মিস-সেলিং কমাতে নতুন কমিশন মডেল আনছে ভারতের বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের বীমা খাতে নীতিগত পরিবর্তনের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। ভারতের বীমা নিয়ন্ত্রক ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আইআরডিএআই) এমন একটি কমিশন কাঠামো নিয়ে কাজ করছে, যেখানে এজেন্ট ও ডিস্ট্রিবিউটরদের কমিশন একবারে না দিয়ে ধাপে ধাপে পুরো পলিসি মেয়াদ জুড়ে দেয়া হতে পারে। এর মূল লক্ষ্য হলো বিক্রয়-কেন্দ্রিক চাপ কমিয়ে গ্রাহক-কেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদি সেবা নিশ্চিত করা এবং মিস-সেলিং নিয়ন্ত্রণ করা। ভারত বর্তমানে বিশ্বে অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল বীমা খাত হলেও সেখানে কমিশন-নির্ভর বিক্রয় মডেল দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

বর্তমান ব্যবস্থায় বীমা এজেন্টরা সাধারণত পলিসি বিক্রির শুরুতেই উচ্চ কমিশন পেয়ে থাকেন। লাইফ বীমার ক্ষেত্রে এই উচ্চ কমিশন অনেক সময় প্রিমিয়ামের ১০% থেকে ৪০% পর্যন্ত হতে পারে, আর রিনিউয়্যাল কমিশন তুলনামূলকভাবে কম। এই কাঠামোর কারণে দ্রুত বিক্রির প্রবণতা তৈরি হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রয়োজনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও পণ্য বিক্রির দিকে ঠেলে দেয়। ফলে অনেক পলিসি মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় বা ল্যাপস করে। এই ধরনের কমিশন কাঠামোকে আন্তর্জাতিকভাবে 'আপফ্রন্ট-হেভি ইনসেন্টিভ মডেল' বলা হয়, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ধীরে ধীরে কমিয়ে আনছে।

ভারতের বীমা খাত বর্তমানে প্রায় ১১.৯ ট্রিলিয়ন রুপি বার্ষিক প্রিমিয়াম সংগ্রহে পৌঁছেছে, তবে বীমা প্রবেশ হার এখনো প্রায় ৩.৭ শতাংশের কাছাকাছি সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ কমিশন, ভুল বিক্রয় এবং পলিসি ল্যাপস এই সীমিত প্রবেশ হারের অন্যতম কারণ। বিশেষ করে লাইফ বীমা ও বিনিয়োগ-সংযুক্ত (ইউএলআইপি ধরনের) পণ্যে মিস-সেলিং বেশি দেখা যায়, যেখানে গ্রাহকরা দীর্ঘমেয়াদে প্রিমিয়াম চালিয়ে যেতে না পেরে পলিসি বন্ধ করে দেন।

নতুন কমিশন প্রস্তাবে বলা হচ্ছে, কমিশন আর শুরুতেই সম্পূর্ণভাবে দেয়া হবে না। বরং পলিসির মেয়াদ অনুযায়ী ধাপে ধাপে প্রদান করা হবে এবং পলিসি যতদিন সক্রিয় থাকবে, ততদিন কমিশন চলবে। এতে বিক্রয় নয়, বরং 'পলিসি রিটেনশন' বা পলিসি ধরে রাখার বিষয়টি মূল সূচক হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে ব্যাংকাস্যুরেন্স ও প্রচলিত এজেন্ট মডেলের মধ্যে কমিশন পার্থক্য পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনাও রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে ওইসিডি দেশগুলোতে এ ধরনের লেভেল কমিশন বা স্প্রেড কমিশন মডেল ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করাই মূল উদ্দেশ্য।

ভারতের বীমা খাতে বর্তমানে ৬০টিরও বেশি কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া খাতের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, বিশেষ করে লাইফ বীমা খাতে। বেসরকারি খাতে আইসিআইসিআই প্রুডেনশিয়াল লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং এইচডিএফসি লাইফ ইন্স্যুরেন্স উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। নন-লাইফ বীমা খাতেও আইসিআইসিআই লম্বার্ড-এর মতো প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা বাড়িয়েছে। এই প্রতিযোগিতার কারণে বিক্রয় চাপ আরও বেড়েছে, যা কমিশন-ভিত্তিক মিস-সেলিং ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

আইআরডিএআই চেয়ারম্যান অজয় শেঠ সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে কমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কাঠামো নিয়ে একটি পরামর্শপত্র শিগগিরই প্রকাশ করা হতে পারে। এটি প্রথমে খসড়া আকারে আসবে এবং এরপর শিল্পখাত, ব্যাংক, এজেন্ট ও বীমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। অতীতে আইআরডিএআই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করেছে, যেমন ইউএলআইপি পণ্যের চার্জ কাঠামো নিয়ন্ত্রণ এবং খরচ সীমা নির্ধারণ। ফলে এই নতুন উদ্যোগকে খাতের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো বাজারে দীর্ঘদিন ধরে লেভেল কমিশন এবং রিনিউয়্যাল-বেইজড ইনসেন্টিভ ব্যবস্থার দিকে ঝোঁক বাড়ছে। এতে বিক্রয় প্রতিনিধিরা শুধু নতুন পলিসি বিক্রি নয়, বরং গ্রাহক ধরে রাখার ওপরও সমান গুরুত্ব দেন। ওইসিডি-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ধরনের মডেল গ্রাহক সুরক্ষা বৃদ্ধি করে এবং পলিসি ল্যাপস রেট কমাতে সাহায্য করে। ফলে খাতে স্থিতিশীলতা বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে বীমা কোম্পানির আস্থাও শক্তিশালী হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে স্বল্পমেয়াদে কিছু এজেন্টের আয় কমতে পারে এবং ছোট ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক চাপের মুখে পড়তে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি খাতকে বেশি স্বচ্ছ, স্থিতিশীল এবং গ্রাহক-বান্ধব করবে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে বিক্রয়-কেন্দ্রিক মডেল থেকে সেবা ও আস্থা-কেন্দ্রিক মডেলে রূপান্তর, যা ভারতের বীমা খাতকে আরও পরিণত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।