আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পর একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু চিকিৎসার ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘ সময়ের জন্য আয় কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া। কেমোথেরাপি, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও হাসপাতালে ভর্তির খরচের পাশাপাশি কর্মক্ষমতা কমে গেলে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে।
এই বাস্তবতায় ভারতের লাইফ বীমা কোম্পানি টাটা এআইএ লাইফ ইন্স্যুরেন্স নতুন ধরনের ক্যান্সার সুরক্ষা পণ্য চালু করেছে, যেখানে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি আয় সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
টাটা এআইএ’র নতুন দুটি পণ্য হলো সম্পূর্ণ কেয়ার ক্যান্সার এবং সম্পূর্ণ কেয়ার ক্যান্সার ফান্ড। কোম্পানির লক্ষ্য হলো, ক্যান্সারের মতো গুরুতর রোগের সময় গ্রাহক ও তার পরিবারকে শুধু চিকিৎসা ব্যয়ের সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা দেয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অধীন ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি)-এর গ্লোবোক্যান ২০২২ তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রতি বছর ১৪ লাখ ১৩ হাজার ৩১৬ জন নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৯ লাখ ১৬ হাজার ৮২৭ জন ক্যান্সারে মারা যান। দেশটিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ক্যান্সারের মধ্যে রয়েছে স্তন ক্যান্সার, মুখ ও গলার ক্যান্সার, জরায়ুমুখ ক্যান্সার, ফুসফুস ক্যান্সার এবং খাদ্যনালির ক্যান্সার।
ভারতে ক্যান্সারের আর্থিক বোঝা দ্রুত বাড়ছে। ক্যান্সারের ধরন ও চিকিৎসার পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা ব্যয় কয়েক লাখ থেকে কয়েক দশ লাখ রুপি পর্যন্ত হতে পারে। বিশেষ করে উন্নত চিকিৎসা, দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ এবং বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে খরচ আরও বেড়ে যায়। ভারতের স্বাস্থ্য খাতে পরিবারের নিজস্ব অর্থ ব্যয়ের চাপ এখনো বড় বিষয়। সরকারি ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস (এনএইচএ) ২০২২-২৩ অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের মধ্যে পরিবারের নিজস্ব অর্থ ব্যয়ের অংশ ছিল ৪৩.৪ শতাংশ। যদিও এটি ২০১৩-১৪ সালের ৬৪.২ শতাংশ থেকে কমেছে, তবুও চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ এখনো পরিবারকেই বহন করতে হয়।
এই আর্থিক বাস্তবতায় টাটা এআইএ’র নতুন ক্যান্সার পলিসিতে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ রুপি পর্যন্ত কভারেজ নেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। পলিসিহোল্ডার চাইলে ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পর পুরো অর্থ এককালীন নিতে পারেন, আবার নিয়মিত মাসিক আয়ের আকারেও সুবিধা নিতে পারেন। এছাড়া একাংশ এককালীন এবং বাকি অংশ নিয়মিত আকারে নেয়ার বিকল্প রয়েছে। সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত আয় সুবিধা চিকিৎসাকালীন পরিবারের দৈনন্দিন খরচ পরিচালনায় সহায়তা করতে পারে।
টাটা এআইএ জানিয়েছে, গ্রাহকদের পরিবর্তিত চাহিদা বিবেচনা করেই এসব পণ্য তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক গ্রাহক গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে এককালীন অর্থের পাশাপাশি নিয়মিত আয়ের সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। নতুন পণ্যগুলোতে ৩০ বছরের গ্যারান্টিযুক্ত প্রিমিয়াম সুবিধা, প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সার শনাক্তকরণ সহায়তা এবং বিদেশে চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত কভার সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
ভারতের লাইফ বীমা খাতে টাটা এআইএ অন্যতম উল্লেখযোগ্য বেসরকারি লাইফ বীমা কোম্পানি। কোম্পানির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত মৃত্যু দাবি নিষ্পত্তির হার ৯৯ শতাংশের বেশি, যা দাবি নিষ্পত্তিতে কোম্পানির সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। টাটা এআইএ’র ব্যবস্থাপনায় থাকা সম্পদের পরিমাণও কয়েক দশ হাজার কোটি রুপির বেশি, যা কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতার একটি নির্দেশক।
তবে ৫০ লাখ রুপির কভারেজ বর্তমান ক্যান্সার চিকিৎসার তুলনায় কতটা পর্যাপ্ত- এ প্রশ্নও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক ও মাঝারি পর্যায়ের চিকিৎসার জন্য এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিতে পারে। তবে জটিল ক্যান্সার, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা বা বিদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আর্থিক পরিকল্পনার প্রয়োজন হতে পারে।
ভারতের প্রচলিত স্বাস্থ্যবীমা সাধারণত হাসপাতাল ভর্তি, চিকিৎসা ও নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য ব্যয় কভার করে। কিন্তু রোগের কারণে আয় বন্ধ হওয়া, পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের প্রয়োজন সবসময় পূরণ করতে পারে না। এ কারণেই ক্রিটিক্যাল ইলনেস ইন্স্যুরেন্স বা গুরুতর রোগভিত্তিক বীমার গুরুত্ব বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপানের মতো উন্নত বীমা খাতে ক্রিটিক্যাল ইলনেস পণ্য দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর রোগ শনাক্ত হওয়ার পর আর্থিক সহায়তার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতেও এখন লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন গুরুতর রোগের জন্য আলাদা সুরক্ষা পণ্য চালু করছে।
বীমা খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বড় প্রটেকশন গ্যাপ কমাতে রোগভিত্তিক বীমা পণ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভবিষ্যতে ভারতের বীমা শিল্প শুধু চিকিৎসা খরচ পরিশোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং রোগের সময় পরিবারকে আর্থিকভাবে সচল রাখার দিকে বেশি গুরুত্ব দেবে। টাটা এআইএ’র নতুন ক্যান্সার সুরক্ষা পণ্য সেই পরিবর্তিত বীমা ধারণারই একটি উদাহরণ।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।