রাজ কিরণ দাস: এশিয়ায় অনেক মানুষ এখনো পেনশন ও অবসরকালীন সঞ্চয়ের বাইরে রয়েছেন। এতে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আর্থিক অনিশ্চয়তাও বাড়ছে।
মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি দিন বাঁচছেন। কিন্তু চাকরি বা কাজ বন্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় চলার মতো টাকা অনেকের কাছেই থাকে না। ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাবার, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে এশিয়ার কয়েকটি দেশে এই সমস্যার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের অবসরকালীন সঞ্চয় ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হয়েছে।
ওইসিডি বলছে, শুধু পেনশন থাকলেই একজন মানুষ বৃদ্ধ বয়সে আর্থিকভাবে নিরাপদ থাকবেন, এমন নয়। পেনশন বা অন্য কোনো সঞ্চয়ে জমা টাকা যদি পুরো অবসরজীবনের খরচ চালানোর জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলেও আর্থিক সংকট তৈরি হতে পারে।
এশিয়ায় এই সমস্যার বড় কারণ হলো বিপুলসংখ্যক মানুষের এমন কাজে যুক্ত থাকা, যেখানে নিয়মিত বেতন, চাকরির নিশ্চয়তা বা পেনশনের সুবিধা নেই। এসব কাজকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কাজ বলা হয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাবে, ২০২৩ সালে এশিয়া-প্যাসিফিকে প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করতেন। এটি অঞ্চলটির মোট কর্মীর প্রায় ৬৬ শতাংশ।
এর মধ্যে দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নিজের উদ্যোগে কাজ করা ব্যক্তি ও অনিয়মিত আয়ের কর্মী রয়েছেন। এসব মানুষের বড় অংশ বাধ্যতামূলক পেনশনের আওতায় নেই। তাই বৃদ্ধ বয়সে তাদের অনেককেই নিজের জমানো টাকার ওপর নির্ভর করতে হয়।
ওইসিডির তথ্য অনুযায়ী, পর্যালোচনা করা অধিকাংশ দেশেই কর্মক্ষম মানুষের ৬০ শতাংশের কম বাধ্যতামূলক পেনশনের আওতায় রয়েছেন। ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানে এই হার প্রায় ১০ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে তা ৩০ শতাংশের নিচে।
আরেকটি সমস্যা হলো, অনেক মানুষ অবসরের আগেই পেনশনের জন্য জমানো টাকা তুলে ফেলেন। চাকরি হারানো, চিকিৎসা, শিক্ষা বা বাড়ির খরচের জন্য কোথাও কোথাও এই টাকা তোলার সুযোগ রয়েছে। এতে তখনকার প্রয়োজন মিটলেও বৃদ্ধ বয়সের জন্য সঞ্চয় কমে যায়।
ইন্দোনেশিয়ায় ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ চাকরি ছাড়ার পর তাদের পেনশনের সঞ্চয় তুলে নিয়েছেন বলে জানিয়েছে ওইসিডি।
কম বয়সে অবসর নেয়াও সমস্যা বাড়াচ্ছে। পর্যালোচনা করা দেশগুলোর বিভিন্ন পেনশন ব্যবস্থায় সাধারণ অবসরের বয়স ৫০ থেকে ৬১ বছরের মধ্যে। কেউ যত আগে অবসর নেবেন, তত কম সময় টাকা জমাতে পারবেন। আবার মানুষ বেশি দিন বাঁচলে সেই টাকা দিয়েই বেশি বছর চলতে হবে।
ধরা যাক, একজন মানুষ অবসরের পর ১৫ বছর চলার মতো টাকা জমিয়েছেন। কিন্তু তিনি যদি ২৫ বছর বেঁচে থাকেন, তাহলে শেষ ১০ বছরের খরচ কোথা থেকে আসবে? বীমা ও পেনশনের ভাষায় এই সমস্যাকে ‘দীর্ঘায়ু ঝুঁকি’ বলা হয়।
এই ঝুঁকি কমাতে এমন বীমা বা সঞ্চয় ব্যবস্থা কাজে আসতে পারে, যেখান থেকে অবসরের পর নিয়মিত টাকা পাওয়া যায়। এ ধরনের একটি ব্যবস্থা হলো ‘অ্যানুইটি’। সহজভাবে বললে, অ্যানুইটিতে আগে টাকা জমা রাখা হয় এবং পরে সেই টাকা থেকে নিয়মিত আয় পাওয়া যায়। কিছু অ্যানুইটি থেকে আজীবন আয়ও পাওয়া যায়।
তবে ওইসিডি বলছে, এশিয়ার পর্যালোচনা করা অনেক দেশেই বৃদ্ধ বয়সে আজীবন নিয়মিত আয় দেয় এমন পণ্য এখনো সীমিত।
বিষয়টি ২০২৬ সালেও গুরুত্ব পাচ্ছে। গত ২ ও ৩ জুন শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে ওইসিডি ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ইনস্টিটিউটের (এডিবিআই) এক বৈঠকে এশিয়ার বীমা ও অবসরকালীন সঞ্চয় নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বয়স্ক মানুষের দীর্ঘায়ু ঝুঁকি থেকে আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
ভবিষ্যতে সমস্যাটি আরও বড় হতে পারে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) হিসাবে, ২০৫০ সালের মধ্যে এশিয়া-প্যাসিফিকের প্রতি চারজন মানুষের একজনের বয়স হবে ৬০ বছর বা তার বেশি। ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৩০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। অথচ অঞ্চলটির বয়স্ক মানুষের মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ কোনো ধরনের পেনশন পান।
পর্যাপ্ত সঞ্চয় বা বীমা না থাকলে এসব মানুষের খরচের চাপ পরিবার ও সরকারের ওপরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে চিকিৎসা, দৈনন্দিন খরচ ও বৃদ্ধ বয়সে দেখাশোনার ব্যয় বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
এই সংকট কমাতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত ও নিজের উদ্যোগে কাজ করা মানুষদের পেনশনের আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছে ওইসিডি। মানুষ যেন সহজে পেনশনের জন্য সঞ্চয় করতে পারেন, সেই সুযোগ বাড়ানোর কথাও বলেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অবসরের আগে পেনশনের টাকা তোলার সুযোগ সীমিত করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
অবসরের সময় সব টাকা একবারে দেয়ার বদলে নিয়মিত বা আজীবন আয় পাওয়ার ব্যবস্থা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। এ ক্ষেত্রে পেনশনের পাশাপাশি লাইফ বীমা ও অ্যানুইটির মতো পণ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
কারণ বৃদ্ধ বয়সের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য শুধু পেনশন থাকাই যথেষ্ট নয়। অবসরের পর যতদিন একজন মানুষ বেঁচে থাকবেন, ততদিন প্রয়োজনীয় খরচ চালানোর মতো আয় থাকা জরুরি।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।