ফারইষ্ট ইসলামী লাইফে গণ বদলি

নিজস্ব প্রতিবেদক: ফারইষ্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কর্মকর্তাদের গণহারে বদলি করা হয়েছে। প্রধান কার্যালয় থেকে শুরু করে বিভাগীয় কার্যালয়, আঞ্চলিক কার্যালয় এবং সার্ভিস সেন্টারগুলোর কর্মকর্তারাও এই গণ বদলির শিকার হয়েছেন। সোমবার কোম্পানির ৩টি অফিস আদেশে ৪০ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হয়।

অন্যদিকে সিনিয়র কর্মকর্তাকে জুনিয়র কর্মকর্তার স্থলে এবং জুনিয়র কর্মকর্তাকে সিনিয়রের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এতে মাঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম ক্ষোভ। কিন্তু চাকরি হারানোর ভয়ে কেউ মুখ খুলতেও সাহস করছেন না।

এতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাও নষ্ট হয়েছে- এমন অভিযোগ করে অনেকে বলেন, এমন পরিস্থিতি চললে যে কোনো সময় কোম্পানি ক্ষতির মধ্যে পড়বে। 

অভিযোগ রয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে বর্তমান ম্যানেজমেন্টের একটি অংশ দেশের শীর্ষ স্থানীয় এই ইসলামী বীমা কোম্পানিতে আধিপত্য বিস্তারে নানা কৌশল অবলম্বন করে আসছে। এতে অহরহই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে দীর্ঘদিন থেকে চাকরিরত উর্ধ্বতন কর্মকতাদের।

ইন্স্যুরেন্সনিউজবিডি'র কাছে এমন পরিস্থিতির জানিয়েছেন কোম্পানিটির মাঠ পর্যায়ের বেশ ক'জন কর্মকর্তা। কিন্তু নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে। তাদের শঙ্কা, কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট জানতে পারলে চাকরি হারিয়ে পথে বসতে হবে।  

তাদের বক্তব্য, বীমা বাজারের বর্তমান অবস্থায় নতুন চাকরি পাওয়াও কঠিন। এছাড়া যেসব গ্রাহকের পলিসি করেছেন তাদের কাছেও রয়েছে তাদের দায়বদ্ধতা।  

ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কষ্ট করে গড়ে তোলা এলাকা থেকে যখন ভাল ব্যবসা পাওয়ার সময় হয় তখনই পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে নতুন কর্মস্থলে। অন্যদিকে বাড়ানো হয়েছে ব্যবসা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা। এতে  বিপাকে পড়েছেন এক সময়ের ব্যবসা সফল এসব কর্মকর্তা। নতুন বছরের ব্যবসা সংগ্রহের টার্গেট পূরণ নিয়েও আতঙ্ক রয়েছেন তারা।

নতুন টার্গেট পূরণ না করতে পারলে আবার তাদের বদলি, না হয় পদাবনতির শিকার হতে হবে, এমন শঙ্কার কথা জানালেন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ মার্চ ফারইষ্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদের ২২৬তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্তের বরাত দিয়ে ৩টি আদেশে কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের ৫ জন কর্মকর্তা, বিভাগীয় কার্যালয়ের ১২ জন কর্মকর্তা, ২ জন জোনাল কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন সার্ভিস সেন্টারের ২০ জন ইনচার্জকে বদলি করা হয়।

এর মধ্যে বদলি আদেশ নং-৩৪/২০১৮- এ ১১ জন কর্মকর্তার কর্মস্থল পরিবর্তন করা হয়েছে। এসব বদলি কর্মকর্তার মধ্যে রয়েছেন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস-প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি) ও প্রধান কার্যালয়ে ইস্টার্ন রিজিয়ন (একক বীমা)'র ইনচার্জ মো. আবুল হাসেম। তার নতুন কর্মস্থল রাজশাহী ডিভিশনাল অফিস (একক বীমা) । সেখানে তাকে ইনচার্জ'র দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে আবুল হাসেমের কর্মস্থলে দেয়া হয়েছে তারই জুনিয়র কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীমকে। ইব্রাহীম কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ভাইস-প্রেসিডেন্ট (ইভপি) ও নোয়াখালী ডিভিশনাল অফিস (একক বীমা)'র ইনচার্জ। ইব্রাহীম এখন কোম্পানির ইস্টার্ন রিজিওন (একক বীমা)'র ইনচার্জ। অর্থাৎ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে অধস্তন কর্মকর্তার পদে এবং অধস্তন কর্মকর্তার স্থলে দেয়া হয়েছে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে।

একইভাবে এসইভিপি ও ইস্টার্ন রিজিওন (সাবী)'র ইনচার্জ আশরাফুজ্জামান আমজাদকে প্রধান কার্যালয় থেকে বদলি করে নতুন ও ছোট কর্মস্থল ময়মনসিংহ ডিভিশনাল অফিস (একক বীমা)'র ইনচার্জের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আর তার স্থলে অর্থাৎ প্রধান কার্যালয়ে ইস্টার্ন রিজিওন (সাবী)'র ইনচার্জের দায়িত্ব দেয়া হয়ে এসইভিপি ও ঢাকা ডিভিশন (একক বীমা)'র ইনচার্জ মো. আব্দুল মতিনকে। কর্ম সময়ের দিক দিয়ে আব্দুল মতিন আশরাফুজ্জামানের জুনিয়র।

এদিকে এসভিপি ও ঢাকা ডিভিশনাল অফিসের (সাবী) ইনচার্জ মো. মজিবুল মওলাকে বদলি করে পাঠানো হয়েছে সিলেট ডিভিশনাল অফিসে (সাবী)। সেখানে তাকে ইনচার্জের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আর সিলেট ডিভিশনাল অফিস (সাবী)'র ইনচার্জ মো. মনিরুল ইসলামকে বদলি করে প্রধান কার্যালয়ে আনা হয়েছে। প্রধান কার্যালয়ে তাকে উন্নয়ন প্রশাসন'র দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এসইভিপি'র জুনিয়র কর্মকর্তা হওয়ার পরেও তাকে উন্নয়ন প্রশাসনের ইনচার্জ করা হয়েছে।

অন্যদিকে জুনিয়র কর্মকর্তা হওয়ার পরও একজন সার্ভিস সেন্টারের ইনচার্জকে ডিভিশনাল অফিসের ইনচার্জ করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তার নাম মো. এমরান হোসনে। জয়েন্ট সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট (জেএসভিপি) মর্যাদার এই কর্মকর্তার দায়িত্ব ছিল কেরানীহাট সার্ভিস সেন্টারের ইনচার্জ। সেখান থেকে বদলি করে তাকে বরিশাল ডিভিশনাল অফিসের (সাবী) ইনচার্জের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অথচ ডিভিশনাল ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করেছেন এমন অনেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টও রয়েছেন, যারা এখন প্রিমিয়াম সংগ্রহের দিক থেকে দুর্বল সার্ভিস সেন্টারে ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, পদোন্নতি দেয়ার পর এমন সব এলাকায় তাদের বদলি করা হয় যেখানে ব্যবসা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ তো দূরের কথা পরিচিতি লাভ করতেই কেটে যায় তাদের সময়। এদিকে বদলির পর ভালো ব্যবসা না পেয়ে তাদেরকে পুনরায় আগের পদে ফিরিয়ে নেয়া হয়। একইসঙ্গে ব্যবসায়িকভাবে আরো খারাপ এলাকায় তাদের বদলি করা হয়।কমিয়ে দেয়া হয় তাদের সুযোগ-সুবিধাও।  

এ অবস্থায় বদলি আতঙ্ক বিরাজ করছে ফারইষ্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কর্মকর্তাদের মাঝে। কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি দিয়ে বদলি করায় তারা কিছু বলতেও পারছেন না। অনেকটা জোর করেই তাদের বদলি করা হচ্ছে। কর্মকর্তাদের দৌড়ের ওপর রাখতেই এ পদোন্নতি-বদলির কৌশল গ্রহণ করেছে ফারইষ্ট লাইফ কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে কোম্পানির মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হেমায়েত উল্যাহর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীত খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোন সাড়া দেননি।