সঠিকভাবে আর্থিক প্রতিবেদন জমা না দেয়ায়

স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সকে সতর্ক করবে বিএসইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক: বেসরকারি নন-লাইফ বীমা কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিজিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) । নিবন্ধন সনদ বাতিল থাকাকালে সঠিকভাবে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়ায় কোম্পানিটির বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেনের সভাপতিত্বে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ৬৪০তম কমিশন সভায় কোম্পানিটিকে সতর্ক করার এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নির্বাহী পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বিএসইসি।

বিএসইসি'র সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত বছরের নিরীক্ষিত হিসাব বিবরণী এবং ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ সমাপ্ত প্রথম প্রান্তিকের হিসাব বিবরণী সময়মত কমিশনে জমা দিতে পারেনি।

এর মাধ্যমে কোম্পানিটি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ রুল ১৯৮৭ এর রুল ১২, সাব-রুল (৩এ) এবং ২০০৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর দেয়া কমিশনের নির্দেশনা লঙ্ঘন করেছে। এসব আইন লঙ্ঘনের কারণে কোম্পানিটিকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

যে সময়ের হিসাব বিবরণী সঠিক সময়ে জমা দিতে না পারার অভিযোগে স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সকে বিএসইসি সতর্ক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই সময় বীমাখাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নির্দেশে কোম্পানিটির নিবন্ধন সনদ বাতিল অবস্থায় ছিল।

পুনঃবীমায় অনিয়ম করার কারণে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ বীমা কোম্পানির নিবন্ধন সনদ ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে বাতিল করে আইডিআরএ। অবশ্য পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে কোম্পানিটির নিবন্ধন সনদ আবার ফিরিয়ে দেয়া হয়।

বীমা কোম্পানিটির নিবন্ধন সনদ বাতিলের বিষয়ে সে সময় আইডিআরএ থেকে জানানো হয়, পুনঃবীমা সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সের নিবন্ধন সনদ বাতিল করা হয়েছে। বীমা কোম্পানিটি পুণঃবীমা সংক্রান্ত এ অনিয়ম করে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের পলিসিতে। ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর কোনবাড়িতে গ্রুপটির বহুতল একটি ভবন আগুনে পুড়ে যায়। এরপর এই অগ্নিকাণ্ডের বীমা দাবির টাকা তুলতে অনিয়মের আশ্রয় নেয়ার অভিযোগ উঠে গ্রুপটির বিরুদ্ধে।

এ অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করে আইডিআরএ। ওই তদন্ত প্রতিবেদনে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ, স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স, রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা করপোরেশন ও ক্ষয়ক্ষতি জরিপকারী প্রতিষ্ঠাগুলোর পারস্পরিক যোগসাজশের চিত্র উঠে আসে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুণ্ঠনের চেষ্টা চালানো হয় বলে আইডিআরএ’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এ কারণে প্রথমে ২০১৫ সালের ২১ জুন থেকে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন সনদ তিন মাসের জন্য স্থগিত করে আইডিআরএ। একই সঙ্গে নিবন্ধন সনদ কেন বাতিল করা হবে না ৩০ দিনের মধ্যে তার কারণ দর্শাতে বলা হয়।

পাশাপাশি নিবন্ধন সনদ স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কোন নতুন বীমা কাভারনোট, বীমা সার্টিফিকেট বা বীমা পলিসি জারি (ইস্যু) না করার নির্দেশ দেয়া হয়। তবে ২১ জুনের আগে জারিকৃত বীমা পলিসির কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সুযোগ রাখা হয়।

তার আগে ৩১ মে স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স আইডিআরএকে দেয়া এক চিঠিতে স্বীকার করে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ’র কিছু বীমা পলিসির ক্ষেত্রে মোট ৪৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকার ঝুঁকি পুনঃবীমা করা হয়নি। এরই প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির সনদ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় আইডিআরএ।

নিবন্ধন সনদ স্থগিতের বিষয়ে আইডিআরএ স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সকে জানায়, সন্তোষজনকভাবে পুনঃবীমা ব্যবস্থা গ্রহণে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে বীমা আইন, ২০১০ এর ১০(১) (ঝ) ধারার বিধান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির সনদ বাতিল যোগ্য। কোম্পানি চাইলে নির্দেশের বিষয়ে বিধি মোতাবেক শুনানিতে অংশগ্রহণ করতে পারে।

এরপর আইডিআরএ’র নির্দেশনাকে চ্যালেঞ্জ করে ২৯ জুন স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স হাইকোর্টে রিট (নম্বর-৬৫৮০) করলে আদালত স্থগিতাদেশ দেয়। পরে এই আদাশের বিরুদ্ধে আইডিআরএ আপিল করলে ৬ জুলাই হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেন চেম্বার আদালত।

একই সঙ্গে ৪ সপ্তাহের মধ্যে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গবেঞ্চে যাওয়ার অনুমতি দেন। এরপর পূর্ণাঙ্গবেঞ্চে আপিল করলে আদালত ৩০ জুলাই শুনানীর দিন ধার্য করেন। এরই প্রেক্ষিতে ৩০ জুলাই প্রধান বিচারপ্রতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের পূর্ণাঙ্গবেঞ্চ শুনানী শেষে চেম্বার আদালতের রায় বহাল রাখেন। একই সঙ্গে হাইকোর্টে রিট মামলাটি (নম্বর-৬৫৮০) নিস্পত্তি করতে নির্দেশ দেন।

তবে পরবর্তীতে স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স হাইকোর্টে না গিয়ে মামলাটি তুলে নেয়। এরপর দ্বিতীয় দফায় আইডিআরএ প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন সনদ আরও দুই মাস স্থগিত করে। তার পর ১০ নভেম্বর স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স’র নিবন্ধন সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় আইডিআরএ, যা ওই মাসের ১৫ তারিখ থেকে কার্যকর করা হয়।