সহকারী অফিসারের বেতন ৭ হাজার টাকা, মূখ্য নির্বাহীর ১২ লাখ
নিজস্ব প্রতিবেদক: স্নাতক পাস সহকারী অফিসারের বেতন সবমিলিয়ে ৭ হাজার ১২০ টাকা। তবে কোম্পানির মূখ্য নির্বাহীর বেতন ১২ লাখ টাকা। এমন বেতন কাঠামো দিয়ে বছরের পর বছর চলছে বীমা কোম্পানিগুলো। অথচ বেতন কাঠামোতে এমন বৈষম্য নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো মাথা ব্যথা নেই।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বীমা কোম্পানিতে ডেস্ক কর্মকর্তাদের বেতন খুব নিম্ন । ফলে খাতটিতে উচ্চ শিক্ষিত ও মেধা সম্পন্নরা কাজ করতে আগ্রহী হয় না। এমন পরিস্থিতির কারণেই বীমা কোম্পানিতে কোনো মেধা সম্পন্ন জনবল নিয়োগ হচ্ছে না। হচ্ছে না বীমা খাতে উন্নয়নও। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অসচেতনতাকে দায়ী করছেন বীমাখাত সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, বীমা কোম্পানিতে মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার বেতন-ভাতার পেছনে মাসে ৩ লাখ থেকে ১২ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। সঙ্গে থাকে চালকসহ দু’টি সার্বক্ষণিক গাড়ী সুবিধা। এ ছাড়া অন্যান্য ভাতা তো রয়েছেই। মূখ্য নির্বাহী থেকে শুরু করে নিচের দু’একটি পদের বেতন লাখ লাখ টাকা। কোনো কোনো কোম্পানিতে মূখ্য নির্বাহী ছাড়াও উপদেষ্টা বা পরামর্শক পদে নিয়োগ দিয়েও লাখ লাখ টাকা বেতন দেয়া হচ্ছে। যার সাথে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা বা ব্যবসা সংগ্রহের কোনো মিল নেই।
জানা গেছে, বীমা কোম্পানিতে স্নাতক পাস একজন ডেস্ক কর্মকর্তার বেতন খুবই কম। সরকারি বা বেসরকারি কোন দপ্তরেই স্নাতক বা সমমান পাস যোগ্যতার কোন কর্মকর্তা এমনকি কর্মচারীর বেতনও এত কম নেই। একাধিক লাইফ ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানির ডেস্ক কর্মকর্তারা বছরের পর বছর একই বেতনে চাকরি করছেন। অধিকাংশ কোম্পানিতেই এসব কর্মকর্তার বেতন খুব নিম্ন। তাদের অন্যান্য সুবিধাও নেই। এ বিষয়ে ইন্স্যুরেন্সনিউজবিডির কাছে মেইল পাঠিয়ে বেতন বৃদ্ধিসহ অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধির জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
তাদের মতে, কোম্পানির মালিক ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তে কোম্পানির ফান্ড থেকে জমিসহ অন্যান্য অলাভজনকখাতে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। নানা কৌশলে কোম্পানির টাকা আত্মসাতের উদ্যেশেই এ ধরণের বিনিয়োগ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইন বা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও তোয়াক্কা করা হয় না। অথচ কোম্পানি উন্নয়নে দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি তাদের কোনো উদ্যোগ নেই।
প্রস্তাবিত বেতন মানসম্মত নয় বলে স্বীকার করেছেন কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। তবে বীমা কোম্পানিতে অনেক লোক নিয়োগ দিতে হয় বলে কম বেতন ধার্য্য না করে উপায় নেই বলে তারা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের অভিমত, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) বীমা কোম্পানির কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের জন্য বেতন ভাতার কাঠামো নির্ধারণ করে দিলে এ ধরণের খামখেয়ালিপনা চালাতে পারতো না কোম্পানিগুলো। আইডিআরএ এ বিষয়ে নজর না দেয়ায় বীমাখাতে চাকরি করতে এসে বঞ্চিত হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সহকারী অফিসার পদমর্যাদায় কিছু সংখ্যক ক্যাশিয়ার কাম কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগে গত ২ অক্টোবর অফিস প্রজ্ঞাপন (নং: ৭৯-২০১৭ খ্রি:) জারি করে প্রাইম ইসলামী লাইফ। এতে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয় স্নাতক বা সমমান পাস। এমএস অফিস প্রোগ্রাম (এমএস ওয়ার্ড, এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্ট) পরিচালনার যোগ্যতা চাওয়া হয় কম্পিউটার দক্ষতায়। বয়স অনুর্ধ্ব ৩২ বছর।
প্রজ্ঞাপন অনুসারে, এসব যোগ্যতা সম্পন্ন একজন প্রার্থীকে নিয়োগ প্রদানের পর মাসিক বেতন প্রদান করা হবে সর্বসাকুল্যে ৭ হাজার ১২০ টাকা। আগ্রহী প্রার্থীকে আবেদনের জন্য সময় দেয়া হয় মাত্র ৮ দিন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ১০ অক্টোবর, ২০১৭ তারিখের মধ্যে কোম্পানি সচিবের নিকট পৌঁছাতে বলা হয়।
প্রজ্ঞাপনটি কোম্পানির সকল বিভাগীয় প্রধান (প্রধান কার্যালয়), সকল প্রকল্প পরিচালক বা বিভাগীয় প্রধান (উন্নয়ন), সকল জোন এবং সার্ভিস সেন্টারে পাঠানো হয়। নিয়োগের বিষয়টি কর্ম এলাকার উন্নয়ন বা ডেস্ক কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে যোগ্যতা সম্পন্ন আগ্রহী প্রার্থীদের জীবন বৃত্তান্ত সংগ্রহ করে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়।
এদিকে এমন বেতন-কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা। তারা বলছেন, একজন স্নাতক বা সমমান পাস সহকারী অফিসারের বেতন সর্বসাকুল্যে ৭ হাজার ১২০ টাকা, যা কোন স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করে না। এমন বেতন-কাঠামোর কারণেই বীমাখাতে দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির অভাব বলে তারা মনে করেন।
জানা গেছে, বীমাখাতের বাইরে অন্য যেকোন আর্থিক বা অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্নাতক বা সমমানের একজন কর্মকর্তার সর্বনিম্ন বেতন ১২ হাজার টাকা। যেখানে নির্দিষ্ট সময় পর নির্ধারিত হারে বেতন বৃদ্ধি পায় এবং পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচ্ছন্ন কর্মীর বেতন ২০ হাজার টাকার ওপরে। যাতে প্রবেশের যোগ্যতা চাওয়া হয় অষ্টম শ্রেণী পাস।
এ বিষয়ে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, একজন সহকারী অফিসারের জন্য যে বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে তা আসলে কোন স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করে না। ব্যাংকের সাথে মিলালে নিঃসন্দেহে এটা স্টান্ডার্ড মেইনটেইন করে না। কিন্তু আমরা কি করবো। ইন্স্যুরেন্সে লোকবল লাগে অনেক বেশি। মোটামুটি সবাই এরকমই করে। আমাদের সামর্থ অনুসারে আমরা বেতন দেয়ার চেষ্টা করি।
উল্লেখ্য, "আর্থিক নিরাপত্তার সেতুবন্ধন" এই শ্লোগানে ২০০০ সালে যাত্রা শুরু করে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড। প্রায় ১২ লাখ পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা বিধান করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় ৪৫ হাজার জনবলের কর্মসংস্থান এই কোম্পানিতে। বর্তমানে প্রাইম ইসলামী লাইফের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮৫৩ কোটি টাকা।