আদিবার সময় ২০ কোটি টাকা আত্মাসাৎ হয়েছে ডেল্টা লাইফে

গাযী আনোয়ার: আদিবা রহমান ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহীর দায়িত্বে থাকাকালে কোম্পানিতে ২০ কোটি ৪৭ লাখ ৭১ হাজার ৫৭৯ টাকা আত্মাসাৎ হয়েছে বলে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। না খেয়ে বিল দাখিল, সফটওয়্যার ক্রয়ে অনিয়ম, সিইওর মৌখিক নির্দেশে নগদ উত্তোলন, নিয়মবহির্ভূত পরিচালকদের গাড়ি ব্যবহার, কাজ না করে বিল দাখিল, অডিট ফার্মের নামে ভুয়া বিল দাখিলসহ নানা অনিয়ম করে এ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সাধারণ বীমা পলিসি গ্রাহকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার কারণে এ বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সাবেক সদস্য সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লাকে ডেল্টা লাইফে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় আইডিআরএ। সেদিন বিকেলেই পুলিশের সহায়তায় কোম্পানিটির কার্যালয়ে গিয়ে তিনি দায়িত্ব নেন। প্রশাসকের দায়িত্বভার নেয়ার পরই ডেল্টা লাইফের অনিয়ম নিয়ে পরিচালিত অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় এ চিত্র উঠে এসেছে।

খাবারের ভুয়া বিলের মাধ্যমে নগদ আত্মসাৎ ৩৭,৮২,০৬৬ টাকা:

২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন ভুয়া বিলের মাধ্যমে ৩৭ লাখ ৮২ হাজার ৬৬ টাকা শুধু খাবার বিল বাবদ নগদে উত্তোলন করা হয়েছে। এই টাকার ব্যয় একক বীমা ও গণ-গ্রামীণ বীমার নামে হিসাবভুক্ত করা হয়েছে। এই খাবারের বিলসমূহ বিভিন্ন হোটেলের হলেও একই ব্যক্তি কর্তৃক লেখা হয়েছে। তাছাড়া যে দিনের বিল সংযুক্ত করা হয়েছে ওই দিন তারা প্রধান কার্যালয়ে অফিস করেছেন বলে গাড়ির লকবুক ও অফিসের হাজিরা সফটওয়্যারে প্রমাণ রয়েছে। এই ভুয়া বিল তৈরির সঙ্গে জেইভিপি পল্লব ভৌমিক, প্রাক্তন সিএফও মিল্টন বেপারী এবং জেএভিপি জুলহাস উদ্দিনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তদন্ত কমিটি প্রমাণ পেয়েছে।

কোম্পানির বিল্ডিং মেইনটেন্যান্স কাজের নামে নগদ আত্মসাৎ ৩০,৫৭,৬৭০ টাকা:

কোম্পানির কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগের আয়কর নিষ্পত্তি ও আইনী খরচ সমন্বয়ের জন্যে এস্টেট বিভাগের বিল্ডিং মেইনটেন্যান্সের বিভিন্ন কাজের ভুয়া নোট তৈরি করা হয়। সাবেক সিএফও মিল্টন ব্যাপারী, জেইভিপি-ওএল একাউন্টস পল্লব ভৌমিক এবং প্রদীপ হালসোনা (ভিপি, কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগ) সম্মিলিতভাবে সাইট ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করে ভুয়া বিলগুলো তৈরি করে এবং তা কোম্পানির সিইও’র কাছ থেকে অনুমোদন করিয়ে আনে। ওই সমস্ত ভাউচার সমন্বয়ের সঠিক কোন হিসাব কোম্পানিতে সংরক্ষিত নেই বলে জানান সাইট ইঞ্জিনিয়ার (ইনচার্জ) মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান। তাছাড়া কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী ১০ হাজার টাকার উপরে ক্রয় করতে হলে কোটেশন সংগ্রহ করার নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি।

বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ ৯৪,৬৫,২৮৩ টাকা:

২০২০ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের ৩ মার্চ এই সময়ের মধ্যে ডেল্টা লাইফের অডিট বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ৯২ লাখ ৬ হাজার ১৪৮ টাকা। এই কাজের বিপরীতে ট্যাক্স বাবদ ১ লাখ ৩ হাজার ৬৫৪ টাকা এবং ভ্যাট বাবদ ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৮১ টাকা কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়নি। বিল-ভাউচারের খরচের ক্ষেত্রে অধিকাংশ বিল ভাউচারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেই এবং ক্ষমতা বহির্ভূতভাবে বিল প্রদান করা হয়েছে। এমনকি বিল গ্রহাণকারীর স্বাক্ষরও অস্পষ্ট বলে নিরীক্ষায় মন্তব্য করা হয়েছে।

অডিট ফার্ম খন্দকার মাহবুব উদ্দিন এন্ড এসোসিয়েটসকে ২০ লাখ ৩৬ হাজার ৫৪০ টাকা নগদ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু আইডিআরএ’র নির্দেশনা অনুযায়ী নগদ ৫,০০০ টাকার উপরে পেমেন্ট করতে হলে তা অবশ্যই চেকের মাধ্যমে করতে হবে।

ডেল্টা লাইফের চীফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার এবং সিইও এর সরাসরি নির্দেশে ৯২ লাখ ৬ হাজার ১৪৮ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে। কিন্তু এই খরচের ব্যাপারে কন্ট্রোল এন্ড কমপ্লায়েন্স বিভাগের কোনো ক্লিয়ারেন্স ছিল না। তাছাড়া ৭৮ লাখ ২০ হাজার টাকা উত্তোলনে প্রাপ্তি স্বীকারের কোন স্বাক্ষর নেই। সিইও’র নির্দেশনায় উত্তোলন হয়েছে ৩২ লাখ ২০ হাজার টাকা। আর ১০ লাখ টাকা উত্তোলন হয়েছে কোন অনুমোদন ছাড়াই।

পরিচালকদের নিয়মবহির্ভূত গাড়ি ব্যবহারে কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি ৫,৫০,৪৪,০৫০ টাকা:

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ২০১৪ সালের ২৪ এপ্রিলে বিলাসবহুল যানবাহনে উচ্চ ব্যয় পরিহার প্রসঙ্গে একটি সার্কুলার জারি করে। তাতে বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার জন্য জিপ ক্রয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৮৫ লাখ টাকা এবং কারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকার অধিক মূল্যের মোটরযান বীমা কোম্পানির অর্থে ক্রয় করা যাবে না। পুলের জন্য গাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হলো এবং প্রধান কার্যালয়ের পুলে ৪টির বেশি গাড়ি রাখা যাবে না।

ডেল্টা লাইফ গাড়ি ক্রয় এবং ব্যবহার উভয় ক্ষেত্রে আইডিআরএ’র সার্কুলার অমান্য করেছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধান কার্যালয়ের গাড়ি চালকদের বিবরণ অনুযায়ী নিরীক্ষক দল ১০টি গাড়ির সন্ধান পেয়েছে। কোন ব্যক্তি গাড়ি সুবিধা পাবেন তা কোম্পানির সিইও’র মৌখিক নির্দেশনাই চূড়ান্ত ছিল। তাছাড়া গাড়ির লক বুকে গাড়ি চালকদেরও কোন স্বাক্ষর নেয়া হতো না। বিধিবহির্ভূত গাড়ি ক্রয়, ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে কোম্পানির সর্বমোট আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৫০ লাখ ৪৪ হাজার ৫০ টাকা।

জুম মিটিং বাবদ ৪,৯৫,০০০ টাকা আত্মসাৎ:

কোম্পানির সিইও’র সঙ্গে ১,৬৫০জন উন্নয়ন ব্যবস্থাপক, জোন ইনচার্জ, ইউনিট ম্যানেজার ও সংগঠকদের জুম মিটিং বাবদ উত্তোলন করা হয় অংশগ্রহণকারীদের প্রদানের জন্য। কিন্তু কোম্পানির ইও (কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগ) কমল বড়ুয়া এই অর্থ নিজে আত্মসাৎ করেন।

ট্রেইনিং এর অর্থ ফেরত বাবদ আত্মসাৎ ২,৩৫,০০০ টাকা:

ডেল্টা লাইফ ও প্রোফেশনাল এডভান্সমেন্ট বাংলাদেশ নামে একটি কোম্পানির সঙ্গে বীমা এজেন্টদের প্রশিক্ষণের চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী যদি কোন প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত না হয় তাহলে ঢাকার বাহিরে জনপ্রতি ১ হাজার এবং ঢাকার মধ্যে ১২৫০ টাকা নগদে ফেরত প্রদান করবে। কিছু প্রশিক্ষণ না হওয়ায় ট্রেইনিং প্রতিষ্ঠান ৫টি চেকের মাধ্যমে ২,৯৯,৪০০ টাকা ফেরত দিলেও কোম্পানির হিসাবে হিসাবভুক্ত করা হয় মাত্র ৬৪ হাজার ৪০০ টাকা এবং বাকী টাকা কোম্পানির জেইভিপি পল্লব ভৌমিক আত্মসাৎ করেন।

সিইও মৌখিক নির্দেশে নগদ ভাউচারের নামে আত্মসাৎ ৪৭,৮৫,০০০ টাকা:

২০২০ সালের বিভিন্ন তারিখে কর্তৃপক্ষের (তৎকালীন সিইও) নির্দেশে ট্যাক্স অফিসের খরচের জন্য মোট ৪৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা কেন্দ্রীয় হিসাব থেকে উত্তোলন করেন মিল্টন বেপারী এফসিএ (সিএফও) এবং পল্লব সেই টাকা দেয়া হয় ভৌমিক (জেইভিপি) কে। কিন্তু গ্রহীতা হিসেবে কোন স্বাক্ষর নেই বলে তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষ্য দেন কেম্পানির ইও ড. কমল বড়ুয়া। এই অর্থ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এজেন্ট কমিশন খাতে সমন্বয় করা হয়। এই কল্পিত খরচের উপরে ১,১৯,৬২৬ টাকা কর নির্ধারিত হলেও কর প্রদান করা হয় ৫৯,২১৩ টাকা।

কর অফিসের খরচের নামে আত্মসাৎ ,০৬,৪৩,০০০ টাকা:

২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিভিন্ন তারিখে তৎকালীন সিইও’র মৌখিক নির্দেশে ৩ কোটি ৬৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা কোম্পানির কেন্দ্রীয় হিসাব থেকে কোম্পানির সিএফও মিল্টন বেপারী এবং একক বীমার জেইভিপি পল্লব ভৌমিক উত্তোলন করলেও কোন স্বাক্ষর করেননি। এই অর্থ একক বীমা, গণ-গ্রামীণ বীমা, গ্রুপ বীমা এবং স্বাস্থ্য বীমার হিসাবে বিভিন্ন অংকে জরুরি খরচ হিসেবে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে এই অর্থ কমিশন খরচ হিসেবে বিভিন্ন ভাউচারের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। এই কমিশনের ওপর কর আরোপিত হয় ৬ লাখ ৩০ হাজার ৪৪০ টাকা। কিন্তু কর পরিশোধ করা হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার ৪৯৬ টাকা। ১ লাখ ৭৯ হাজার ৯৪৪ টাকার কর কম পরিশোধ করা হয়েছে।

মৃত্যুদাবি পরিশোধে বার্ষিক প্রতিবেদন বিভাগীয় তথ্যে গড়মিল ৬,৩৪,২৭,৩৩০ টাকা:

২০১৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে মৃত্যুদাবি পরিশোধ দেখানো হয়েছে ৯ কোটি ১৭ লাখ ৭০ হাজার ৬৩৪ টাকা। কিন্তু কোম্পানির বিভাগীয় তথ্যে সংরক্ষিত রয়েছে ৭ কোটি ৮৬ লাখ ৭২ হাজার ৪৩০ টাকা। একইভাবে ২০১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে মৃত্যুদাবিতে পরিশোধ দেখানো হয়েছে ১২ কোটি ৩৮ লাখ ৩২ হাজার ৪০১ টাকা। তবে কোম্পানিতে সংরক্ষিত বিভাগীয় তথ্যে দেখা যায় এই সময়ে মৃত্যুদাবি সংক্রান্ত যাবতীয় খরচ হয়েছে ৭ কোটি ৩৫ লাখ ৩ হাজার ২৭৫ টাকা।

সফটওয়্যার ক্রয়ে অনিয়ম, কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি ৩,৩৮,৩৭,১৮০ টাকা:

ভারতীয় কোম্পানি হানসা সলিউশন লিমিটেডের সঙ্গে ডেল্টা লাইফের সফটওয়্যার ক্রয় সংক্রান্ত একটি চুক্তি সম্পাদিত হয় ২০১৪ সালের জুন মাসে। দরপত্র আহবান প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সফটওয়্যার বাবদ ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৩৭ হাজার ১৮০ টাকা পরিশোধ করে ডেল্টা লাইফ। কিন্তু সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণের কোন শর্ত ছিল না ক্রয় চুক্তিতে। ফলে ভারতীয় কোম্পানির সফটওয়্যারটি সঠিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। বর্তমানে ডেল্টা লাইফের অভ্যন্তরীণ লোন ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার দিয়েই কোনমতে পলিসি সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বীমা গ্রাহকদের স্বার্থে অতিদ্রুত বিকল্প সফটওয়্যার অতি জরুরি হয়ে পড়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।

ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আদিবা রহমান অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে ইন্স্যুরেন্সনিউজবিডি’কে বলেন, প্রশাসক কর্তৃক পরিচালিত অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার রিপোর্ট আমি দেখিনি। রিপোর্টে ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করলেই তো আর হবে না, তা প্রমাণ করতে হবে। তাছাড়া এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা শুনানির জন্য ডাকলে সেখানে অভিযোগের বিষয়ে জবাব দিব।

এ বিষয়ে আইডিআরএ’র মুখপাত্র এসএম শাকিল আকতার বলেন, প্রশাসকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যে সকল অনিয়ম উঠে এসেছে তা আমরা প্রথমে রিভিউ করব। পরে প্রতিবেদনের নিরীক্ষকগণ, বর্তমান প্রশাসক এবং কোম্পানির চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসারসহ নিরীক্ষা প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট ডেল্টা লাইফের কর্মকর্তাদেরকে শুনানিতে ডাকা হবে। ওই শুনানিতে বীমা আইন অনুযায়ী দোষীদের বিচার করা হবে জানান তিনি।