বীমাখাত নিয়ে গবেষণা

বিনিয়োগ বাড়লেও কমছে প্রবৃদ্ধি

আবদুর রহমান: দেশের লাইফ ও নন-লাইফ বীমাখাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও এর প্রবৃদ্ধির হার কমে আসছে ধারাবাহিকভাবে। ৭ বছর আগের তুলনায় সরকারি-বেসরকারি ৭৮টি বীমা কোম্পানির বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি কমেছে ২৯.৩১ শতাংশ। এরমধ্যে লাইফ বীমাখাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে ২৭.৫১ শতাশ এবং নন-লাইফ বীমাখাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে ৪২.৪১ শতাংশ।

দেশের বীমাখাত নিয়ে প্রথমবারের মতো পরিচালিত "বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বীমাখাত" শীর্ষক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব) খলিল আহমদ গবেষণাটি করেছেন। সিলেটে অনুষ্ঠিত বীমা মেলা ২০১৭ উপলক্ষে প্রকাশিত সুভ্যেনিয়রে গবেষণার এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সরকারি-বেসরকারি ৭৮টি বীমা প্রতিষ্ঠানের ২০০৯-২০১৬ সালের তথ্যের ভিত্তিতে এ গবেষণা করা হয়। বীমাখাতের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পেতে পরিচালিত এ গবেষণায় সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং শতকরা হিসাবের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর কর্মক্ষমতার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

তথ্য অনুসারে, ২০০৯ সালে বীমাখাতে সর্বমোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ২৮৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। যা ৭ বছরের ব্যবধানে ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৪১৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৭ বছরের ব্যবধানে বীমাখাতের বিনিয়োগ বেড়েছে ২০ হাজার ১৩৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। সে হিসেবে প্রতিবছর গড়ে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬.০৯ শতাংশ। তবে শেষ চারটি বছরের প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশের নীচে রয়েছে এবং প্রতিবছরই ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি কমেছে।

গবেষণার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৯ সালে বীমাখাতে সর্বমোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ২৮৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ২০১০ সালে বিনিয়োগের এই পরিমাণ ৩ হাজার ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৫৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২০১০ সালে কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি হয় ৩৩.৪৩ শতাংশ।

এরমধ্যে লাইফ বীমাখাতে ২০০৯ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৯২০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। যা ২০১০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৪২ কোটি ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরটিতে লাইফ বীমাখাতে ৩ হাজার ১২১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, যা ৩১.৪৭ শতাংশ।

অন্যদিকে নন-লাইফ বীমাখাতে ২০০৯ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৬৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। যা ২০১০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ১৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। বছরটিতে নন-লাইফ বীমাখাতে বিনিয়োগ বাড়ে ৬৫১ কোটি ৬ লাখ টাকা, যা ৪৭.৭৫ শতাংশ।

বীমাখাতে ২০১১ সালে সর্বমোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ২০১০ সালের তুলনায় বছরটিতে বিনিয়োগ বেড়েছে ৩ হাজার ২৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। তবে ২০১১ সালে প্রবৃদ্ধির হার আগের বছরের তুলনায় ১৩.৩২ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ২০.১১ শতাংশ।    

লাইফ বীমাখাতে ২০১১ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৫ কোটি ৬৯৪ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। আগের বছরে যার পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ৪২ কোটি ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরটিতে বিনিয়োগ বেড়েছে ২ হাজার ৬৫২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বা ২০.৩৪ শতাংশ। তবে এই বৃদ্ধি আগের বছরের চেয়ে ১১.১৩ শতাংশ কম।

নন-লাইফ বীমাখাতে ২০১১ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ ২ হাজার ৩৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর আগে ২০১০ সালে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। ২০১১ সালে বিনিয়োগ বেড়েছে ৩৭৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা বা ১৮.৬০ শতাংশ। তবে আগের বছরের চেয়ে এই প্রবৃদ্ধি ২৯.১৫ শতাংশ কম।

২০১২ সালে দেশের বীমাখাতে সর্বমোট বিনিয়োগ দাঁড়ায় ২১ হাজার ৬২০ কোটি ১৩ লাখ টাকা। যা ২০১১ সালে ছিল ১৮ হাজার ৮৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা।বছরটিতে বিনিয়োগ বেড়েছে ৩ হাজার ৫৩৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২০১২ সালে বীমাখাতে বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯.৫৫ শতাংশ। তবে প্রবৃদ্ধির হার আগের বছরের চেয়ে কমেছে ০.৫৬ শতাংশ।

এরমধ্যে লাইফ বীমাখাতে ২০১২ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা। আগের বছরে যার পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৬৯৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরটিতে বিনিয়োগ বেড়েছে ৩ হাজার ৩১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বা ২১.১২ শতাংশ।

নন-লাইফ বীমাখাতে ২০১২ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ ২ হাজার ৬১০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর আগে ২০১১ সালে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ২০১২ সালে বিনিয়োগ বেড়েছে ২২১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বা ১৮.৬০ শতাংশ। তবে আগের বছরের চেয়ে এই প্রবৃদ্ধি ২৯.১৫ শতাংশ কম।

এছাড়া ২০১৩ সালে বীমাখাতে ৩ হাজার ৩২০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বেড়ে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৯৪০ কোটি ৬২ লাখ টাকা। তবে প্রবৃদ্ধির হার ৪.১৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৫.৩৬ শতাংশ। বছরটিতে লাইফ বীমাখাতে ৩ হাজার ১২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা টাকা বেড়ে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। তবে প্রবৃদ্ধির হার ৫.২৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৫.৮৫ শতাংশ।আর নন-লাইফ বীমাখাতে ৩০৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বেড়ে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯১৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। প্রবৃদ্ধি ১১.৭৯ শতাংশ।

২০১৪ সালে বীমাখাতে ৩ হাজার ১১৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা বেড়ে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৫৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। তবে প্রবৃদ্ধির হার ২.৮৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১২.৪৯ শতাংশ। বছরটিতে লাইফ বীমাখাতে ২ হাজার ৭১০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা টাকা বেড়ে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৭৩২ কোটি ৯ লাখ টাকা। প্রবৃদ্ধি ১২.৩১ শতাংশ।আর নন-লাইফ বীমাখাতে ৪০৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বেড়ে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩২৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। প্রবৃদ্ধি ১৩.৮৬ শতাংশ।

২০১৫ সালে বীমাখাতে ১ হাজার ১২১ কোটি ৩ লাখ টাকা বেড়ে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১৭৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। তবে প্রবৃদ্ধির হার ৪.৯৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৭.৫৬ শতাংশ। বছরটিতে লাইফ বীমাখাতে ১ হাজার ৯৯৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা টাকা বেড়ে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৭৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। প্রবৃদ্ধি ৮.০৯ শতাংশ।আর নন-লাইফ বীমাখাতে ১২১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বেড়ে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৪৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। প্রবৃদ্ধি ৩.৬৫ শতাংশ।

২০১৬ সালে বীমাখাতে ১ হাজার ২৪১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বেড়ে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৪১৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। তবে প্রবৃদ্ধির হার ৩.৪৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪.১২ শতাংশ। বছরটিতে লাইফ বীমাখাতে ১ হাজার ৫৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা টাকা বেড়ে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৭৮৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। প্রবৃদ্ধি ৩.৯৬ শতাংশ।আর নন-লাইফ বীমাখাতে ১৮৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বেড়ে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬২৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। প্রবৃদ্ধি ৪.১২ শতাংশ।

উল্লেখ্য, ট্রেজারি বিল, সরকারি বন্ড ও সিকিউরিটিজ ব্যাংকে জমা, শেয়ার, মিউচ্যুয়াল ফান্ড, বন্ড বা ডিবেঞ্চার, রিয়েল এস্টেট ও স্থাবর সম্পত্তি এবং অন্যান্য বিনিয়োগ মিলিয়ে বীমাখাতের মোট বিনিয়োগের হিসাব করা হয়।