের বাংলাদেশে থাকা পুরো ব্যবসা জেবিসির কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সময় কোম্পানির পরিচালক ব্রায়ান মেডহার্স্ট ও কোম্পানি সেক্রেটারি পিটার রবার্ট রওসন এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া তদারকি করেন।

আমমোক্তারনামা বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে এই হস্তান্তর কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। এক্ষেত্রে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করা হয় ৫ জুন ১৯৮৯ সালে; আর কার্যকারিতা ধরা হয় ওই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে।

প্রুডেনশিয়াল অ্যাসুরেন্সের সম্পদ ও দায়

১৯৮৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রুডেনশিয়ালের নিট দায় ছিল প্রায় ৬৪ লাখ টাকা। ১৯৮৮ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রিমিয়াম আয় ছিল প্রায় ৯০ হাজার টাকা। মোট আয় ছিল প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ছিল প্রায় ২০ লাখ টাকা।

দায় থাকলেও উল্লেখযোগ্য সম্পদ ছিল প্রুডেনশিয়াল অ্যাসুরেন্স কোম্পানির। এর মধ্যে হাউস বিল্ডিং করপোরেশনে ৫.৫ শতাংশ সুদে প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ ২০ হাজার রুপির ডিবেঞ্চার ছিল প্রতিষ্ঠানটির হাতে।

এছাড়া ১৯৭৩, ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালের ইস্ট পাকিস্তান গভর্নমেন্ট লোন মিলিয়ে প্রায় ৩৫ লাখ রুপির সরকারি ঋণপত্র ছিল। প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলসের ২০ হাজার ৮৩৩টি শেয়ারও ছিল প্রুডেনশিয়ালের, যার প্রতিটির মূল্য ছিল ১০ রুপি।

১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে এক জরিপ প্রতিবেদনে- ঢাকার প্রাণকেন্দ্র ৮০ মতিঝিলে ৪ হাজার স্কয়ার ফিট (প্রতি তলা) বিশিষ্ট ১১ তলা ভবন ও জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা।

তবে প্রুডেন্সিয়াল ভবন ও জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮০ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে একাধিক স্থপতি প্রতিষ্ঠান।

হস্তান্তরের সময় প্রুডেনশিয়াল অ্যাসুরেন্স কোম্পানির অধীনে চালু বীমা পলিসি ছিল ৬৩৮টি। এর মধ্যে ১০০টি ছিল প্রিমিয়াম প্রদানকারী, ২৭০টি পরিশোধিত (পেইড-আপ) এবং ২৬৮টি অটোমেটিক প্রিমিয়াম লোন সুবিধার আওতায়।

জেবিসির দাবি ও নথিপত্র

জীবন বীমা করপোরেশনের দাবি, তারা তিন দশকের বেশি সময় ধরে ভবনটি ভোগদখল করছে এবং নিয়মিত জমির খাজনা পরিশোধ করে আসছে। তাদের কাছে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা বা রসিদ রয়েছে। জেবিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা বৈধভাবেই প্রুডেনশিয়ালের উত্তরসূরি হিসেবে এই সম্পদের মালিক।

আইনি জটিলতা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা

পুরো প্রক্রিয়ায় বড় একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লন্ডনে সম্পাদিত সেই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি। নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশে সম্পাদিত দলিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক সত্যায়ন করার কথা থাকলেও গত ৩৭ বছরেও তা সম্পন্ন করা হয়নি। ফলে ডিসি অফিস এই দলিলের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ পেয়েছে।

ঢাকার ডিসি অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন দখলে থাকা বা খাজনা পরিশোধ জমির মালিকানা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। সরকারি জরিপ রেকর্ডে ৮০ মতিঝিলের এই জমিটি সরকারের নামে রয়েছে।

২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর জীবন বীমা করপোরেশনের প্রকৌশলী ও সম্পত্তি ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজারকে পাঠানো এক চিঠিতে এই দাবি করে ডিসি অফিস। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন ডিসি অফিসের তৎকালীন রেভেনিউ ডেপুটি কালেক্টর রাহুল চন্দ।

‘সরকার বনাম সরকার’ লড়াই

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কার্যত ‘সরকার বনাম সরকার’ লড়াই। সরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আইনি ও প্রশাসনিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। জেবিসি বলছে, তারা বৈধভাবে প্রুডেনশিয়ালের উত্তরসূরি এবং তিন দশকের বেশি সময় ধরে সম্পত্তিটি ব্যবহার করছে।  

অন্যদিকে সরকারি রেকর্ডের ভিত্তিতে জমিটির মালিকানা দাবি করছে ডিসি অফিস।

৮০ মতিঝিলের এই জমির মালিকানা দ্বন্দ্ব নিরসনে ডিসি অফিস থেকে জেবিসি’কে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেয়ায় বিষয়টি এখন আইনি নিষ্পত্তির দিকে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এক্ষেত্রে প্রশাসনিকভাবে সমাধান না হলে আদালতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

জীবন বীমা করপোরেশন এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের এই বিরোধ- সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, ভূমি রেকর্ডের নির্ভুলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আব্দুর রাফিউল আলম ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’কে বলেন, রেকর্ড যার নামে আছে স্বাভাবিকভাবেই সম্পত্তির মালিকও সে। যেহেতু এটা ১ নম্বর খতিয়ান, তাই এটা সরকারি খাস জমি। এ ব্যাপারে কিছু করার এখতিয়ার ডিসি অফিসের নেই। এক্ষেত্রে জেবিসি’কে আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করতে হবে।

বিষয়টি নিয়ে জীবন বীমা করপোরেশনের প্রকৌশল ও সম্পত্তি বিভাগের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সাথে বারবার যোগোযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।