নির্ধারিত সীমার নিচে পপুলার লাইফের ব্যবস্থাপনা ব্যয়
মোস্তাফিজুর রহমান: ২০১৬ সালে পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা ব্যয় নির্ধারিত সীমার চেয়ে কমেছে। তবে একইসঙ্গে কমে গেছে কোম্পানিটির নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ, লাইফ ফান্ড ও বিনিয়োগ। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষে দাখিল করা পপুলার লাইফের হিসাব অনুসারে, ২০১৬ সালে ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। লাইফ ফান্ড কমেছে ১১.২২ শতাংশ, বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ এবং নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ কমেছে প্রায় ৪৩ শতাংশ।
বীমা বিশ্লেষকদের মতে, লাইফ ফান্ড ও নবায়ন প্রিমিয়াম আয় লাইফ বীমা কোম্পানির মূল ভিত্তি। আইন অনুসারেই প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম সংগ্রহে ব্যয় বেশি হয়। তাই কোম্পানির আর্থিক ভিত শক্তিশালী করে নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ। কোম্পানির ফান্ড বৃদ্ধি পেলেই উদ্বৃত্ত বাড়ে, তাতে পলিসি গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার উভয়েই লাভবান হয়।
অন্যদিকে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বলছে, দাবি পরিশোধের পরিমাণ বেশি হওয়ায় লাইফ ফান্ড কমে গেছে। তবে দাবি পরিশোধের কারণে কোম্পানির দায়ও কমে গেছে। কোনো বছরে দাবির পরিমাণ বেশি হলে লাইফ ফান্ড কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। অন্যদিকে সম্প্রতি ব্যাংক রেট কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ থেকে আয় কমে গেছে।
২০১৬ সালে সীমার নিচে ব্যবস্থাপনা ব্যয়:
২০১৬ সালে এসে কোম্পানিটি অনুমোদিত সীমার চেয়েও প্রায় ১০ শতাংশ কম ব্যয় করেছে। এ বছরে ২৭৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন থাকলেও ব্যয় করেছে ২৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ অনুমোদিত সীমার চেয়ে ২৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা কম ব্যয় করেছে।
তবে পপুলার লাইফের বিগত ৫ বছরের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১২ সাল থেকে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হার ছিল নিম্নমুখী। ২০১২ সালে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা ব্যয় করে ২৮০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। আর ব্যয়ের অনুমোদন ছিল ২১৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। সে হিসাবে কোম্পানিটি ৬৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বেশি ব্যয় করেছে। যা অনুমোদিত ব্যয়ের ৩০ শতাংশ বেশি।
একইভাবে ২০১৩ সালে কোম্পানিটি অতিরিক্ত ব্যয় করে ১৮ শতাংশের বেশি। ব্যয়ের অনুমোদন ছিল ২১২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ব্যয় করেছে ২৫২ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে কোম্পানিটি ব্যয় করেছে ২৫২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। কিন্তু ব্যয়ের অনুমোদন ছিল প্রায় ২২০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। সে হিসাবে অতিরিক্ত ব্যয় করে ৩২ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা প্রায় ১৫ শতাংশ। ২০১৫ সালে ২২৮ কোটি ১ লাখ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন থাকলেও কোম্পানিটি ব্যয় করেছে ২৪৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা। সে হিসাবে অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ১৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা, যা ৭ শতাংশের কিছু বেশি।
৩১৬ কোটি টাকা লাইফ ফান্ড কমেছে ২০১৬’তে:
২০১৬ সালে এসে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ডের কোন প্রবৃদ্ধি হয়নি, উল্টো ২০১৫ সাল শেষে যে লাইফ ফান্ড ছিল তার থেকে ৩১৬ কোটি টাকা কমে গেছে। লাইফ ফান্ড কমার এ হার ১১.২২ শতাংশ। ২০১৬ সালে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ড দাঁড়িয়েছে ২৫০৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
মূলত কোম্পানির লাইফ ফান্ডের প্রবৃদ্ধি কমে যেতে শুরু করে ২০১২ সালের পর থেকেই। ২০১২ সালে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ড ছিল ২০৭১ কোটি ২৬ লাখ টাকা, বৃদ্ধির হার ছিল ২৭.৪৩ শতাংশ। ২০১৩ সালে লাইফ ফান্ড ছিল ২৪৭৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা, বৃদ্ধির হার ছিল ১৯.৭০ শতাংশ। ২০১৪ সালে লাইফ ফান্ড ছিল ২৮০১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, বৃদ্ধির হার ছিল ১৩ শতাংশ। ২০১৫ সালে লাইফ ফান্ড ছিল ২৮২০ কোটি ৬২ লাখ, বৃদ্ধির হার ০.৬৮ শতাংশ।
নতুন প্রিয়িমাম সংগ্রহে ৫ বছরে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি ২০১৬’তে:
২০১২ সাল থেকেই পপুলার লাইফের প্রথম বর্ষ ও নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহে প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করে। ২০১২ সালে ২৮০ কোটি ১৪ লাখ টাকা প্রথম বর্ষ প্রিমিয়িাম সংগ্রহ করে। প্রবৃদ্ধি হয় দশমিক ৩৬ শতাংশ। ২০১৩ সালে ১৫৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম আয় করে, প্রবৃদ্ধি হয় দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নতুন প্রিমিয়াম সংগ্রহের হার কমে যায় দশমিক ৩২ শতাংশ।
তবে প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম সংগ্রহের অবস্থা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে ২০১৪ সালে। এ বছরে ১৬১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে। প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৫ সালে এসে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। বছরটিতে প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে ১৭০ কোটি টাকা।
তবে প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম সংগ্রহের এ হারে ব্যাপক পরিবর্তন আসে সর্বশেষ হিসাব সমাপনী বছর ২০১৬ সালে। এ বছর ২৫০ কোটি ১ লাখ টাকা প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম সংগ্রহ করায় প্রবৃদ্ধি হয় ৪৭ শতাংশ। যা বিগত ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ কমছে ৪ বছর ধরে:
কোম্পানিটির নবায়ন প্রিমিয়াম আয়ও কমছে গত ৪ বছর ধরে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থা দেখা গেছে ২০১৬ সালে। এ বছরে নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ আগের বছরের তুলনায় ৪৩ শতাংশ কমে যায়। যা বিগত ৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আলোচ্য বছরে নবায়ন প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ৩৫০ কোটি ১২ লাখ টাকা। যা আগের বছর ২০১৫ ছিল ৫০০ কোটি ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নবায়ন সংগ্রহ ১৪৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা কমে গেছে।
আবার ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে দশমিক ১৭ শতাংশ কম নবায়ন সংগ্রহ হয়। ২০১৪ সালে নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ ছিল ৫০০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এর আগে ২০১৩ সালে নবায়ন প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ৪৮৫ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা ২০১২ সালের চেয়ে ২১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা কম। অর্থা ২০১৩ সালে ৪ শতাংশেরও বেশি প্রিমিয়াম আয় কমে যায়। ২০১২ সালে নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ দাঁড়ায় ৫০৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। প্রবৃদ্ধি হয় ১২ শতাংশ। ২০১১ সালে নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ ছিল ৪৫০ কোটি ৬২ লাখ টাকা। প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ ।
কমেছে বিনিয়োগ ও বিনিয়োগ থেকে আয়:
২০১২ সাল থেকেই পপুলার লাইফের বিনিয়োগেও প্রবৃদ্ধি ছিল নিম্নমুখী। ২০১৬ সালে এসে বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি তো হয়নি বরং ২০১৫ সালের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ কমে গেছে। আলোচ্য বছরে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২১৯ কোটি ৭ লাখ টাকা। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে যার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৪৯৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, বছরটিতে বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ শতাংশের কম। এছাড়া ২০১৪ সালে বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ, ২০১৩ সালে ২০ শতাংশ এবং ২০১২ সালে প্রায় ২৯ শতাংশ।
কোম্পানিটির ইনভেস্টমেন্ট রিটার্নও কমে গেছে ২০১৬ সালে। ২০১৫ সালের তুলনায় বছরটিতে রিটার্ন কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। ২০১৬ সালে কোম্পানিটির ইনভেস্টমেন্ট রিটার্নের পরিমাণ ১৮৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা। আগের বছরে যার পরিমাণ ছিল ২৪২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, এসময় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৩ শতাংশ। এরআগে ২০১২ সালে প্রায় ৬৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। তবে ২০১৩ সালে এসে প্রবৃদ্ধির ধারা কমতে শুরু করে। আলোচ্য বছরে ইনভেস্টমেন্ট রিটার্নের পরিমাণ ১৯২ কোটি ২৮ লাখ টাকা, প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৮ শতাংশ। ২০১৪ সালে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়ে রিটার্নের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
কমে এসেছে লায়াবিলিটি:
পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষের মতে, ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ পরিমাণ দাবি পরিশোধের কারণে কোম্পানির লায়াবিলিটি বা দায় কমে আসছে। আইডিআরএ দাখিল করা তথ্য অনুসারে, ২০১২ সালে কোম্পানিটির নেট লায়াবিলিটি'র পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৭৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৪ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৬১৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। তবে ২০১৫ সালে এসে নেট লায়াবিলিটির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৫২৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা। আর ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ দাবি নিষ্পত্তির কারণে বছরটিতে নেট লায়াবিলিটির পরিমাণ আরো কমে যাবে।
বেড়েছে দাবি পরিশোধ:
আইডিআরএ'তে দাখিল করা কোম্পানির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সর্বশেষ ২০১৬ সালে এসে কোম্পানিটি সর্বোচ্চ পরিমাণে দাবি পরিশোধ করে। বছরটিতে ১০ লাখ ১৫ হাজার ৬৭৩টি দাবির বিপরীতে ৮১২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা পরিশোধ করে।
তবে ২০১৪ সালের পর থেকেই কোম্পানিটির দাবি পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে। বছরটিতে ৭৪ হাজার ৬৬৯টি দাবি পরিশোধ করেছে। যা পরিমাণ ২৫১ কোটি ১ লাখ টাকা। এরআগে ২০১৫ সালে কোম্পানিটি ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৮৩৯টি দাবিতে পরিশোধ করে ৬০৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
এসব বিষয়ে কোম্পানির মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিএম ইউসুফ আলী বলেন, ২০১৪ সালে আমাদের মেয়াদপূর্তি শুরু হয়। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে মেয়াদ উত্তীর্ণ পলিসির সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। ফলে নবায়ন প্রিমিয়াম ও লাইফ ফান্ডে প্রভাব ফেলে। একদিকে পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নবায়ন কমে যায়, অন্যদিকে মেয়াদ উর্ত্তীণ দাবি পরশোধের কারণে লাইফ ফান্ড কমে যায়। তাছাড়া ব্যাংকের সুদের হার কমে যাওয়ায় আমাদের বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যায়।
তবে আশার কথা হচ্ছে, আমাদের নতুন পলিসি বাড়ছে। আগামী দু'/এক বছরের মধ্যেই লাইফ ফান্ডের ঘাটতি পূরণ হবে। একইসঙ্গে বিনিয়োগ বাড়বে। ২০১২ সাল থেকে গোটা লাইফ বীমাখাতেই প্রিমিয়াম সংগ্রহ কমে যায়। আমরা এর প্রভাবের বাইরে ছিলাম না, বলেন পপুলার লাইফের মূখ্য নির্বাহী বিএম ইউসুফ আলী।