বেশি ব্যয় ও তামাদির ফাঁদে ডায়মন্ড লাইফ

নিজস্ব প্রতিবেদক: আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি এবং অস্বাভাবিক হারে প্রিমিয়াম তামাদির ফাঁদে আটকে আছে ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স। ফলে তহবিল গঠন করেত পারছে না ২০১৪ সালে অনুমোদন পাওয়া বেসরকারি এই বীমা কোম্পানি। অথচ প্রতিবছরই বাড়ছে কোম্পানিটির দায়। এ অবস্থায় বীমা গ্রাহকের দায় পরিশোধ নিয়ে ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তামাদি ও খরচের পরিমাণ কমাতে না পারলে কোম্পানির শক্তিশালী তহবিল গড়ে উঠবে না। যার প্রভাব পড়বে পুরো বীমাখাতেই। তাই কোম্পানি পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের এর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার পাশাপাশি কোনো অনিয়মের কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে কিনা তা খুঁজে দেখতে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার তদারকি প্রয়োজন।

ডায়মন্ড লাইফের বিগত পাঁচ বছরের ৩১ ডিসেম্বর ব্যবসা সমাপনী হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে কোম্পানিটির মোট প্রিমিয়াম সংগ্রহ ১৩ কোটি ৯ লাখ। আর মোট খরচ ১৩ কোটি ৭৬ টাকা। ফলে তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে ৬৭ লাখ টাকা। এর আগে ২০১৮ সালে মোট প্রিমিয়াম সংগ্রহ ছিল ১১ কোটি ৭ লাখ টাকা এবং মোট খরচ ১২ কোটি ৭৯ টাকা। তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা।

এর আগে ২০১৭ সালে কোম্পানিটির মোট প্রিমিয়াম সংগ্রহ ছিল ১২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা এবং মোট খরচ ১৩ কোটি ৫১ টাকা। সে বছর তহবিল থেকে ব্যয় হয় ৮৩ লাখ টাকা। ২০১৬ সালে মোট প্রিমিয়াম সংগ্রহ ৪ কোটি টাকা এবং মোট খরচ ৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা। তহবিল থেকে ব্যয় ৮৩ লাখ টাকা। আর ২০১৫ সালে মোট প্রিমিয়াম সংগ্রহ ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং মোট খরচ ১১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ফলে তহবিল থেকে ব্যয় হয় ২ কোটি ১১ লাখ টাকা।

প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামের ৯৩% পর্যন্ত তামাদি

ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সংগৃহীত প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামের ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত তামাদি হয়েছে দ্বিতীয় বর্ষে। অর্থাৎ বীমা গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রথম বছরে যে পরিমাণ প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেছে দ্বিতীয় বছরে তার ৭ শতাংশ নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে বীমা কোম্পানিটি। গেলো চার বছরে সর্বোচ্চ ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত দ্বিতীয় বর্ষ নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেছে ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

তথ্য অনুসারে, ২০১৫ সালে কোম্পানিটি ৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে। যা থেকে ২০১৬ সালে দ্বিতীয় বর্ষ বা নবায়ন প্রিমিয়াম আসে ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বাকী ৯৩ শতাংশ বা ৮ কোটি ১১ লাখ টাকার পলিসি নবায়ন হয়নি। একইভাবে ২০১৬ সালে সংগৃহীত ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা প্রিমিয়ামের দ্বিতীয় বর্ষ নবায়ন আসে ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা, বাকী ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা বা ৬৩ শতাংশ প্রিমিয়াম তামাদি।

এ ছাড়াও ২০১৭ সালে সংগৃহীত ১০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা প্রিমিয়ামের দ্বিতীয় বর্ষ নবায়ন আসে ১ কোটি ৯১ লাখ টাকা, বাকী ৯ কোটি ৭ লাখ টাকা বা ৮৩ শতাংশ প্রিমিয়াম তামাদি হয়েছে। একইভাবে ২০১৮ সালে সংগৃহীত ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা প্রিমিয়ামের দ্বিতীয় বর্ষ নবায়ন আসে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, আর বাকী ৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বা ৭৮ শতাংশ প্রিমিয়াম তামাদি।

প্রিমিয়াম আয়ের ৩২% অতিরিক্ত ব্যয়

সংগৃহীত প্রিমিয়ামের ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত তামাদি হলেও অতিরিক্ত ব্যয় কমাতে পারেনি ডায়মন্ড লাইফ। অথচ আইন অনুসারে অতিরিক্ত ব্যয় অবৈধ। গেলো পাঁচ বছরে কোম্পানিটি অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ১৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। যা আলোচ্য সময়ে সংগৃহীত মোট প্রিমিয়ামের ৩২ শতাংশ। এই ব্যয় করা হয়েছে কমিশন, উন্নয়ন কর্মকর্তাদের বেতন, প্রশাসনিক ও অন্যান্য খাতে।

সূত্র মতে, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই পাঁচ বছরে ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থাপনা খাতে সর্বমোট ব্যয় করেছে ৫৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অথচ ব্যয়ের অনুমোদন ছিল ৪১ কোটি ৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০১৯ সালে কোম্পানিটি অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা ওই বছরের মোট প্রিমিয়ামের ৩২ শতাংশ।

২০১৮ সালে অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বা মোট প্রিমিয়ামের প্রায় ৪৩ শতাংশ। ২০১৭ সালে অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বা মোট প্রিমিয়ামের ২২ শতাংশের বেশি, ২০১৬ সালে ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বা মোট প্রিমিয়ামের ৩৯ শতাংশ এবং ২০১৫ সালে ২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বা মোট প্রিমিয়ামের ৩০ শতাংশের বেশি ।

লাইফ ফান্ডের হিসাবে গড়মিল তথ্য

গড়মিল তথ্য দিয়ে লাইফ ফান্ডের হিসাব দিয়েছে ২০১৪ সালে অনুমোদন প্রাপ্ত ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স। গড়মিলের এ চিত্র পাওয়া গেছে আইডিআরএ’র কাছে দাখিল করা কোম্পানিটির ২০১৮ ও ২০১৯ সালের ব্যবসা সমাপনী প্রতিবেদনে।

২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৮ সালে লাইফ ফান্ডের সমাপনী তহবিলে ঘাটতি ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। যা পরের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের প্রারম্ভিক তহবিল। অথচ প্রতিবেদনটিতে তা (প্রারম্ভিক তহবিল) দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ একই প্রতিবেদনে সমাপনী তহবিল ও প্রারম্ভিক তহবিলে ৫৭ লাখ টাকা কম-বেশি করা হয়েছে।

এর আগে ২০১৮ সালের ব্যবসা সমাপনী হিসাবে কোম্পানিটি ২০১৮ সালে লাইফ ফান্ডের সমাপনী তহবিলে ঘাটতি দেখিয়েছে ৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অথচ ২০১৯ সালের ব্যবসা সমাপনী হিসাবে কোম্পানিটি ২০১৮ সালে লাইফ ফান্ডের সমাপনী তহবিলে ঘাটতি দেখিয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অথাৎ ২০১৮ ও ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে প্রারম্ভিক ও সমাপনি তহবিলে ৯২ লাখ টাকা কম-বেশি করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠার ছয় বছরেও ঘাটতিতে লাইফ ফান্ড

অনুমোদিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত খরচ করায় লাইফ ফান্ডের ঘাটতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি ডায়মন্ড লাইফ। প্রতিষ্ঠার ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও লাইফ ফান্ডে প্রকৃত ঘাটতি রয়েছে ৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। যদিও আইডিআরএ’তে দাখিলকৃত হিসাব বিবরনীতে কোম্পানিটি লাইফ ফান্ডে ঘাটতি উল্লেখ করেছে ৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

তথ্য অনুসারে, ২০১৫ সালে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ডে ঘাটতি ছিল ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এরপর ২০১৬ সালে আরো ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা খরচ হলে লাইফ ফান্ডে ঘাটতি দাঁড়ায় ২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। ২০১৭ সালে আরো ৪১ লাখ টাকা ভাঙা পড়লে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

এরপর ২০১৮ সালে আরো ৫৭ লাখ টাকা খরচ হলে লাইফ ফান্ডে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে ২০১৯ সালে কোম্পানিটির প্রারম্ভিক ফান্ড ৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। ওই বছর ৭৪ লাখ টাকা লাইফ ফান্ডে যোগ করায় সমাপনী লাইফ ফান্ড দাঁড়ায় ৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। অথচ কোম্পানিটি তা দেখিয়েছে ৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

সরকারের পাওনা লাইসেন্স ফি কোম্পানির ফান্ডে

আয়ের হিসাবেও গরমিল তথ্য দিয়েছে ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটি লাইসেন্স ফি বাবদ প্রাপ্ত সরকারি অর্থ কোম্পানির নীট আয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালের ব্যবসা সমাপনী প্রতিবেদনে এফডিআর ও অন্যান্য খাত থেকে প্রাপ্ত আয়ের বিবরণীতে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

অথচ আইন অনুসারে উন্নয়ন কর্মী ও কর্মকর্তাদের এজেন্সি লাইসেন্স ও সার্টিফিকেটের জন্য প্রাপ্ত অর্থ বীমা কোম্পানির আয় হিসেবে দেখানোর কোন সুযোগ নেই। এই খাতে প্রাপ্ত অর্থের সম্পূর্ণটাই আইডিআরএ’র নিকট লাইসেন্স/ সার্টিফিকেট ফি বাবদ জমা দিতে হয়।

প্রিমিয়ামের টাকা যাচ্ছে না বিনিয়োগে

বীমা গ্রাহকের জমা করা প্রিমিয়াম থেকে নির্ধারিত খরচ বাদে বাকী টাকা সরকারি-বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও বীমা গ্রাহকের কোন টাকা বিনিয়োগ করতে পারেনি ডায়মন্ড লাইফ। অতিরিক্ত খরচের নামে সব টাকাই খেয়ে ফেলেছে বীমা কোম্পানিটি।

বর্তমানে কোম্পানিটির মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যার মধ্যে সরকারি খাতে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ১২ কোটি ২০ লাখ টাকা। অথচ কোম্পানিটির প্রারম্ভিক পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১৮ কোটি টাকা।

বিধান অনুসারে কোম্পানির প্রারম্ভিক পরিশোধিত মূলধনের পুরো অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। এ ছাড়াও কোম্পানি শুরুর প্রাক্কালে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মালিকপক্ষকে সরাসরি বিনিয়োগ করতে হয় এবং কোম্পানি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তা উঠানো যায় না।

এ বিষয়ে ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পিপুল বিশ্বাস’র সঙ্গে ইন্স্যুরেন্সনিউজবিডি’র পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।