কম প্রিমিয়ামে বীমা সুবিধা চায় টেক্সটাইল মিলগুলো

রহমান সিদ্দিকী: দেশের টেক্সটাইল মিল মালিকরা কম প্রিমিয়াম বীমা করতে চায়। এই দাবিতে বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ'র কাছে আবেদন করেছে টেক্সটাইল মিল মালিকদের সমিতি বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।

এতে দাবি করা হয়েছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ'র সদস্যভুক্ত শতভাগ রপ্তানীমূখী পোষাক কারখানার জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত প্রিমিয়াম দিয়েই তাদের বীমা করার সুযোগ দিতে হবে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি এ আবেদন করা হয়।  

আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, বিটিএমএ'র আবেদনের বিষয়ে ফায়ার রেটিং উপ-কমিটির সভায় আলোচনা হয়েছে। পরবর্তীতে মূল কমিটিতে এ বিষয়ে আলোচনা হবে। সেখানে বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।  

উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ৯ নভেম্বর সেন্ট্রাল রেটিং কমিটির একটি সার্কুলারে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ'র সদস্যভুক্ত শতভাগ রপ্তানীমূখী কারখানাগুলোর জন্য প্রচলিত প্রিমিয়াম হারের চেয়ে ১০ শতাংশ কম হারে বীমা করার সুযোগ দেয়া হয়।

এদিকে বিটিএমএ'র আবেদনের বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বীমা মালিকরা। কারো কারো মতে, বিটিএমএ'র জন্য বিশেষ প্রিমিয়াম হার নির্ধারণ করা হলে বীমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয় কমে যাওয়ার পাশাপশি সরকারের রাজস্ব আয় কমবে।  

তাদের মতে, গত চার পাচ বছর থেকে পোষাক খাত ও টেক্সটাইল খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। এ অবস্থায় টেক্সটাইল মালিকদের কম হারে প্রিমিয়াম দিয়ে পলিসি করার সুযোগ দেয়া হলে বীমাখাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আবার কেউ বলছেন, দাবির যৌক্তিকাতা রয়েছে। গামেন্টস খাতের মত টেক্সটাইল মিল কারখানাগুলোও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এমন অবস্থায় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ'র সদস্যভুক্তদের সুবিধা দেয়া হলে তাদের কেন দেয়া হবে না।

১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশন'র আবেদনে বলা হয়েছে, দেশজুড়ে সংগঠনটির সদস্যভুক্ত ১ হাজার ৪৬১টি মিল রয়েছে। এর মধ্যে স্পিনিং মিল রয়েছে ৪২৫টি, উইভিং ৭৯৬টি, ডাইয়িং-প্রিন্টিং-ফিনিসিং ২৪০টি। খাতটিতে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

সংগঠনটির দাবি অনুসারে, বর্তমানে স্পিনিং উপখাতে বিটিএমএ'র মিলসমূহের উৎপাদিত সুতা দ্বারা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রায় সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানো হচ্ছে। এ ছাড়াও রপ্তানীমূখী পোষাক শিল্পের নীট সুতার চাহিদার ৮৫-৯০ ভাগ এবং ওভেন সুতার চাহিদার ৩৫-৪০ ভাগ মেটানো হয়।

টেক্সটাইল মিলগুলোকে তাদের ফ্যাক্টরি বিল্ডিং, মেশিনারিজ ও কাঁচামাল এবং ফিনিশড গুডস সংরক্ষণের জন্য অগ্নি বীমা গ্রহণ করতে হয়। বিটিএমএ'র মিলসমূহ উৎপাদিত সুতা ও ফেব্রিক ব্যঅক-টু-ব্যাক এলসি'র বিপরীতে সম্পূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রায় রপ্তানীমূখী পোষাক শিল্পে সরবরাহ করে।

টেক্সটাইল মিল মালিকরা বলছেন, অগ্নি বীমা প্রিমিয়াম বাবদ তাদের প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে। ৪৬টি কারখানার সাম্প্রতিক তথ্যে বলা হয়েছে, ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৩১ লাখ ২৩ হাজার ৯৪০ টাকা বীমা অংক বাবদ ১৬ কোটি ৮৬ লাখ ৮২ হাজার ৬৬৩ টাকা পরিশোধ করেছে।

টেক্সটাইল মিল মালিকদের দাবির বিষয়ে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান ও বিআইএ'র প্রেসিডেন্ট শেখ কবির হোসেন বলেন, কেউ চাইলেই তো তাকে সুযোগ-সুবিধা দেয়া যায় না। যেই প্রেক্ষিতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ'কে প্রিমিয়াম ছাড় দেয়া হয়েছে বিটিএমএ'ও যদি একই পর্যায়ে আসে তাহলে তাদেরও এ সুবিধা দেয়া যেতে পারে।

তিনি আরো বলেন, যেকোন লোক যেকোন বিষয় দাবি করতে পারে। তবে আলোচনার মাধ্যেমে এর সুরাহা হবে। আইডিআরএ'র কাছে তারা দাবি জানিয়েছে, আইডিআরএ আমাদের সাথে আলোচনা না করে কিছু করবে না। তাই বিটিএমএ'র জন্যও আলোচনার দরজা খোঁলা। আলোচনায় মিললে তারাও এ সুবিধা পাবে।

পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্সের কনসালটেন্ট কিউএএফএম সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বিটিএমএ'র দাবি যুক্তিসঙ্গত। গার্মেন্টস সেক্টর থেকে টেক্সটাইলস সেক্টরকে আলাদা করার সুযোগ নাই। টেক্সটাইল সেক্টরের অবদানে এগিয়ে যাচ্ছে গার্মেন্টস সেক্টর। গার্মেন্টস সেক্টরের বিদেশ নির্ভরতা কমিয়েছে এনেছে এই টেক্সটাইলস সেক্টর।

পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্সের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মনিরুল ইসলাম বলেন, বিটিএমএ'কে প্রিমিয়াম ছাড় দেয়া হলে এটা বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য অবশ্যই ভালো হবে না। কারণ, তাদের প্রিমিয়াম আয় কমে যাবে। তবে বিটিএমএ'র জন্য এটা ভালো। এসব কারাখানাকে প্রিমিয়াম ছাড় দেয়া হলে বীমা কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

উল্লেখ্য, বীমাখাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে ২০১১ সালে শতভাগ রপ্তানীমূখী পোষাক কারাখানার জন্য প্রিমিয়ামর বিশেষ মূল্যহার তুলে দিয়ে ২৪ নং সাকুলার জারি করে আইডিআরএ'র সাবেক চেয়ারম্যান এম শেফাক আহমেদ।

পরে ওই বছরের ২৮ আগস্ট আবুল খায়ের মিল্ক প্রোডাক্ট ও পিএইচপি গ্রুপ এ আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে পৃথক ২টি রিট করে। ফলে সেন্টাল রেটিং কমিটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে রিট দুটি ২০১৬ সালে খারিজ হয়, যার সাটিফাইট কপি আইডিআরএর হাতে আসে গত বছরের ৫ মে।

এরপর ১৫ মে আইডিআরএ ৩৯ নং প্রজ্ঞাপনে (সূত্র-জিএডি১০০৩/২০১ স্মারক নং ৬৭৩, তাং ১৫-৫-২০১৫) বিশেষ মূল্যহার তুলে দেয়া সংক্রান্ত ২৪ নং সার্কুলারে সকল আদেশ তুলে নেন।