খোঁজ নেয়ার মেকানিজম নেই প্রাইম লাইফের

২ বছরেও টাকা পায়নি কুমিল্লার শাহেনারা

নিজস্ব প্রতিবেদক: মেয়াদ শেষে দাবির টাকা আদায়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন প্রাইম ইসলামী লাইফের কুমিল্লার শাহেনা বেগমসহ আরো ১২ জন বীমা গ্রাহক। কোম্পানির কর্মকর্তা বলছেন, গ্রাহক দাবির জন্য আবেদন না করলে কোম্পানির পক্ষ থেকে গ্রাহকের সাথে যোগাযোগ করে দাবি পরিশোধের কোনো মেকানিজম নেই। এসব গ্রাহকের বীমা দাবির আবেদন তাদের কাছে পৌঁছায়নি। তাই এ বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই।

কুমিল্লার শাহেনা বেগমসহ আরো ১২ জন গ্রাহক মেয়াদ শেষ হওয়ার ২ বছর পার হলেও টাকা পাচ্ছেন না বলে ইন্স্যুরেন্সনিউজবিডি'র কাছে অভিযোগ করেন। এসব গ্রাহকের দাবি পরিশোধ কেন করা হয়নি তা জানতে যোগোযাগ করা হয় প্রাইম ইসলামী লাইফের মূখ্য নির্বাহী মোহাম্মদ শাহ আলমের সাথে। মোবাইল ফোনে তাকে ক্ষুদে বার্তাও পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দেননি।

পরে কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের পলিসি সার্ভিসিং অ্যান্ড ক্লেইমস ডিপার্টমেন্ট এর ভাইস প্রেসিডেন্ট আলমগীর হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, গ্রাহকের পক্ষ থেকে মেয়াদোত্তর বীমা দাবির আবেদন তাদের কাছে না আসায় এসব দাবি পরিশোধে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি । ক্ষুদ্রবীমার ক্ষেত্রে গ্রাহক আবেদন না করলে দাবি পরিশোধ করা হয় না। এমনকি কেন দাবি উত্থাপন হচ্ছে না এ বিষয়েও কোন খোঁজ-খবর নেয়ার মেকানিজম তাদের নেই। দাবির আবেদন পৌঁছানের দায়িত্ব গ্রাহকের। অন্যান্য বীমা কোম্পানিতেও ক্ষুদ্রবীমার গ্রাহকের খোঁজ নেয়া হয় না বলে তিনি জানান।

আলমগীর হোসেন আরো জানান, উল্লেখিত ১২টি পলিসির মধ্যে শুধুমাত্র আজিজুল হকের আবেদন তাদের কাছে এসেছে। এরইমধ্যে সকল কাজ সম্পন্ন করে কোম্পানির একাউন্সে পাঠানো হয়েছে চেক ইস্যু করার জন্য। তবে অন্যদের বীমার দাবির আবেদন তাদের কাছে আসেনি। কিছু পলিসির মেয়াদ দু'বছরের বেশি সময় হলো পূর্ণ হয়েছে বলেও তিনি জানান।

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের একজন মো. আজিজুল হক। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে তার বাড়ি। ইন্স্যুরেন্সনিউজবিডি'কে তিনি জানান, ২০০৫ সালে প্রাইম ইসলামী লাইফে বীমা করেন। পলিসি নম্বর ০০২৩০০৮৫০৫০। ১০ বছর মেয়াদী এই বীমায় মাসিক প্রিমিয়াম ১০০ টাকা। প্রিমিয়ামের সবগুলো কিস্তি পরিশোধের পর ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই পলিসির মেয়াদপূর্ণ হয়। এরপরই সকল কাগজপত্রসহ আবেদন করেন মেয়াদোত্তর দাবি পরিশোধের। কিন্তু সোয়া দু'বছর পার হলেও বীমা টাকা পাচ্ছেন না তিনি।

আজিজুল হক বলেন, প্রয়োজনের মূহুর্তে বীমার টাকা কাজে লাগবে বলে ১০ বছর ধরে জমিয়েছি। কিন্তু আজ প্রয়োজনের সময় সে টাকা পাচ্ছি না। কষ্ট করে টাকা জমিয়ে এখন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ছেলের ফরম ফিলাপের জন্য টাকা সংগ্রহ করতে পারছি না। আশায় ছিলাম বীমার টাকা পেলে সেটা দিয়ে ছেলের ফরম ফিলাপ করবো। কিন্তু সেই আশায় গুড়ে বালি। বীমা টাকা পাবো কিনা এখন সেটা নিয়েই অনিশ্চয়তায়।

আরেক ভুক্তভোগী বীমা গ্রাহক মোছা. শাহেনা বেগম। অসুস্থ হয়ে চৌদ্দগ্রামের একটি হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় ইন্স্যুরেন্সনিউজবিডি'র সঙ্গে কথা বলেন শাহেনা। তিনি জানান, ২০০৫ সালে প্রাইম ইসলামী লাইফে বীমা করেছেন। তার পলিসি নম্বর ০০২৩০১৬৫৩৫-৬। ১০ বছর মেয়াদী এই বীমায় মাসে ২০০ টাকা প্রিমিয়াম জমা করেছেন। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। সকল কাগজপত্র জমা দিলেও এখন পর্যন্ত তিনি বীমা টাকা পাননি।

শাহেনা বেগম জানান, ৪ জন ছেলে-মেয়ে নিয়ে তার স্বামীর সংসার। অসুস্থ হয়ে এখন তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। টানাপড়েন সংসারে ছেলে মেয়ের পড়ালেখার খরচ যোগানো তাদের দায়। এই সময় বীমা কোম্পানিতে জমানো ২৪ হাজার টাকা পেলে তার বড় উপকার হতো। অথচ প্রায় দু'বছর হলেও বীমা কোম্পানি তাদের টাকা দিচ্ছে না। কবে দিবে তাও তারা জানেন না। অসুস্থ শাহেনার আকুতি- তার টাকাগুলো যেন তাড়াতাড়ি পাওয়া যায়।

২০০৬ সালে প্রাইম ইসলামী লাইফে বীমা করেন চৌদ্দগ্রামের বীমা গ্রাহক আবদুল আলী। মাসে ২০০ টাকা কিস্তিতে ১০ বছরের জন্য বীমা করেন তিনি। কয়েকটি কিস্তি তিনি পরিশোধ করতে পারেননি। গত ৩০-০৯ ২০১৬ তারিখে তার পলিসির (০০২৩০০৩৮৮৫-২) মেয়াদ শেষ হয়েছে। মাস ৬ আগে সকল কাগজপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। তবে এখন পর্যন্ত তিনি বীমা টাকা পাননি। এ নিয়ে বীমা কর্মী গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে বলেও জানান আবদুল আলী।

প্রাইম ইসলামী লাইফের আরেক ভুক্তভোগী নোয়াবগ্রামের বাসিন্দা মো. গিয়াস উদ্দিন। ২০০৬ সালের ৩০ মার্চ ১২ হাজার টাকা বীমা অংকের একটি পলিসি করেন তিনি। ০০২৩০০৮০৪৯-৫ নম্বরের এই পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ। এরপরই সকল কাগজপত্রসহ নিজ হাতে কোম্পানিতে আবেদন করেন বীমা দাবি পরিশোধের। ৩ দফা জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দীর্ঘ ১৪ মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত নির্বাহী রশিদ দেয়নি প্রাইম ইসলামী লাইফ।

গিয়াস উদ্দিন জানান, প্রাইম ইসলামী লাইফে তার একজন আত্মীয়ের সূত্র ধরে ২০০৬ সালে তিনি বীমা এজেন্ট হন। এসময় কোম্পানিটির এজেন্ট হিসেবে বেশ কিছু নিকট আত্মীয়ের বীমা করেন তিনি। তবে কয়েক বছর পরই বীমা বিক্রি ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু এখন তিনি নিজের টাকাসহ অন্যদের বীমার টাকা তুলতে পারছেন না। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর নিজ হাতে কোম্পানির কর্মকর্তাদের কাছে নিজের এবং অন্যদের আবেদন জমা করেছেন। কিন্তু ২ বছরের বেশি সময় পার হলেও টাকা দিচ্ছে না প্রাইম ইসলামী লাইফ। অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও এখন তার ফোন কল রিসিভ করছেন না বলে তিনি অভিযোগ করেন।

এছাড়া মোছা. রাবেয়া বেগমের বীমা মেয়াদ পূর্তি হয়েছে ৩০-১০-২০১৫ তারিখে। ১০ বছর মেয়াদী তার ১২ হাজার টাকা বীমা অংকের পলিসি নম্বর ০০২৩০০৮১৮৭-৬। রোকসানা বেগমের পলিসি নম্বর ০০২৩০১১৭১২-৭, বীমা অংক ২৪ হাজার টাকা, মেয়াদ শেষ ২৮-০৫ ২০১৬। সামসুল আলমের পলিসি নম্বর ০০২৩০০৯২৮৮-৭। বীমা অংক ৬০ হাজার টাকা। মেয়াদ শেষ হয়েছে ৩০-০৫-২০১৬ তারিখে। মো. কিরণের পলিসি নম্বর ০০২৩০০৮১২৩-২। ১২ হাজার টাকা বীমা অংকের পলিসির মেয়দ পূর্তি হয়েছে ৩০-৮-২০১৬। মোছা. আয়েশা বেগমের পলিসি নম্বর ০০২৩০১৬৫২৭-০। মেয়াদ শেষ ৩০-১২-২০১৫।