যেসব কারণে বীমার টাকা দিতে পারছে না সানলাইফ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠান সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ না করে হয়রানি করছে। এর প্রমাণ পেয়েছে বীমাখাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। সংস্থাটির গঠিত তদন্ত দল তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ভোগান্তির শিকার এসব গ্রাহকের অনেকের বীমার মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালে। প্রতিবেদনটিতে কী কারণে কোম্পানিটি গ্রাহকদের টাকা দিতে পারছে না তার কিছু কারণ চিহ্নিত করেছে। যার মধ্যে রয়েছে-

আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি:

গ্রাহক হয়রানির অনুসন্ধান করা আইডিআরএ’র ওই তদন্ত দল মনে করেন, কোম্পানিটি নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ব্যয় করায় গ্রাহকদের পাওনা টাকা পরিশোধ করতে পারেনি। তদন্ত প্রতিবেদনে দেয়া পর্যালোচনায় তারা দেখিয়েছেন, ২০১০ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৮৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। অর্থাৎ আইন অনুসারে কোম্পানিটি ব্যবসা পরিচালনায় যে ব্যয় করতে পারে তার চেয়ে বেশি ব্যয় করেছে। অতিরিক্ত ব্যয় করা এসব টাকার ৯০ শতাংশই বীমা গ্রাহকের জমাকৃত টাকা।

লাইফ ফান্ড বিনিয়োগে বিধি লঙ্ঘন:

সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের লাইফ ফান্ড পর্যালোচনা করে তদন্ত দল জানিয়েছে, ২০১৯ সাল পর্যন্ত নিরীক্ষিত হিসাব অনুসারে কোম্পানিটির সর্বমোট লাইফ ফান্ড ১৯২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। প্রবিধানমালা অনুসারে ১৫ শতাংশ সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের পরিমাণ হবে প্রায় ২৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। কিন্তু কোম্পানিটি সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করেছে ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ লাইফ ফান্ডের ২.৪৭ শতাংশ বিনিয়োগ করা হয়েছে সরকারি বন্ডে।

এ ছাড়াও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা হয়েছে ৩৩.৭৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ প্রায় ৯৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ কোম্পানিটির সর্বমোট বিনিয়োগ প্রায় ১৩৩ কোটি ৬ লাখ টাকা। আইডিআরএ’র তদন্ত দল বলছে, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের অন্যান্য ক্ষেত্রেও যথাযথ বিনিয়োগ হয়নি। যার ফলে যথাযথ রিটার্ন আসেনি এবং কোম্পানির তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। যা বীমা গ্রাহকের দাবি নিষ্পত্তিতে প্রধান অন্তরায়।

বীমা আইন লঙ্ঘন করে ব্যবসা পরিচালনা:

সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের তদন্ত প্রতিবেদনে কর্তৃপক্ষের তদন্ত দল জানিয়েছে, সার্বিক বিষয়ে বিচার বিশ্লেষণ, তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করে এবং যথাসম্ভব কিছু কিছু জায়গা পরিদর্শন, প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণ ইত্যাদি থেকে স্পষ্টত বুঝা যায় যে, কোম্পানির সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং বীমা আইন ২০১০ এর বিধান মতে কার্যক্রম পরিচালনা না করার ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বীমা কোম্পানিটির বিরুদ্ধে যেসব আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত দল, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- বীমা আইন ২০১০ এর বিধান মতে কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা না করা। বীমা আইন ২০১০ এর ৬২ ধারা এবং লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণী বিধিমালা, ২০২০ লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়।

লাইফ ফান্ড বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বীমা আইন ২০১০ এর ৪১ ধারা এবং লাইফ বীমাকারীর সম্পদ বিনিয়োগ প্রবিধানমালা, ২০১৯ মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে এর লঙ্ঘন। শাখা অফিসগুলো বন্ধ করার বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’কে না জানানো এবং অনুমোদন গ্রহণ করার বিধান লঙ্ঘন।

বীমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে বীমা আইন ২০১০ এর ৭২ ধারার বিধান সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং গ্রাহকদের ক্ষতিগ্রস্ত করা। বীমা গ্রাহকদের চেক প্রদান করে সে চেক পাস না করে নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্ট-১৮৮১ লঙ্ঘন।