আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন শুধু পরিবেশ, কৃষি বা মানুষের জীবনযাত্রার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ নয়; এটি বিশ্বের দ্রুত সম্প্রসারিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোর জন্যও আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করছে। ভারতের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলোর প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ সম্পদ জলবায়ুজনিত ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত জুরিখ কোটাক জেনারেল ইন্স্যুরেন্স এবং জুরিখ রেজিলিয়েন্স সলিউশনসের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের শুরুতেই জলবায়ু সহনশীলতা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করলে সম্ভাব্য ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের বীমাযোগ্যতা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়বে।
দ্রুত সম্প্রসারণের পথে ভারতের সবুজ জ্বালানি খাত
ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত সম্প্রসারিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতগুলোর একটি। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে দেশটি সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে।
ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট অ-জীবাশ্ম জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য পূরণে দেশটি বড় আকারের সৌর পার্ক, বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণ করছে।
২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতের অ-জীবাশ্ম জ্বালানি সক্ষমতা প্রায় ২৮৩.৫ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে। এর বড় অংশ এসেছে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ খাত থেকে।
তবে দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে নতুন একটি প্রশ্ন সামনে আসছে, ভবিষ্যতের চরম আবহাওয়ার পরিস্থিতিতে এসব বড় বিনিয়োগ কতটা নিরাপদ থাকবে।
৫৫ বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু ঝুঁকির পেছনে রয়েছে যেসব কারণ
জুরিখের গবেষণায় ভারতের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৮৭১টি পরিকল্পিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্প ভারতের সম্ভাব্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতার প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এসব প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা উচ্চ বা অত্যন্ত উচ্চ জলবায়ু ঝুঁকির আওতায় চলে যেতে পারে। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে এসব প্রকল্পের ক্ষতির সম্ভাবনা ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, অতিবৃষ্টি, দাবানল, তাপপ্রবাহ এবং শিলাবৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
কারণ একটি বড় নবায়নযোগ্য প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু যন্ত্রপাতির ক্ষতি হয় না; একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকা, আয় কমে যাওয়া এবং ঋণ পরিশোধে চাপ তৈরির মতো আর্থিক ঝুঁকিও তৈরি হয়।
সৌর প্রকল্পের আধিক্য, তবে ঝুঁকির ধরন আলাদা
ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। জুরিখের বিশ্লেষণ করা ৮৭১টি প্রকল্পের মধ্যে ৫৯৩টি ছিল সৌর প্রকল্প, যা মোট পরিকল্পিত সক্ষমতার প্রায় ৭০ শতাংশ।
তবে সৌর প্রকল্পের ঝুঁকি মূলত আবহাওয়া ও প্রযুক্তিনির্ভর। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, শিলাবৃষ্টি, ঝড় এবং বন্যার কারণে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও এসব প্রকল্পে আর্থিক ঝুঁকি বেশি। কারণ বড় বাঁধ, নির্মাণ অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকৌশল বিনিয়োগের কারণে বড় ধরনের দুর্যোগে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে।
জলবায়ু ঝুঁকিতে নতুন বাস্তবতার মুখে বীমা খাত
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বীমা খাতের ভূমিকাও দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ বড় সৌর পার্ক, বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের আগে ব্যাংক, বিনিয়োগকারী এবং বীমা কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি মূল্যায়ন করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঝুঁকি নির্ধারণ। অতীতের ক্ষতির তথ্য দিয়ে ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকি পুরোপুরি অনুমান করা কঠিন হয়ে উঠছে।
এ কারণে বীমা কোম্পানিগুলোকে এখন উন্নত জলবায়ু মডেলিং, দুর্যোগ ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং প্রকল্পভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
জলবায়ু ঝুঁকি বেশি হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বীমা প্রিমিয়ামও বাড়তে পারে। বিশেষ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অতিরিক্ত তাপপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি-ভিত্তিক প্রিমিয়াম নির্ধারণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ঝুঁকি কমাতে শুরুতেই বিনিয়োগে বড় আর্থিক সুবিধা
জুরিখের গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম বিনিয়োগ করলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিকল্পিত প্রকল্প ব্যয়ের মাত্র ২ শতাংশ অর্থ জলবায়ু সহনশীলতা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করলে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য ক্ষতি এড়ানো যেতে পারে।
এর ফলে সম্ভাব্য মোট ক্ষতি ৫৫ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ, শুরুতেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বিনিয়োগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
এই বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিমুক্ত স্থান নির্বাচন, উন্নত প্রকৌশল নকশা, শক্তিশালী অবকাঠামো, দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থা এবং দ্রুত পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা।
নবায়নযোগ্য প্রকল্পে বীমা সুরক্ষার চাহিদা বাড়ছে
ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাজারের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বীমা খাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পদ বীমা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ক্ষতিপূরণ বীমা, জলবায়ু ঝুঁকিভিত্তিক প্যারামেট্রিক বীমা এবং নির্মাণ ঝুঁকি বীমার চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে বড় আকারের সৌর ও বায়ু প্রকল্পে শুধু সম্পদের ক্ষতি নয়, উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, সেটি মোকাবিলায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ সংক্রান্ত বীমার গুরুত্ব বাড়বে।
অন্যদিকে প্যারামেট্রিক বীমা নির্দিষ্ট জলবায়ু সূচকের ওপর ভিত্তি করে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। ফলে দুর্যোগের পর দ্রুত পুনরুদ্ধারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৫০০ গিগাওয়াট লক্ষ্যের পথে বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু ঝুঁকি
ভারতের ৫০০ গিগাওয়াট অ-জীবাশ্ম জ্বালানি লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে এখন শুধু নতুন প্রকল্প নির্মাণই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এসব প্রকল্পকে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ রাখাও বড় বিষয়।
জলবায়ু দুর্যোগে বড় প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যেতে পারে, সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে।
তাই ভারতের সবুজ জ্বালানি রূপান্তরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু কত দ্রুত সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে তার ওপর নয়; বরং কতটা নিরাপদ, টেকসই এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে তার ওপর।
সরকার, প্রকল্প উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং বীমা কোম্পানির সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ রাখা কঠিন হবে।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।