রাজ কিরণ দাস: সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ নো ক্লেইম বোনাস দিয়ে মোটর বীমা পলিসি করছে অধিকাংশ বীমা কোম্পানি। তবে নো ক্লেইম বোনাস দেয়ার ক্ষেত্রে কতটা আইন মানা হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অপর দিকে বীমা কোম্পানিগুলো বলছে, মোটর বীমায় বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়ার ফলে মোটর বীমা করার প্রবণতা কমে যায়। এখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যেসব গাড়ি কেনা হচ্ছে সেসব গাড়ির পলিসি হচ্ছে। অর্থাৎ ঋণপত্রের শর্ত মানতে গিয়ে গ্রাহক পলিসি করছে। ফলে গ্রাহকরা চাচ্ছে, কম খরচে মোটর বীমা সার্টিফিকেট। এর প্রভাব পড়েছে বীমা কোম্পানিতে। প্রতিযোগিতায় টিকতে কোম্পানিগুলো নো ক্লেইম বোনাসকেই সুযোগ হিসেবে বেছে নিয়েছে।
বীমা সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এক কোম্পানি নো ক্লেইম বোনাস না দিলে অন্য কোম্পানি দিচ্ছে। ফলে ব্যবসা হারানোর ভয়ে বেশির ভাগ কোম্পানিকেই নো ক্লেইম বোনাস দিতে হচ্ছে। মোটর বীমা পলিসি করার ক্ষেত্রে এটাই নন-লাইফ বীমা খাতের বাস্তবতা। তবে যদি মোটর বীমা আগের মতো বাধ্যতামূলক করা হয়, তাহলে এই পরিস্থিতি থাকবে না।
তাদের মতে, নো ক্লেইম বোনাস আইনগতভাবে বৈধ। তবে নো ক্লেইম বোনাস শর্ত মেনে দেয়া হচ্ছে কি না সেটা নিয়ে যদিও প্রশ্ন রয়েছে। ব্যবসা ধরে রাখতে গ্রাহকের চাহিদা অনুসারে কম খরচে মোটর বীমা পলিসি দিতে ঝূঁকিও কমিয়ে দিতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভুমিকম্প, এই ঝুঁকিগুলো কমিয়ে কম খরচে পলিসি দেয়া হচ্ছে।
ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি'র হাতে আসা একাধিক মোটর সার্টিফিকেটের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিটি পলিসিতেই ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ নো ক্লেইম বোনাস দেয়া হয়েছে। সেই সাথে মোটর বীমা বেসিক প্রিমিয়াম রেট ২ টাকা ৬৫ পয়সার পরিবর্তে ঝুঁকি কমিয়ে ১ টাকা ৬৫ পয়সা রেট দেয়া হয়েছে। রেট কমানোর ক্ষেত্রে বন্যা, সাইক্লোন, ভূমিকম্পের কোনো ঝুঁকি নেয়া হচ্ছে না। আবার এভিএলএস দেখিয়ে প্রিমিয়াম ১০ শতাংশ কমানো হচ্ছে। এভিএলএস হচ্ছে অটোমেটিক ভাইকেল লোকেশন সিস্টেম। অর্থাৎ গাড়িতে জিপিএস সিস্টেম থাকাকে বুঝায়।
বাংলাদেশর মোটর ট্যারিফ রেটের নীতিমালা অনুসারে, যেসব ক্ষেত্রে নো ক্লেইম বোনাস দেয়া যাবে না তার মধ্যে রয়েছে- বীমার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ক্লেইম করা হলে নো ক্লেইম বোনাস দেয়া যায় না। কোনো ক্লেইম স্থগিত বা অমীমাংসিত অবস্থায় থাকলে গ্রাহক নো ক্লেইম বোনাস পাবেন না। এছাড়া পলিসি যথাসময়ে নবায়ন করতে হবে।
ট্যারিফ রেট অনুসারে, মোটর বীমার অ্যাক্ট বেসিক প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে প্রথম পলিসি করার পর প্রাইভেট ও কমার্শিয়াল গাড়ির জন্য এক বছরে কোনো ক্লেইম না হলে পরবর্তী বছরে নবায়নের সময় প্রাইভেট ও কমার্শিয়াল গাড়ির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ, পরপর ২ বছর ক্লেইম না হলে পরবর্তী বছরে নবায়নের সময় ২০ শতাংশ, পরপর ৩ বছর ক্লেইম না হলে পরবর্তী বছরে নবায়নের সময় ২৫ শতাংশ। তবে বর্তমানে থার্ট পার্টি মোটর বীমা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
কমপ্রিহেসসিভ মোটর বীমার ক্ষেত্রে প্রথম পলিসি করার পর প্রাইভেট ও কমার্শিয়াল গাড়ির জন্য এক বছরে কোনো ক্লেইম না হলে পরবর্তী বছরে নবায়নের সময় প্রাইভেট ও কমার্শিয়াল গাড়ির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ, পরপর ২ বছর ক্লেইম না হলে পরবর্তী বছরে নবায়নের সময় ৪০ শতাংশ পর পর ৩ বছর ক্লেইম না হলে পরবর্তী বছরে নবায়নের সময় ৫০ শতাংশ।
নতুন রিকন্ডিশন গাড়ির পলিসি করার ক্ষেত্রে নো ক্লেইম বোনাস দেয়া হয়না। তবে গ্রাহকের আগের গাড়ি থাকলে সেই গাড়িতে ক্লেইম না হলে নো ক্লেইস বোনাস পাবেন। এছাড়া নো ক্লেইম বোনাসের ক্ষেত্রে নবায়ন শেষ হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে নবায়ন করতে হবে ৩০ দিন পার হলে নো ক্লেইম বোনাস পাবেন না। গাড়ির মালিকানা পরিবর্তন হলে নতুন মালিক নো ক্লেইম বোনাস পাবেন না।
নো ক্লেইম বোনাস দেয়ার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় যাচাই করতে হয় তার মধ্যে রয়েছে- আগের পলিসির মেয়াদ, কোনো ক্লেইম হয়েছে কি না, কোনো ক্লেইম পেন্ডিং আছে কি না, পলিসি ধারাবাহিকভাবে নবায়ন হয়েছে কি না, কোন ধরনের গাড়ি প্রাইভেট, কমার্শিয়াল না মোটরসাইকেল, কোন অংশের প্রিমিয়ামের ওপর প্রযোজ্য তা যাচাই করা।
ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি'র হাতে থাকা মোটর সার্টিফিকেটগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ২০২৬ সালে তৈরি একটি গাড়ির পলিসি করে ৪ আগস্ট ২০২৬ সালে। মোটর সার্টিফিকেট নাম্বার–জিডিআই/পিবিডি/৮/২০২৬/এমটিআর/টি/২৫১০০৮।
এই পলিসিতে নো ক্লেইম বোনাস দেয়া হয়েছে ৩০ শতাংশ। এভিএলএস এর জন্য ১০ শতাংশ ডিসকাউন্ট দিয়ে প্রিমিয়াম কমানো হয়েছে। এছাড়া এই পলিসিতে প্রিমিয়াম কমাতে দাঙ্গা ও ধর্মঘটজনিত ক্ষতি, ভূমিকম্পজনিত আগুণের ক্ষতি ও কম্পন জনিত আগুণের ক্ষতি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়জনিত ক্ষতির ঝুঁকি নেয়া হয়নি।
রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স গত ৪ জানুয়ারি মোটর বীমার কমপ্রিহেনসিভ পলিসি করে। মোটর সার্টিফিকেট নাম্বার-আরআইএএল/এইচডি/এমভি(পিভি)/পি-০০০০১/০১/২০২৬ (কমপ)।
১৮শ সিসি এই টয়োটা গাড়িটির উৎপাদন তারিখ ২০২০ সাল। এই পলিসিতে ৩০ শতাংশ নো ক্লেইম বোনাস দেয়া হয়েছে। এভিএলএস এর ডিসকাউন্ট দেয়া হয়েছে ১০ শতাংশ।
প্রিমিয়াম কমাতে পলিসিতে যেসব ঝুঁকি বাদ দেয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- দাঙ্গা ও ধর্মঘটজনিত ক্ষতি, ভূমিকম্পজনিত আগুণের ক্ষতি ও কম্পন জনিত আগুণের ক্ষতি বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়জনিত ক্ষতি। এসব ঝুঁকি বাদ দেয়ার কারণে ১ শতাংশ প্রিমিয়াম হার কমানো হয়েছে।
২৪ ফেব্রুয়ারি আরো একটি মোটর সার্টিফিকেট ইস্যু করে রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স। কমপ্রিহেনসিভ এই মোটর পলিসির তথ্য অনুসারে, ১৮শ সিসি’র টয়োটা ক্রস হার্ডি জিপটি ২০২২ সালে নির্মিত। এই পলিসিতেও দাঙ্গা ও ধর্মঘটজনিত ক্ষতি, ভূমিকম্পজনিত আগুণের ক্ষতি ও কম্পনজনিত আগুণের ক্ষতি, বন্যা ও ঘূর্নিঝড়জনিত ক্ষতি। এসব ঝুঁকি বাদ দেয়ার কারণে ১ শতাংশ প্রিমিয়াম হার কমানো হয়েছে। এছাড়া এভিএলএস এর জন্য ১০ শতাংশ প্রিমিয়াম কমানো হয়েছে। নো ক্লেইম বোনাস দেয়া হয়েছে ৩০ শতাংশ।
গত ২ জুন ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স একটি পলিসি ইস্যু করে। এই পলিসির সার্টিফিকেট নাম্বার- পিএই/এনএমটি/এমভি(পিভি) সিইআরসি-০০০৮০/০৬/২০২৬ (কমপ্রিহেনসিভ)।
সার্টিফিকেটের তথ্য অনুসারে, গাড়িটি ২০২৫ সালে নির্মিত। ৩৫শ সিসির এই গাড়ির পলিসির ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ নো ক্লেইম বোনাস দেয়া হয়েছে। এছাড়া এভিএলভিএস’র জন্য ডিসকাউন্ট দেয়া হয়েছে ১০ শতাংশ। প্রিমিয়াম কমাতে ঝুঁকি বাদ দেয়া হয়েছে দাঙ্গা ও ধর্মঘটজনিত ক্ষতি, ভূমিকম্পজনিত আগুণের ক্ষতি ও কম্পনজনিত আগুণের ক্ষতি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়জনিত ক্ষতি।
কোম্পানিটি ১৩ জানুয়ারি আরো একটি পলিসি ইস্যু করেছে, যার সার্টিফিকেট নাম্বার- পিএই/এনএমটি/এমভি(পিভি) সিইআরসি-০০০৭/০১/২০২৬ (কমপ্রেহেনসিভ)। ২০২১ সালে নির্মিত এই গাড়ির জন্য বেসিক প্রিমিয়ামের উপর ৫০ শতাংশ নো ক্লেইম, অ্যাক্ট বেসিক প্রিমিয়ামের উপর ২৫ শতাংশ নো ক্লেইম বোনাস ও এভিএলএস জন্য ডিসকাউন্ট দেয়া হয়েছে ১০ শতাংশ। এছাড়া প্রিমিয়াম কমাতে ঝুঁকি বাদ দেয়া হয়েছে দাঙ্গা ও ধর্মঘটজনিত ক্ষতি, ভূমিকম্পজনিত আগুণের ক্ষতি ও কম্পনজনিত আগুণের ক্ষতি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়জনিত ক্ষতি। তবে থার্ট পার্টি মোটর বীমা বন্ধ থাকায় অ্যাক্ট বেসিক প্রিমিয়ামের উপর ২৫ শতাংশ নো ক্লেইম বোনাসের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
নো ক্লেইম বোনাস দিচ্ছে এমন আরো যেসব কোম্পানির মোটর সার্টিফিকেট পাওয়া গেছে সেসব কোম্পানির মধ্যে রয়েছে- ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স, ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স, গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স, মার্কেন্টাইল ইন্স্যুরেন্স, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমেটেড, ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স, ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স, সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, নর্দান ইসলামী ইন্স্যুরেন্স, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, এশিয়া প্যাসিফিক জেনারেল ইন্স্যুরেন্স ও প্রাইম জেনারেল ইন্স্যুরেন্স।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।