সানফ্লাওয়ার লাইফের অস্বাভাবিক হিসাব
নিজস্ব প্রতিবেদক: বীমা গ্রাহকদের সংখ্যা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর কাছে অস্বাভাবিক হিসাব দাখিল করেছে সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স। আইডিআরএতে দাখিল করা প্রতিষ্ঠানটির ২০১৬ সালের হিসাব বিবরণী পর্যালোচনা করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষে দাখিল করা সানফ্লাওয়ার লাইফের হিসাবে দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৭ বছরে কোম্পানিটির ১ লাখ ৬১ হাজার ১০৪টি পলিসি রিভাইভ করেছে। এরমধ্যে প্রথম ৬ বছরে তথা ২০১৫ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটি পলিসি রিভাইব করেছে ৮৭ হাজার ৯২৪টি।
কিন্তু সর্বশেষ সমাপ্ত বছরে অর্থাৎ ২০১৬ সালে মাত্র একটি বছরেই কোম্পানিটি ৭৩ হাজার ১৮০টি পলিসি রিভাইভ দেখিয়েছে। অর্থাৎ বিগত ৭ বছরে যত পলিসি রিভাইভ করেছে তার ৪৫ শতাংশ রিভাইভ করেছে ২০১৬ সালে। আর ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সলে প্রায় ৩৩ গুণ বা ৩ হাজার ২৭০ শতাংশ বেশি রিভাইভ হয়েছে। আবার ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে রিভাইব বেশি হয়েছে ২৯৮ শতাংশ।
লাইফ বীমা কোম্পানির পলিসি রিভাইব বলতে বুঝায় বন্ধ পলিসি নতুন করে পুনর্জীবিত করা। অর্থাৎ কোন পলিসি তামাদি হয়ে গেলে, তা আবার চালু করারকে পলিসি রিভাইব বলে।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৬ সালে সানফ্লাওয়ার লাইফ যে পরিমাণ নতুন বীমা পলিসি বিক্রি করেছে, রিভাইভ করেছে তার থেকেও বেশি। প্রতিষ্ঠানটির রিভাইভ করা এ পলিসির সংখ্যা ২০১১, ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে একক বছরে বিক্রি করা নতুন পলিসির সংখ্যার থেকেও বেশি।
২০১৬ সালে কোম্পানিটি নতুন পলিসি ইস্যু বা বিক্রি করেছে ৪৫ হাজার ৩৬২টি। যেখানে আগের বছরে কোম্পানিটি নতুন পলিসি ইস্যু করেছিল ৩২ হাজার ১৪টি। ২০১৬ সালে নতুন পলিসি ইস্যুতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪২ শতাংশ। এছাড়া আগের ৬ বছরে কোম্পানিটি নতুন পলিসি ইস্যু করে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৯৮টি।
সর্বশেষ বছরে সানফ্লাওয়ার লাইফ যে পরিমাণ পলিসি রিভাইভ দেখিয়েছে তাকে অস্বাভাবিক বলছেন বীমা সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, হঠাৎ করে পলিসি রিভাইভ করার পরিমাণ এতো বেশি হওয়া কিছুতেই স্বাভাবিক নয়। এর পিছনে কোম্পানির অসৎ কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। যদি কোম্পানি অসৎ উদ্দেশ্যে রিভাইভ এমন বাড়িয়ে দেখায় তাহলে প্রতিষ্ঠানটির বীমা গ্রহকদের অর্থ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ন্যাশনাল লাইফের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা জামাল মো. আবু নাসের বলেন, তামাদি পলিসি নতুন করে চালু করাই হলো পলিসি রিভাইভ। কিছুতেই নতুন পলিসি বিক্রির থেকে রিভাইভ করা পলিসির সংখ্যা বেশি হতে পারে না। যদি কোন কোম্পানি এমন তথ্য দিয়ে থাকে তবে বলতে হবে অবশ্যই এ হিসাব অস্বাভাবিক।
এদিকে আইডিআরএ'তে দাখিল করা সানফ্লাওয়ার লাইফের হিসাব অনুসারে, ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ভ্যালুড পলিসির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭৪ হাজার ১২৮টি। ওই বছর অর্থাৎ ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৭ বছরে কোম্পানিটির নতুন পলিসি ইস্যু হয় ৩ লাখ ৬১ হাজার ৪৬০টি এবং পলিসি রিভাইভ করে ১ লাখ ৬১ হাজার ১০৪টি। সে হিসাবে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরে কোম্পানিটির সর্বমোট পলিসির সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ লাখ ৯৬ হাজার ৬৯২টি।
একই সময়ে মেয়াদোত্তীর্ণ, সমর্পন, তামাদি এবং মৃত্যু দাবি পরিশোধ করা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৬৮৭টি পলিসি। এরমধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪৬১টি, সমর্পন করা হয়েছে ৩ হাজার ২৫৩টি, তামাদি হয়েছে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৭৯৮টি এবং মৃত্যু দাবি পরিশোধ করা হয়েছে ৪ হাজার ১৭৯টি পলিসি।
অর্থাৎ নতুন ও রিভাইভ পলিসিসহ মোট পলিসি থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ, সমর্পন, তামাদি এবং মৃত্যু দাবি পরিশোধিত পলিসি বাদ দিলে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরে কোম্পানিটির সর্বমোট ভ্যালুড পলিসির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ ৭ হাজার ৫টি।
কিন্তু ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই ৭ বছরে কোম্পানিটি নতুন পলিসি ইস্যু করে ৩ লাখ ৬১ হাজার ৪৬০টি। এরমধ্যে ২০১০ এ ১ লাখ ২ হাজার ১৯৯টি, ২০১১ তে ৬৬ হাজার ৩৭৬টি, ২০১২ তে ৪২ হাজার ৮৯৭টি, ২০১৩ তে ৩৩ হাজার ৬৫৫টি, ২০১৪ তে ৩৮ হাজার ৯৫৭টি, ২০১৫ তে ৩২ হাজার ১৪টি এবং ২০১৬ সালে ৪৫ হাজার ৩৬২টি নতুন পলিসি ইস্যু করে।
একই সময়ে পলিসি রিভাইভ করে ১ লাখ ৬১ হাজার ১০৪টি। এরমধ্যে ২০১০ এ ১৮ হাজার ৩৬৭টি, ২০১১ তে ৯ হাজার ৮৮৩টি, ২০১২ তে ১০ হাজার ২৮০টি, ২০১৩ তে ৩৫ হাজার ২০২টি, ২০১৪ তে ১২ হাজার ২১টি, ২০১৫ তে ২ হাজার ১৭১টি এবং ২০১৬ সালে ৭৩ হাজার ১৮০টি পলিসি রিভাইভ হয়।
অন্যদিকে ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই ৭ বছরে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪৬১টি পলিসি। এরমধ্যে ২০১০ এ ৫ হাজার ৭৮৪টি, ২০১১ তে ২১ হাজার ৮০৮টি, ২০১২ তে ১৫ হাজার ২টি, ২০১৩ তে ১১ হাজার ৪০৯টি, ২০১৪ তে ২১ হাজার ৭৬৩টি, ২০১৫ তে ১৯ হাজার ৩১৮টি এবং ২০১৬ সালে ১৭ হাজার ৩৭৭টি পলিসি মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়।
একই সময়ে পলিসি সমর্পন করা হয়েছে ৩ হাজার ২৫৩টি পলিসি। এরমধ্যে ২০১০ এ ৫০৯টি, ২০১১ তে ৮৪৭টি, ২০১২ তে ৩৫১টি, ২০১৩ তে ৪৮৫টি, ২০১৪ তে ৩৮৮টি, ২০১৫ তে ৪৫৬টি এবং ২০১৬ সালে ২১৭টি পলিসি সমর্পন করা হয়।
৭ বছরে মৃত্যু দাবি পরিশোধ করা হয় ৪ হাজার ১৭৯টি। এরমধ্যে ২০১০ এ ৭৪৩টি, ২০১১ তে ১ হাজার ১৫৬টি, ২০১২ তে ৬০১টি, ২০১৩ তে ৪৪০টি, ২০১৪ তে ৪৪৮টি, ২০১৫ তে ৩৭৯টি এবং ২০১৬ সালে ২১৭টি মৃত্যু দাবি পরিশোধ করা হয়।
একই সময়ে পলিসি তামাদি হয় ২ লাখ ৬৯ হাজার ৭৯৮টি। এরমধ্যে ২০১০ এ ১৮ হাজার ৫৩৬টি, ২০১১ তে ৫১ হাজার ৪১৯টি, ২০১২ তে ৫৫ হাজার ৭৮৬টি, ২০১৩ তে ২০ হাজার ২৩৮টি, ২০১৪ তে ৪০ হাজার ১৪৬টি, ২০১৫ তে ৫০ হাজার ৩৪২টি এবং ২০১৬ সালে ৩৩ হাজার ৩২৭টি পলিসি তামাদি হয়।
এদিকে তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শেষ ৭ বছরে সানফ্লাওয়ার লাইফ ব্যবস্থাপনা ব্যয় খাতে সীমা লঙ্ঘন করে ১০৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা অবৈধভাবে খরচ করেছে। এরমধ্যে শেষ বছরে অর্থাৎ ২০১৬ সালেই অবৈধভাবে ব্যয় করা হয়েছে ১৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। তার আগের বছর ২০১৫ সালে অবৈধভাবে ব্যয় করা হয় ১৯ কোটি ৬ লাখ টাকা। ২০১৪ সালে এ অবৈধ ব্যযের পরিমাণ ছিল ১৭ কোটি ২ লাখ টাকা।
এছাড়া ২০১৩ সালে ১৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, ২০১২ সালে ২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা, ২০১১ সালে ১২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা এবং ২০১০ সালে ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা অবৈধভাবে খরচ করা হয়। অর্থাৎ প্রতিবছরই প্রতিষ্ঠানটি ব্যবস্থাপনা খাতে মোটা অঙ্কের টাকা অবৈধভাবে খরচ করছে।
ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের খাতে কোম্পানিটি অবৈধভাবে যে অর্থ ব্যয় করেছে তার ৯০ শতাংশ বীমা গ্রাহকরা (পলিসিহোল্ডার) এবং বাকি ১০ শতাংশ শেয়ার গ্রাহকদের (শেয়ারহোল্ডার) প্রাপ্য। ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের খাতে অতিরিক্ত খরচ করা না হলে এই টাকা পলিসিহোল্ডার ও শেয়ারহোল্ডাররা বোনাস হিসেবে পেতেন।
প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে সানফ্লাওয়ার লাইফের বিনিয়োগ ছিল ১০২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৯০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আর ২০১৬ সাল শেষে বিনিয়োগ রয়েছে ৯১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
এসব অনিয়মের বিষয়ে সানফ্লাওয়ার লাইফের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামছুল আলমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এরপর কোম্পানিটির সচিব এ এইচ এম শামিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে কোম্পানির জিএম খালেদ হাবিবের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
এরপর খালেদ হাবিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আইডিআরএ’র কাছে আমরা পলিসি রিভাইভ’র যে তথ্য দিয়েছি তা সঠিক। এখানে কোন মিথ্য তথ্য দেয়া হয়নি। হঠাৎ করে এতো বেশি পলিসি রিভাইভ হওয়ার কারণ কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, পলিসি রিভাইভ’র সংখ্যা যেমন বেড়ে, তেমনি আমদের নবায়ন প্রিমিয়াম আদায়ও বেড়েছে। আর নতুন পলিসি বিক্রির সংখ্যার থেকে রিভাইভ করা পলিসির সংখ্যা বেশি হতে পারে না এমন কথা সঠিক না।