নিজস্ব প্রতিবেদক: ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক মানুষ বীমা পলিসি নেন। তবে পলিসির নিয়ম, শর্ত ও সুবিধা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় পরে সমস্যায় পড়েন অনেকে। ভুল পলিসি নির্বাচন, আর্থিক সংকট এবং পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে বাংলাদেশে অনেক লাইফ বীমা পলিসি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
অনেক সময় লাইফ বীমাকে সঞ্চয় বা নিশ্চিত লাভের মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু বীমার মূল উদ্দেশ্য হলো বিপদের সময়ে ব্যক্তি ও পরিবারের আর্থিক সহায়তা দেয়া। তাই পলিসি নেয়ার আগে নিয়মিত কত টাকা জমা দিতে হবে, কত বছর চালাতে হবে, মাঝপথে বন্ধ করলে কী ক্ষতি হতে পারে এবং প্রয়োজনের সময় টাকা পাওয়ার নিয়ম কী- এসব বিষয় জানা জরুরি।
বাংলাদেশের লাইফ বীমা খাতে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো পলিসি বন্ধ হয়ে যাওয়া। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ বছরে দেশে ২৬ লাখের বেশি লাইফ বীমা পলিসি বন্ধ হয়েছে। ২০০৯ সালে যেখানে লাইফ বীমা পলিসির সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ, ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৮৫ লাখ ৮৮ হাজারে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক গ্রাহক নিজের প্রয়োজন না বুঝে পলিসি নেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে পলিসির সব শর্ত ও সীমাবদ্ধতা পরিষ্কারভাবে জানানো হয় না। কমিশনের লক্ষ্য পূরণ করতে কিছু বীমা প্রতিনিধি (এজেন্ট) পলিসির সুবিধাগুলো বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরলেও ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো যথেষ্ট ব্যাখ্যা করেন না।
বীমা নেয়ার সময় গ্রাহকের স্বাস্থ্য তথ্য, আগের রোগের ইতিহাস এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্য ভুল বা গোপন করা হলে পরে বীমার টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রিমিয়ামের টাকা কোম্পানির অনুমোদিত মাধ্যমে জমা দেয়া নিরাপদ। এজেন্টের ব্যক্তিগত মাধ্যমে টাকা দিলে তা সময়মতো জমা না হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ গ্রাহক সুরক্ষা, কোম্পানির কার্যক্রম তদারকি এবং খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করছে। সংস্থাটি পলিসি বিক্রি, গ্রাহকসেবা ও অভিযোগ নিষ্পত্তি নিয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে। তবে ভুল তথ্য দিয়ে বীমা বিক্রির কারণে কতজন গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তার নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশিত না থাকায় সমস্যার পুরো চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।
বীমা সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হলে গ্রাহকরা আইডিআরএর অভিযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারেন। তবে অনেক মানুষ এখনো জানেন না, পলিসির শর্ত, টাকা পাওয়ার নিয়ম বা সেবাসংক্রান্ত সমস্যায় কোথায় যোগাযোগ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বীমা খাতে আস্থা বাড়াতে শুধু গ্রাহকের সচেতনতা নয়, কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতাও জরুরি। গ্রাহককে সহজ ভাষায় পলিসির সুবিধা, সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি বোঝানো, সঠিক তথ্য দেয়া এবং সময়মতো বীমার টাকা পরিশোধ করা কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব।
গ্রাহকদেরও বীমা নেয়ার আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন। এজেন্ট ও কোম্পানির পরিচয় নিশ্চিত করা, প্রিমিয়ামের পরিমাণ ও জমার সময় জানা, মাঝপথে পলিসি বন্ধ করলে সম্ভাব্য ক্ষতি বোঝা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করা জরুরি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বীমা খাত এখনো তুলনামূলক ছোট। ২০২৩ সালে দেশের মোট অর্থনীতির তুলনায় বীমা খাতের আকার ছিল প্রায় ০.৪ শতাংশ। একই সময়ে লাইফ বীমা খাতে মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল প্রায় ১২ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা।
বীমা খাতে মানুষের আস্থা বাড়াতে প্রয়োজন সহজ ভাষায় তথ্য দেয়া, দ্রুত গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা এবং বীমা কোম্পানি ও প্রতিনিধিদের জবাবদিহি বাড়ানো। কারণ বীমা শুধু একটি পলিসি নয়; এটি ব্যক্তি ও পরিবারের ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।