বিমান দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত যাত্রীদের ক্ষতিপূরণের বিধান
তারিকুর রহমান:
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এর দুর্ঘটনার কারণে আহত ও নিহত যাত্রীরা কত টাকা ক্ষতিপূরণ পাবেন তা নিয়ে নানান মতামত আসছে। ইন্স্যুরেন্সনিউজবিডি ডটকম এর সম্পাদক জনাব মোস্তাফিজুর রহমানের অনুরোধে আমি এই লেখার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের আসল চিত্র তুলে ধরছি।
ব্যাপারটা অনেক জটিল। কারণ, প্রতিটি দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ দেয়ার হিসাব বিভিন্ন রকম হয়। তবে আমি চেষ্টা করেছি সহজভাবে লেখার জন্য। জটিলতার কিছু নমুনা- যাত্রী টিকিট কোন দেশ থেকে নিয়েছিলেন, টিকিটটি কি সিঙ্গেল ট্রিপ এর জন্য ছিল নাকি রাউন্ড ট্রিপ এর জন্য ছিল, যাত্রী কোন দেশের নাগরিক, যাত্রী যে দেশের নাগরিক সেই দেশ কোন কনভেনশন এর আওতাভুক্ত, দুর্ঘটনা কবলিত এয়ার লাইন্সটির টিকিটে এয়ার লাইন্স কোন কনভেনশন মানবে বলে লিখেছে, দুর্ঘটনাটির জন্য কোনভাবে এয়ারলাইন্স দায়ি কিনা। তবে বিমানটি কোথায় দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছে তা বিবেচনায় আনা হয় না।
আমরা সবাই জানি ইউএস-বাংলা তাদের বিমান দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত তৃতীয়পক্ষ ও যাত্রীদের ক্ষতিপূরণ দেবার জন্য লায়াবিলিটি বীমা করে রেখেছে এবং এও শুনেছি এর পরিমাণ ১০ কোটি মার্কিন ডলার। সুতরাং এই দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত তৃতীয়পক্ষ ও যাত্রীদের যে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে তা থেকে ১০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত বীমা কোম্পানি দিবে। আর যদি মোট ক্ষতিপূরণ ১০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি হয় তবে তা ইউএস-বাংলাকে নিজ তহবিল থেকে দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে এই দুর্ঘটনার কারণে নেপালের যে ক্ষতি/খরচ হয়েছে (যেমন- আগুণ বন্ধ করা, ধ্বংসাবশেষ সরানো, বিমান বন্দরের আয়) নেপাল সরকার তা দাবি করতে পারেন। আর এই দাবিগুলোও ওই লায়াবিলিটি বীমার আওতায় আসবে।
এয়ারলাইন্সগুলো ১৯২৯ সালের ওয়ারসো কনভেনশন ১৯২৯ নামে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বিভিন্ন সময়ে তার সংশোধনীর অনুযায়ী তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে।
আবার কোন দেশ যদি এই সংশোধনীগুলোর সাথে একমত হয় তবে তারা সংশোধনীগুলোতে স্বাক্ষর করে তাদের সম্মতি জানায় এবং তখন ওই দেশের এয়ারলাইন্সগুলো স্বাক্ষরকৃত সংশোধনীর আওতায় এসে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে।
ওয়ারসো কনভেনশন সর্বশেষ সংশোধনী হয় মন্ট্রিল কনভেনশন ১৯৯৯ তে, যাতে যাত্রীদেরকে আরও সুরক্ষা ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের শর্ত থাকে। তবে বাংলাদেশসহ অনেক দেশ এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে নাই।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এর দুর্ঘটনার কারণে কোন আহত বা নিহত যাত্রী কত টাকা ক্ষতিপূরণ পাবে তা নিম্মলিখিত বিষয়গুলোর ওপর নির্ভর করে।
১। এয়ার লাইনের টিকিটে এয়ারলাইন কোন কনভেনশন মানবে বলে লিখেছে।
২। যে দেশের যাত্রী আহত বা নিহত হয়েছেন সেই দেশ কোন কনভেনশন এর আওতাভুক্ত।
৩। দুর্ঘটনাটি এয়ারলাইনের চালকের কারণে বা এয়ারক্রাপ্টের যান্ত্রিক গোলোযোগের কারণে হয়েছে কিনা। মানে দুর্ঘটনার জন্য কোনভাবে এয়ারলাইন দায়ি কিনা।
৪। যাত্রীর বিস্তারিত। যেমন- কোন দেশের নাগরিক, বয়স, পেশা, আয়, লিঙ্গ ইত্যাদি।
প্রথমে আসি ইউএস-বাংলার টিকিটে কি লেখা আছে। ইউএস-বাংলার টিকিটের শর্তে লেখা আছে তারা কনভেনশন বলতে ওয়ারসো কনভেনশন ১৯২৯ কে ও হেগ প্রটোকল ১৯৫৫ কে বুঝাচ্ছে।
ওয়ারসো কনভেনশন ১৯২৯ অনুযায়ী কোন যাত্রী আহত বা নিহত হলে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার ফ্রান্ক (এফআরএফ) ক্ষতিপূরণ পাবেন। আর হেগ প্রটোকল ১৯৫৫ অনুযায়ী কোন যাত্রী আহত বা নিহত হলে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৫০ হাজার ফ্রান্ক (এফআরএফ) ক্ষতিপূরণ পাবেন। আমার জানা মতে, বাংলাদেশ ২৬ মার্চ, ১৯৭৩ সালে হেগ প্রটোকল ১৯৫৫ তে স্বাক্ষর করে।
সর্বোচ্চ ২ লাখ ৫০ হাজার ফ্রান্ক (এফআরএফ) ক্ষতিপূরণ পাওয়াকে বলে স্ট্রিক্ট লায়াবিলিটি। যা এয়ারলাইন দিতে বাধ্য থাকবে কোন প্রশ্ন না তুলেই। যা আজকের মার্কিন ডলার হয় প্রায় ৪৭ হাজার ১শ' এর মতো (১ ফ্রান্ক=০.১৮৮৪০৪ মার্কিন ডলার) ।
অনেকে তাদের মতামতে বলেছেন, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ হবে ২০ হাজার মার্কিন ডলার। উনারা ২০ হাজার মার্কিন ডলার কোথা থেকে পেলেন তা আমার জানা নাই। কারণ, হেগ প্রটোকল ১৯৫৫ তে ২ লাখ ৫০ হাজার ফ্রান্ক পাবে বলে বলা হয়েছে। মার্কিন ডলারে কত হবে তা বলা নাই।
বাংলাদেশে যেহেতু মন্ট্রিল কনভনেশন ১৯৯৯ এর চুক্তিতে স্বাক্ষর করে নাই তাই যাত্রীরা সেটা অনুয়ায়ী ক্ষতিপূরণ পাবে না। যার পরিমাণ হতো ১ লাখ ১৩ হাজার ১শ' SDRs, আজকের মার্কিন ডলারে হয় প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার মার্কিন ডলার।
যদি দুর্ঘটনার জন্য এয়ারলাইন দায়ি থাকে তবে ক্ষতিপূরণ আর কোন কনভেনশনের আওতায় আসবে না। সে ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ আদালত কর্তৃক নির্ধারিত হবে, যাত্রীর নাগরিকত্ব, বয়স, পেশা, আয়, লিঙ্গ ইত্যাদির উপর। যা অবশ্যই কনভেনশনে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের চেয়ে অনেক বেশি হয়।
কত দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে? সাধারণত এয়ারলাইনগুলো ১৫ দিনের মধ্যে প্রায় ৩/৪ শতাংশ ক্ষতিপূরণ অগ্রিম হিসেবে প্রদান করে। আর বাকীটার জন্য যদি আদালতে না যাওয়া হয় তবে তাও তারা দ্রুত দিয়ে দেন ।
আহত যাত্রীরা কিন্তু নিহত যাত্রীদের মত ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন, যদি তারা প্রমাণ করতে পারেন যে, তাদের চিকিৎসার জন্য তারা ৪৭ হাজার ১শ' মার্কিন ডলার খরচ করেছেন । এজন্য দেশ-বিদেশের সম্পূর্ণ চিকিৎসা খরচ পাবেন, তবে ৪৭ হাজার ১শ' মার্কিন ডলার পর্যন্ত। আমার জনা মতে বাংলাদেশ বিমানের একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল সিলেটে এবং একজন যাত্রী আহত হয়েছিলেন। উনি দেশ-বিদেশের চিকিৎসার জন্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা পেয়েছিলেন।
যাত্রীরা কিন্তু তাদের কেবিন ব্যাগেজ ও চেকড ব্যাগেজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্যও ক্ষতিপূরণ পাবেন। বিমানের ক্রুদের উত্তরাধিকারীরা প্রতিজনের জন্য১ লাখ মার্কিন ডলার করে পাবেন।
উন্নত বিশ্বে এই ধরণের দুর্ঘটনার জন্য সবাই আদালতে যায় এবং ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কনভেনশনে লেখা থাকার পরও আদালত সব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেন। আবার এয়ারলাইন্সের সাথে আদালতের বাইরে আহত যাত্রীদের এবং নিহত যাত্রীদের উত্তরাধিকারীদের আপস মিমাংসাও হতে দেখা যায়।
যেহেতু আমরা এখনও জানি না এই দুর্ঘটনার জন্য ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স দায়ি কিনা এবং এই তথ্য জানতেও সাধারণত অনেক সময় লাগে তাই আহত যাত্রীরা এবং নিহত যাত্রীদের উত্তরাধিকারীরা সিদ্ধান্ত নিবেন তারা কি করবেন। তারা কি ৪৭ হাজার ১শ' মার্কিন ডলার নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবেন নাকি আদালতে যাবেন। মনে রাখতে হবে আমাদের দেশে আদালতের সিদ্ধান্ত পেতে অনেক সময় লাগে।
লেখকের সর্বশেষ সংশোধনী: আমার মতামত লেখার সময় আমার জানা ছিল না যে, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স প্রতি যাত্রীর জন্য ২ লাখ মার্কিন ডলারের পারসোনাল এক্সিডেন্ট বীমা করে রেখেছিল।
সুতরাং প্রত্যেক নিহত যাত্রীর উত্তরাধিকারী আমার উল্লেখিত ক্ষতিপূরণের অতিরিক্ত ২ লাখ মার্কিন ডলার করে ক্ষতিপূরণ অবশ্যই পাবেন।
আর আহত যাত্রীরা পারসোনাল এক্সিডেন্ট বীমার শর্ত অনুযায়ী আমার লেখা ক্ষতিপূরণের অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ পারসোনাল এক্সিডেন্ট বীমার আওতায় পাবেন।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে ধন্যবাদ দিচ্ছি যাত্রীদের লায়াবিলিটি বীমা করার পাশাপাশি যাত্রীদের পারসোনাল এক্সিডেন্ট বীমা করে রাখার জন্য।
আমি আমার মতামতে লিখেছিলাম বিমানের ক্রুদের উত্তরাধিকারী প্রতিজনের জন্য ১ লাখ মার্কিন ডলার পাবেন। কিন্তু পরবর্তিতে জানতে পারি ১ লাখ মার্কিন ডলার পাবেন না। কারণ, বীমা করা ছিল ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। তাই ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পাবেন।
লেখক: তারিকুর রহমান, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। তিনি কোম্পানির অন্যান্য বিভাগ দেখার পাশাপাশি এভিয়েশন ইন্স্যুরেন্স বিভাগটিও দেখছেন। তিনি অন্যান্য বীমাসহ এভিয়েশন বীমার ওপর বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।