এশিয়ার তরুণদের ৭১% চান কাঠামোবদ্ধ আর্থিক পরিকল্পনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: এশিয়াজুড়ে তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ সিদ্ধান্ত, তাৎক্ষণিক খরচ বা স্বতঃস্ফূর্ত জীবনযাপনের বদলে তারা এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন সুপরিকল্পিত আর্থিক রুটিন, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা এবং জীবনের প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযোজিত আর্থিক সমাধানে। বহুজাতিক বীমা ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান প্রুডেনশিয়ালের সাম্প্রতিক গবেষণা এই বাস্তবতাকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
প্রুডেনশিয়ালের ‘ফিন্যান্সিয়াল মাইন্ডসেট অব ইয়াং অ্যাডাল্টস ইন এশিয়া’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, অঞ্চলের তরুণদের একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে জীবনের মূল অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছেন। জরিপে অংশ নেয়া তরুণদের ৭১ শতাংশেরও বেশি বলেছেন, তারা পরিকল্পনা ছাড়া চলতে চান না; বরং সুস্পষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক পরিকল্পনায় বিশ্বাসী এবং বীমা ও বিনিয়োগে ধারাবাহিক অভ্যাস বজায় রাখতে চান। এতে বোঝা যায়, অনিশ্চয়তার সময়ে তারা আর্থিক সিদ্ধান্তকে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে নিতে চাইছেন, যেন ঝুঁকি কমিয়ে ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা যায়।
এশিয়ার তরুণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও তাদের মানসিকতার আরেকটি দিক হলো আশাবাদ। জরিপ অনুযায়ী, ৬৩ শতাংশ তরুণ মনে করেন অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস এখন নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা। তবুও ৭০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বিশ্বাস করেন, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে তাদের ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে। অর্থাৎ, তারা বর্তমান বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা ধারণ করছেন- যা সংকট-পরবর্তী অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মবাজারের পরিবর্তনের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য এক ইতিবাচক প্রবণতা।
তবে এই আশাবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নিরাপত্তা। জরিপে অংশ নেয়া ৭৭ শতাংশ তরুণ বলছেন, তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ আর্থিক নিরাপত্তা; এটি পরিবারিক দায়িত্ব, স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ার বা শিক্ষাকেও ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে প্রায় ৬০ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, তারা বর্তমান উপভোগের তুলনায় ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি ভাবছেন। এই মনোভাব একটি বাস্তব সংকেত- তরুণরা যে ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত মনে করছেন, সেই ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছেন পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে।
অবসরের বিষয়েও তাদের চিন্তা স্পষ্ট। জরিপের তথ্য বলছে, তরুণদের ৬৪ শতাংশ বিশ্বাস করেন, অবসরে জীবনযাত্রা নির্বাহের মতো যথেষ্ট সম্পদ তারা সঞ্চয় করতে পারবেন। এটি প্রমাণ করে যে তরুণরা কেবল দৈনন্দিন ব্যয় বা বর্তমান আয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছেন না; বরং দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ গঠন এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাকেই লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন। আর্থিক পরিকল্পনার এই দৃষ্টিভঙ্গি এশিয়ার উদীয়মান মধ্যবিত্ত, দ্রুত নগরায়ণ ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
গবেষণাটি আরো বলছে, তরুণরা কঠোর সঞ্চয় নীতির মধ্যে আটকে থাকতে চান না। তাদের একটি বড় অংশ এমন সিদ্ধান্ত ও সমাধান চায়, যেখানে বিনিয়োগের বুদ্ধিমত্তা থাকবে, আবার জীবনের আনন্দ উপভোগের স্বাধীনতাও থাকবে। জরিপে ৫৩ শতাংশের বেশি বলেছেন, তারা বিনিয়োগ এবং জীবনযাপনের মধ্যে ভারসাম্য চান। পাশাপাশি ৬৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, তারা এমন আর্থিক সমাধানকে বেশি গুরুত্ব দেন যা সময়ের সঙ্গে তাদের জীবন, লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বদলাতে পারে। অর্থাৎ, তারা এক ধরনের ‘এক মাপে সবার জন্য’ পরিকল্পনা নয়- বরং ব্যক্তিকেন্দ্রিক, নমনীয় এবং বাস্তবধর্মী আর্থিক কাঠামোর দিকে ঝুঁকছেন।
এখানে প্রযুক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের উল্লেখযোগ্য অংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে আত্মবিশ্বাসী। ৬১ শতাংশ বলেছেন, তারা নিজেই গবেষণা করে আর্থিক পণ্য বাছাই করতে পারেন এবং ৫৪ শতাংশ তাদের বিনিয়োগ পোর্টফোলিও নিজে পরিচালনা করতেও সক্ষম বলে মনে করেন। তবুও ব্যক্তিগত পরামর্শের গুরুত্ব কমেনি। জীবন বা স্বাস্থ্য বীমার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এবং চলমান সহায়তার ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ তরুণ আর্থিক পরামর্শকের সঙ্গে কথা বলতে চান। বিশেষ করে জটিল কভারেজ শর্ত বোঝা ও দাবি নিষ্পত্তির মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় মানবিক সহায়তা তাদের কাছে এখনও বেশি নির্ভরযোগ্য। ফলে তরুণদের পছন্দের কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক ধরনের হাইব্রিড মডেল- যেখানে দ্রুততা, স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য থাকবে ডিজিটাল সুবিধা, আর আস্থার জন্য থাকবে মানুষের অভিজ্ঞ পরামর্শ ও সহায়তা।
প্রুডেনশিয়ালের চিফ কাস্টমার অ্যান্ড ওয়েলথ অফিসার প্রিসিলা এনজি এই পরিবর্তিত মানসিকতাকে একটি প্রজন্মগত রূপান্তর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, তরুণরা এখন আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে, তাদের অগ্রাধিকার ও প্রত্যাশা আলাদা। এই পরিবর্তনকে বুঝে প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এমন সমাধান তৈরি করা যা সহজ, প্রবেশযোগ্য এবং তরুণদের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক- যাতে তারা পরিকল্পনা করতে পারে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং প্রয়োজনে সঠিক সময়ে যথাযথ সহায়তাও পায়।
এ গবেষণা পরিচালিত হয়েছে হংকং, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান এবং থাইল্যান্ডে- এশিয়ার সাতটি বাজারে- যেখানে ৫,৩০০-এর বেশি তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নিয়েছেন। তাদের উত্তরগুলো এক সুস্পষ্ট বার্তা দেয়: অনিশ্চয়তা বেড়েছে, কিন্তু ভয় বেড়ে থেমে যাওয়ার সময় নয়। নতুন প্রজন্ম আরও সচেতন, আরও পরিকল্পনামুখী এবং আরও বাস্তববাদী- যারা নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রযুক্তি ও মানবিক সহায়তার সমন্বয়ে ভবিষ্যৎ গড়তে চায়। এই প্রবণতা শুধু তরুণদের ব্যক্তিগত অর্থনীতিকেই প্রভাবিত করবে না, বরং আগামী দিনে এশিয়ার আর্থিক সেবাখাত, বীমা শিল্প এবং বিনিয়োগ বাজারের নকশা ও কৌশলও নতুনভাবে নির্ধারণ করবে। (সংবাদ সূত্র: এশিয়া ইন্স্যুরেন্স রিভিউ)




