নিয়ম ভেঙে গৃহঋণ সুবিধা নিয়েছেন এসবিসি’র বারেক দম্পতি

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিধিমালা লঙ্ঘণ করে গৃহঋণের সুবিধা নিয়েছেন সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি)’র ডিজিএম আব্দুর বারেক ও তার স্ত্রী সাহানা গণি। সাহানা গণি সাধারণ বীমা করপোরেশনের ডিজিএম। বিধি লঙ্ঘণ করে ঋণ নেয়া এ দম্পত্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে আইডিআরএ’র তদন্ত কমিটি। কমিটি গত ৩১ আগস্ট এ প্রতিবেদন দাখিল করে।

সাধারণ বীমা করপোরেশনের ডিজিএম আবদুল বারেক ও নাজিম উদ্দিন আলমের বিরুদ্ধে নানা বিষয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন করপোরেশনটির একজন কর্মকর্তা। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর দাখিল করা অভিযোগ পত্রটিতে অভিযোগকারি কর্মকর্তার কোনো নাম ঠিকানা দেয়া হয় নাই। অভিযোগটি আমলে নিয়ে গত ২৯ জুলাই ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কর্তৃপক্ষ।

আইডিআরএ’র পরিচালক (উপসচিব) আব্দুস সালাম সোনারকে প্রধান করে গঠিত এ কমিটিতে ছিলেন আইডিআরএ উর্ধ্বতন নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোর্শেদুল মুসলিম ও নির্বাহী কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন ভুইয়া। পরে দেলোয়ার হোসেন ভুইয়াকে কমিটি থেকে বাদ দিতে অভিযোগ করেন আব্দুল বারেক। ওই অভিযোগ পত্রে সুপারিশ করেন এসবিসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার আহসান।

পরবর্তীতে এ অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১১ আগস্ট কমিটি পুনর্গঠন করে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। তবে কমিটি থেকে দেলোয়ার হোসেনকে বাদ দেয়া হয়নি। নতুন কমিটিতে প্রধান করা হয় আইডিআরএ’র নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব) এস এম শাকিল আখতারকে। এছাড়া পুনর্গঠিত এ কমিটিতে আইডিআরএ’র কর্মকর্তা মো. রশিদুল আহসান হাবিবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। 

এ কমিটির বিষয়ে আইডিআরএ’র একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে কমিটি থেকে একজন সদস্যকে বাদ দেয়া যুক্তিসঙ্গত মনে না করায় কমিটি থেকে দেলোয়ার হোসেন ভুইয়াকে বাদ দেয়া হয় নাই।

গৃহ নির্মাণ ঋণ প্রদানে অনিয়ম ছাড়াও আরো তিন বিষয়ে আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি।

এর মধ্যে রয়েছে- পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই ২৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারি চূড়ান্ত নিয়োগ দেয়া, বরাদ্দের অতিরিক্ত টাকার গাড়ী মেরামত ও অপেক্ষমান তালিকা থেকে নিয়োগ এবং নিয়ম লঙ্ঘন করে এক কর্মকর্তাকে সাত বার পদোন্নতি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আব্দুল বারেক ও তার স্ত্রী সাহানা গণি আগের ঋণ পরিশোধ না করেই নতুন করে গৃহঋণ নেন। একই সাথে সিলিং অনুসারে গৃহঋণ বাবাদ প্রাপ্য ঋণের সাথে আগের ঋণ সমন্বয় করেন। আগের ঋণ পরিশোধ না করেই তা গৃহ নির্মাণ ঋণের জন্য বরাদ্দকৃত ঋণের সাথে সমন্বয় করাকে বিধি সম্মত না বলে মনে করছে তদন্ত কমিটি।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ঋণ প্রদানের সিলিং অনুযায়ী আব্দুল বারেক ও তার স্ত্রী সাহানা গণি গৃহঋণ বাবদ বরাদ্দ ছিল ৮৫ লাখ করে মোট ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সিলিং অনুসারেই তারা ঋণের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু তারা ঋণ উত্তোলন করেন ১ কোটি ১০ লাখ টাকা। অপর দিকে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা গৃহঋণের জন্য আবেদন করলেও ১ কোটি ১০ লাখ টাকায় তারা ফ্লাট কিনেছেন বলে জেনেছে তদন্ত কমিটি।

পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই নিয়োগ

প্রার্থীর পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই ২৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারি নিয়োগ প্রদান করে সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি)। বিভিন্ন পদে এ নিয়োগ দেয়া হয় গত ৫ বছরে (২০১৭-২০২১)।  এ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে চাকুরি প্রবিধানমালা ১৯৯২ এর পরিপন্থী বলে উল্লেখ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত থাকায় আব্দুল বারেক এবং এডিএম মো. নাজিম উদ্দিন আলম সহ সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রার্থীদের কাছ থেকে ১০০ টাকা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা নিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তীতে যথেষ্ট সময় পাওয়ার পরও পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হয় নাই।

ঢাকা ও সিলেট জোনে বরাদ্দের অতিরিক্ত টাকার গাড়ী মেরামত

২০১৮-২০১৯ সালে গাড়ী মেরামত বাবদ বরাদ্দের অতিরিক্ত ১০ লাখ ৫০ হাজার ৩৫ টাকা ব্যয় করা হয়। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই এই ব্যয় করা হয় ঢাকা ও সিলেট জোনে। অতিরিক্ত এ ব্যয়ের জন্য করপোরেশনের আইন অনুসারে আব্দুল বারেক ও মো. নাজিম উদ্দিন আলমের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।

অপেক্ষমান তালিকা থেকে নিয়োগ, এক কর্মকর্তাকে সাত বার পদোন্নতি

সাধারণ বীমা করপোরেশনের ১৯৯৪ সালের নিয়োগে সহকারী ম্যানেজার পদে যোগদান করেন শাহ মো. সানওয়ার আলম। অপেক্ষমান তালিকা থেকে নিয়োগ দেয়া হয় তাকে। নিয়োগ পাবার পর এই পর্যন্ত ৭ বার পদোন্নতি হয় তার।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, মেরিট লিস্টে প্রাপ্ত নম্বর ঘষামাজাযুক্ত এবং মোট নম্বর তার প্রাপ্ত নম্বর অপেক্ষা কম। যার ফলে মেরিট লিস্টে তার ক্রম মেধা তালিকায় না থেকে অপেক্ষমান তালিকা থেকে সম্পন্ন করা হয়। আর অন্যান্য কর্মকর্তা জিএম, ডিজিএম হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সানওয়ার আলমের কমপক্ষে ৭ বার পদোন্নতি সম্পন্ন করা হয়। পদোন্নতির সময় সাধারণ বীমা করপোরেশনের ডিজিএম (প্রশাসন) পদে মো. আব্দুল বারেক দায়িত্বে ছিলেন।  

তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, শাহ মো. সানওয়ার আলমকে ২০১৫ সালের মে মাসে একবার; ২০১৬ সালের এক বছরে ফেব্রুয়ারী, মার্চ, এপ্রিল, জুলাই মাসে চার বার; ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে একবার এবং ২০১৮ সালের জুলাই মাসে একবার পদোন্নতি দেয়া হয়।  

সহকারী ম্যানেজার শাহ মো. সানওয়ার আলমের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে ডিজিএম মো. আব্দুল বারেক এবং তার সহযোগী এজিএম মো. নাজিম উদ্দিন আলমের বিষয়ে অনিয়মের প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি।

তদন্ত কমিটির সদস্যের বিরুদ্ধে আব্দুল বারেকের যে অভিযোগ

তদন্ত কমিটির সদস্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ২ আগস্ট মো. আব্দুল বারেক বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। এতে দেলোয়ার হোসেন ভুইয়ার বিরুদ্ধে অশোভনীয় আচরণ ও হুমকি প্রদানের অভিযোগ আনা হয়।

অভিযোগ পত্রে বলা হয়, দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া ১৮ জুলাই সন্ধ্যা ৭টায় ফোন করে নির্বাহী পরিচালক পরিচয় দিয়ে ১৯ জুলাই অনুষ্ঠিত করপোরেশনের মানবসম্পদ উন্নয়ন কমিটির সভায় সংস্থার সম্পত্তি সংরক্ষণ বিভাগের ডেপুটি ম্যানেজার আরিফুল ইসলামের শৃংখলাজনিত বিষয় উত্থাপন করতে নিষেধ করেন।

উক্ত বিষয় উত্থাপন করলে মো. দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া ২৭ জুলাই আবার ‘বারেক সাহেব’ সম্বোধন করে কেনো বিষয়টি উত্থাপিত হলো তার কৈফিয়ত চান ফোনে। হুমকি দিয়ে বলে যে, ‘আপনিও পার পাবেন না। আপনার বিরুদ্ধে আনেক অভিযোগ রয়েছে। আমরাও আপনার বিরুদ্ধে তদন্ত করা জন্য আসতেছি।

তবে এ বিষয়ে দেলোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নির্বাহী পরিচালক (যগ্ম সচিব শাকিল আখতারের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।

তবে আইডিআরএ’র নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব) এস এম শাকিল আখতারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয় নাই।

অভিযোগ ও তদন্তের বিষয়ে আব্দুল বারেক বলেন, নাম ঠিকানাবিহীন ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে আমার বিষয়ে তদন্ত করা হয়েছে। ভূয়া চিঠিপত্র দিয়ে এই অভিযোগ আনা হয়েছে। ঋণ নির্ভর করে বেতন স্কেলের ওপর। সেই অনুসারে ঋণ গ্রহণ করেছি। এখানে যে অভিযোগ আনা হয়েছে এটা মিথ্যা ও বানোয়াট।

তিনি বলেন, ২০১৭ সাল থেকে সাধারণ বীমা করপোরেশনে যত নিয়োগ হয়েছে তা অন্য যেকোন সময়ের থেকে স্বচ্ছ হয়েছে।

সানওয়ার আলমকে ৭ বার পদোন্নতি দেয়া হয়েছে শুনে বিস্ময় প্রকাশ করে আব্দুল বারেক বলেন, আমার জানা মতে উনি তো ৩ বার পদোন্নতি পেয়েছেন। ৭ বার হলে তো উনি এমডি হয়ে যেতেন। তাছাড়া যেহেতু তার নিয়োগের সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না, সে বিষয়ে আমি জানি না।

তিনি আরো বলেন, আমার সুনাম নষ্ট করার জন্য এই অভিযোগ করা হয়েছে। অনেক দুষ্ট লোক এই অফিসে আছে। যাদের বিরুদ্ধে আমি বিভিন্ন সময় দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করেছি। তারাই এই কাজটা করেছে। এই অভিযোগ আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য। আমি মনে করি, আমি কোন সময় অন্যায় কিছু করিনি ও প্রশ্রয় দেয়নি।