প্রগ্রেসিভ লাইফে আর্থিক অনিয়ম ১১৪ কোটি, জমি ক্রয় করে আত্মসাৎ ২০ কোটি
 2.jpg)
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর আফতাব নগরে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স ১০ কাঠা জমি কেনে। কাঠাপ্রতি দাম পড়ে ৫৫ লাখ টাকা। এই জমি কোম্পানিটি কেনে ২০১৪ সালে। আর ২০২১ সালে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স যখন এই জমি বিক্রি করতে চায় তখন দাম ধরা হয় প্রতি কাঠা ৬৫ লাখ টাকা।
অথচ এই আফতাব নগরেই ২০১১ সালে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড জমি কেনে প্রতি কাঠা ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ২০.৬২ কাঠা জমি প্রগ্রেসিভ লাইফ কেনে ২৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকায়।
এই হিসাবে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের চেয়ে প্রগ্রেসিভ লাইফের জমির মূল্য বেশি পড়ে প্রতি কাঠা ৬৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ জমির মূল্য বেশি দেয়া হয় মোট ১৪ কোটি ২২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।
শুধু আফতাব নগরেই নয়, ২০১০ সালে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকায় বিতর্কিত ৯ হাজার ৫শ’ বর্গফুট ফ্লোর স্পেস প্রায় ৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা দিয়ে কিনে কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে পরিচালকদের বিরুদ্ধে।
২০১৪ সালে কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট অডিটে ১১৪ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। যার মধ্যে রয়েছে বেশি মূল্যে জমি কিনে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণও। এর প্রেক্ষিতে দুর্নীতি ও অনিয়ম করে লাইফ ফান্ডের (গ্রাহক তহবিল) ১১৪ কোটি টাকা আত্মসাতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুদকে অভিযোগ করে কোম্পানি।
দুদকের এই অভিযোগ করা হয় ২০১৪ সালে। তখন কোম্পানির চেয়ারম্যান ছিলেন বজলুর রশিদ। আবার ২০১৫ সালে আব্দুল মালিক যখন চেয়ারম্যান হন তখন তিনি অভিযুক্তদের অব্যাহতি দিতে দুদককে অনুরোধ করে চিঠি দেন।
পরবর্তীতে দুদক আইন সংশোধন হওয়ায় প্রগ্রেসিভ লাইফের দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে লাইফ ফান্ডের ১১৪ কোটি টাকা আত্মসাতের এ তদন্ত দুদক কমিশনের এখতিয়ার বহির্ভুত হওয়ায় তদন্ত পরিসমাপ্ত করে। একই সাথে এই তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ'কে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করে দুদক।
দুদকের চিঠির প্রেক্ষিতে তদন্ত করে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে লাইফ ফান্ডের (গ্রাহক তহবিল) অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পায় আইডিআরএ। কিন্তু বীমা আইন ২০১০ অনুসারে অর্থ আত্মসাতে জড়িত ব্যক্তিদের অপসারণ করা ও আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধারে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে মামলা করার বিধান থাকলেও সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বীমা খাত নিয়ন্ত্রক এ সংস্থাটি। উল্টো সংস্থাটি কোম্পানিকেই নির্দেশ দেয় আত্মসাতে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করার। যখন পরিচালনা পর্ষদে থেকে কোম্পানির সকল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন লাইফ ফান্ডের অর্থ আত্মসাতে দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাই।
শুধু আইডিআরএ বা দুদকই নয় প্রগ্রেসিভ লাইফ জমি ক্রয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের তদন্তে নামে বিএসইসি। সংস্থাটি তদন্ত কমিটিও গঠন করে। সেই তদন্তে কোন অগ্রগতি হয়নি।
ফলে পরিচালকদের দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে লাইফ ফান্ড থেকে তছরুপ হওয়া ১১৪ কোটি টাকার একটি টাকাও উদ্ধার হয়নি। গ্রাহক তহবিল সংকটের কারণে পাওনা টাকা না পেয়ে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা। অপর দিকে কোম্পানি পরিচালনা করছেন লাইফ ফান্ডের অর্থ আত্মসাতে জড়িত ব্যক্তিরাই।
প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের লাইফ ফান্ড থেকে (গ্রাহক তহবিল) থেকে ১১৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ, নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে ১৩ বছরে গ্রাহক তহবিলের একটি টাকাও উদ্ধার না হওয়া নিয়েই ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডির এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
গত ১০ বছর ধরে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডির অনুসন্ধানী দলের সংগ্রহ করা প্রগ্রেসিভ লাইফের নিরিক্ষা প্রতিবেদন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত চিঠি পত্রে উল্লেখিত তথ্য যাচাই বাছাই ও পর্যালোচনা করে সাজানো হয়েছে এই প্রতিবেদন।
অনুমোদনের আগেই জমির মূল্য পরিশোধ
রাজধানীর আফতাব নগরের জমি কেনার অনুমোদন দেয়া হয় প্রগ্রেসিভ লাইফের ৯১ তম বোর্ড সভায়। এই সভা অনুষ্ঠিত ২০১১ সালে ১২ জুলাই। সভাটি শুরু বিকাল সাড়ে ৫ টায়। তবে জমির মূল্য ৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয় সভা শুরুর আগেই। আগের দিন ১১ জুলাই ম্যানেজমেন্ট কমিটি-১ এর মিটিংয়ে জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর এই দিনই ইষ্টার্ণ হাউজিং প্রগ্রেসিভ লাইফকে জমি বিক্রির প্রস্তাব করেন।
আফতাব নগরে জমি কেনার সিদ্ধান্ত: শ্যালক প্রস্তাব করেন, সিদ্ধান্ত নেন দুলাভাই
ইস্টার্ণ হাউজিং প্রগ্রেসিভ লাইফের কাছে জমি বিক্রির প্রস্তাব করেন ২০১১ সালের ১১ জুলাই। ইস্টার্ণ হাইজিংয়ের পক্ষে এই প্রস্তাব করে নাজিম নওয়াজ চৌধুরী। ওই দিনই প্রগ্রেসিভ লাইফের সাবজেক্ট কমিটি-১ জমি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেন। সাবজেক্ট কমিটির ওই সভায় ছিলেন জমি বিক্রির প্রস্তাবকারির ছোট ভাই নাজিম তাজিক চৌধুরী ও তার দুলাভাই নাসির আলি শাহ। এছাড়া পরিচালক এম এ মলিক ওরফে আব্দুল মালিক এবং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম, এ করিম।

আফতাব নগরের জমি কেনার অনুমোদন ৯১ তম সভায়: শ্যালক-দুলাভাই ছাড়া আরো যারা ছিলেন
২০১১ সালে ১১ জুলাই অনুষ্ঠিত সাবজেক্ট কমিটি-১ জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর পরের দিনই ১২ জুলাই অনুষ্ঠিত ৯১ তম বোর্ড সভায় সাবজেক্ট কমিটির সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। ওই পরিচালক মহমুদর রশিদের সভাপত্বি অনুষ্ঠিত ওই সভায় ছিলেন- পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান প্রদীপ সেন, পরিচালক কামাল মিয়া প্রতিনিধি হিসেব উপস্থিত ছিলেন এ এস এ মুয়ীজ, নাসির আলি শাহ, গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কোম্পানির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির এ চৌধুরী। নাজিম তাজিক চৌধুরী, নাহিদ চৌধুরী, নিরপেক্ষ পরিচালক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রথিন্দ্র কুমার চৌধুরী ও কোম্পানির তৎকালিন মুখ্য নির্বাহী এম এ করিম।
রাজস্ব ফাঁকি দিতে জমির মূল্য কমানো হয় দলিলে
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের আফতাবনগর প্রকল্প থেকে প্রগ্রেসিভ লাইফ ২০.৬২ কাঠার তিনটি প্লট (নং এল-৪২, ৪৪ ও এম-৩৯) মোট ২৫ কোটি ৬২ লাখ ৯০ হাজার টাকায়। এই টাকা পরিশোধ করা হয় প্রাইম ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে। ইস্টার্ণ হাউজিংকে মোট পরিশোধ করা হয় ২৬ কোটি ৫৬ লাখ ২৯ হাজার ৭৪ টাকা। যার মধ্যে ১৮ লাখ ৪২ হাজার ৯শ’ টাকা অন্যান্য চার্জ।
তবে ২০১৭ সালের ১৮ জুন বাড্ডা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে নিবন্ধিত দুটি প্লটের দলিলে মোট মূল্য দেখানো হয় মোট ৭২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৫ কাঠা জমির সাব কবলা দলিল নং- ৬২২১/১৭, মূল্য ২৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং ৮.৫৪ কাঠা জমির সাব কবলা দলিল নং- ৬২২২/১৭, মূল্য ৪৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়।
জমির মূল্য পরিশোধ করেও ৭ কাঠার মালিকানা পায় নাই
২০.৬২ কাঠার পুরো মূল্যই পরিশোধ করে প্রগ্রেসিভ লাইফ। এই মূল্য পরিশোধ করা হয় ২০১১ সালেই। তবে এখানো ৭.০৮ কাঠার মালিকানা পায় নাই প্রগ্রেসিভ লাইফ।
ম্যানেজমেন্ট অডিট: আর্থিক অনিয়ম করে গ্রাহক তহবিল থেকে আত্মসাৎ ১১৪ কোটি
প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ তাদের ১২০ তম বোর্ড সভায় ম্যানেজমেন্ট অডিট করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সভা হয় ২০১৪ সালের ২৩ জানুয়ারি। অডিটর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় নিরিক্ষা প্রতিষ্ঠান হুদাভাসি এ্যান্ড কোং কে। ম্যানেজমেন্ট অডিটের সময় নির্ধারণ করা হয় ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত।
হুদাভাসি অডিট করে ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সাল ৪ বছরে দুর্নীতি ও অনিয়ম করে ১১৪ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদন দাখিল করে। এই আত্মসাতের জন্য চেয়ারম্যান, পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উর্ধতন কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয় ওই প্রতিবেদনে। হুদাভাসি এই প্রতিবেদন দাখিল করে ২০১৪ সালের ১৫ জুলাই।
হুদাভাসির ম্যানেজমেন্ট অডিট: আফতাব নগরে জমি ক্রয়ে আত্মসাৎ ১৬ কোটি ৭০ লাখ
হুদাভাসির ম্যানেজমেন্ট অডিট রিপোর্টে বলা হয়, প্রগ্রেসিভ লাইফ রাজধানীর আফতাব নগরে ২০১১ সালে ৩টি প্লট ক্রয় করে। যার প্রকৃত মূল্য ৮ কোটি ৯২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অথচ কোম্পানি জমি ক্রয় করে ২৫ কোটি ৬২ লাখ ৯০ হাজার টাকায়। কোম্পানি জমির মূল্য বেশি পরিশোধ করে ১৬ কোটি ৭০ ৪০ হাজার টাকা।
আফতাব নগরে বেশি দামে জমি কিনে ১৬ কোটি ৭০ লাখ ৪০ হাজার টাকা আত্মাসতের জন্য কোম্পানির চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদকে দায়ি করা হয়।
চট্রগ্রামে বিতর্কিত জমি কিনে লোকসান ৩ কোটি
হুদাভাসির অডিট রিপোর্টের তথ্য অনুসারে, চট্টগ্রামে আগ্রাবাদ জহুরা টাওয়ারে ৯ হাজার ৫০০ স্কয়ার ফিট ফ্লোর স্পেস কেনে প্রগ্রেসিভ লাইফ ।
২০১১ সালে এই ফ্লোর কেনা হয় ২ কোটি ৯২ লাখ টাকায় । তবে মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকায় এই ফ্লোর স্পেস দখলে নিতে না পারার কারণে মামলা ও অন্যান্য খরচ বাবদ কোম্পানির তহবিল থেকে লোকসান হয় ৩ কোটি ৪৭ লাখ।
দুর্নীতি জালিয়াতি ও অনিয়ম করে ৯ খাতে আত্মসাৎ ৯৪ কোটি টাকা
হুদাভাসির রিপোর্ট অনুসারে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সালে দুর্নীতি জালিয়াতি ও অনিয়ম করে আরো ৯টি খাতে আত্মসাৎ করা হয়েছে ৯৪ কোটি টাকা। এই আর্থিক অনিয়মের মধ্যে রয়েছে- প্রিমিয়াম আয়ের ভুয়া হিসাব দেখিয়ে কমিশন ও অন্যান্য ব্যয় বাবদ আত্মসাৎ ৫৪ কোটি ৪৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা, গ্রাহকের কাছ থেখে প্রিমিয়াম নিয়ে তা তহবিলে জমা না করে আত্মসাৎ ৩০ কোটি ১৯ লাখ ৫৩ হাজার, বকেয়া প্রিমিয়াম, হস্তমজুদ ও প্যাটিক্ক্যাশে অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ ৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা, একই প্রিমিয়াম রশিদ দিয়ে ২ বার প্রিমিয়াম জমা নিয়ে আত্মসাৎ ৪০ লাখ ৮৯ হাজার টাকা, অনুমোদিত বেতনভাতার বাইরে আর্থিক সুবিধা নিয়ে এম এ করিমের আত্মসাৎ ৩৮ লাখ ১৪ হাজার, অবৈধভাবে গ্রাচুইটি বাবদ এম এম করিমের আত্মসাৎ ৪৩ লাখ ৭৫ হাজার, প্রিমিয়াম আয়ের লক্ষমাত্রা অর্জন না করেই বেতন বাবদ অর্থ নিয়ে আত্মসাৎ ১ লাখ ১১ হাজার, বিভিন্ন সার্ভিস সেল থেকে একখাতেই দুইবার কমিশন নিয়ে আত্মসাৎ ৭৯ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।
অর্থ উদ্ধারে মামলার পরিবর্তে জড়িত অনেককে বাদ দিয়ে দুদকে অভিযোগ
লাইফ ফান্ডের টাকা আত্মসাৎ হলে আত্মসাৎকৃত টাকা উদ্ধার ও আত্মসাতে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে মামলা করার বিধান রাখা হয়েছে উচ্চ আদালতে। এই বিধান রাখা হয়েছে বীমা আইন ২০১০ এর ১৩৫ ও ১৩৬ ধারায়। এই ধারা উচ্চ আদলতে মামলা করবেন কোম্পানির একজন সদস্য বা বীমা আইন ২০১০ এর ৯৫ ধারা অনুসারে নিয়োগকৃত প্রশাসক।
অথচ আফতাব নগরে বেশি দামে জমি কিনে অর্থ আত্মসাৎসহ ১১৪ কোটি টাকা আত্মসাতের জন্য দুদকে অভিযোগ করে কোম্পানি। কোম্পানি থেকে ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়ে এই অভিযোগ করেন তৎকালীন ম্যানেজার (লিগ্যাল) এম শাহীন আহম্মেদ। এই অভিযোগ করা হয় ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর
অভিযোগপত্রে আফতাব নগরে বেশি দামে জমি ক্রয় করে অর্থ আত্মসাতের জন্য দায়ি করা হয় প্রগ্রেসিভ লাইফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ করিম, সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (অর্থ ও হিসাব) এনায়েত আলী খান, সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (সুজন বীমা) মো. মনিরুজ্জামান খান এবং সিনিয়র ম্যানেজার (ইসলামী বীমা) মো. রফিকুজ্জামানকে।
অথচ হাদাভাসির ২০১৪ সালের ১২ জুলাইয়ের দাখিল করা ম্যানেজম্যান্ট অডিট রিপোর্টে অর্থ আত্মসাতের দায়ি করা হয় জমি ক্রয়ের সাথে জড়িত সকল ব্যক্তিকে। অপর দিকে ২০১৭ সালের ২৬ সেপ্টেমবরে উচ্চ আদালতে দাখিল করা ম্যানেজমেন্ট অডিট রিপোর্টে জমি ক্রয় করে অর্থ আত্মসাতের জন্য দায়ী করা হয় চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদকে।
অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিতে দুদককে আব্দুল মালিকের অনুরোধ
প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুসারেই দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করেন তৎকালীন ম্যানেজার (লিগ্যাল) এম শাহীন আহম্মেদ। এ অভিযোগ তিনি করেন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ থেকে ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়ে। শাহিন আহমেদের ক্ষমতা অর্পণ পত্রে স্বাক্ষর করেন তকালিন কোম্পানি সচিব এম নুরল আমিন।
শাহিন আহমেদ দুদকে অভিযোগ করেন ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর। এরপরেই ২০১৫ সালে প্রগ্রেসিভ লাইফের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আব্দুল মালিক। তিনি লন্ডন প্রবাসী উদ্যোক্তা। আব্দুল মালিক দুদক চেয়াম্যানকে চিঠি দিয়ে অভিযুক্ত সকলকে অব্যাহতি দিতে অনুরোধ করেন।
মহাপরিচালক (অনুঃ তদন্ত) কে একটি চিঠিতে আব্দুল মালিকের এই অনুরোধের কথা জানান দুদকের পরিচালক নাসিম আনোয়ার। পরিচালক নাসিম আনোয়ার মহাপরিচালককে (অনুঃ তদন্ত) এই চিঠি দেন ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর (স্মারক নং-দুদক/বিকা/ঢাকা/২৩-২০১৪/ অনুঃ/ ঢাকা-১/৩৫১১/১(৪) ।
আব্দুল মালিক দুদক চেয়ারম্যানকে চিঠিতে জানান, কোম্পানির ১২৮ তম সভায় চেয়ারম্যান বজলুর রশিদকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। সেই সাথে কোম্পানি সেক্রেটারি নুরল আমিনকেও চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। হদাভাসির ম্যানজমেন্ট রিপোর্ট এক পেশে। হুদাভাসির রিপোর্ট পর্যালোচনার জন্য নিরিক্ষা প্রতিষ্ঠান জি কিবরিয়াকে নিরিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিরিক্ষা প্রতিবেদন আপত্তি বা অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ওই চিঠিতে আব্দুল মালিক অভিযুক্ত সকলকে অব্যাহতি দিতে অনুরোধ করেন।
আব্দুল মালিকের এমন দাবির পরও উচ্চ আদালতে হুদাভাসি রিপোর্টকেই বৈধতা দিয়ে আত্মসাতে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দেয়। আবার হুদাভাসির ম্যানেজমেন্ট রিপোর্ট অনুসারেই আত্মসাতে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ।
২১ বার চিঠি দিয়েও তথ্য পায়নি দুদক
প্রগ্রেসিভ লাইফ দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করে ২০১৪ সালের ১৬ অক্টোবর। এই অভিযোগের ভিত্তিকে দুদকের অভিযোগ যাচাই-বাছাই কমিটি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ৩০ অক্টোব ২০১৪। দুদকের এই তদন্ত কমিটিতে ছিলেন- সহকারি পরিচালক মো. ফজজুল হক, সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১, মানসী বিশ্বাস, উপসহকারি পরিচালক, দুদক, সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১, মো. নুর আলম উপসহকারি পরিচালক দুদক, সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১।

তদন্ত কমিটি তথ্য চেয়ে প্রগ্রেসিভ লাইফকে ২১টি চিঠি দেয়। কিন্তু প্রগ্রেসিভ লাইফ কোনো তথ্য দেয়নি।
২১ টি চিঠি দেয়ার এই তথ্য তুলে ধরা হয়, ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর মহাপরিচালক (অনুঃ তদন্ত) কে পাঠানো একটি চিঠিতে (স্মারক নং-দুদক/বিকা/ঢাকা/২৩-২০১৪/ অনুঃ/ ঢাকা-১/৩৫১১/১(৪) । মহাপরিচালক (অনুঃ তদন্ত) কে এই চিঠি পাঠান পরিচালক নাসিম আনোয়ার।
আড়াই বছর পর দুদকের তদন্ত স্থগিত
দুদকের তদন্ত দল তথ্য চেয়ে প্রগ্রেসিভ লাইফকে চিঠি দেয় ২১টি। কিন্তু প্রগ্রেসিভ লাইফ দুদককে কোনো তথ্য দেয়নি। এসব চিঠি দেয়া হয় ১০১৫ সালের ১৯ জানুয়ারি থেকে ১৭ নভেম্বরের মধ্যে। এই ২০১৫ সালেই প্রগ্রেসিভ লাইফের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আব্দুল মালিক। আব্দুল মালিক চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর অভিযোগ থেকে সকলকে অব্যাহতি দেয়ার অনুরোধ করে দুদক চেয়ারম্যনকে চিঠি দেন তিনি।
পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ১৮ মে প্রগ্রেসিভ লাইফের অর্থ আত্মসাতের তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষেকে (আইডিআরএ) পৃথক পৃথক ৪টি চিঠি দেয় দুদক। এসব চিঠিতে স্বাক্ষর করেন দুদকের উপ-পরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত–১) বেনজীর আহম্মদ।

চিঠিতে বলা হয়, কমিশন আইন সংশোধনের ফলে আইন বহির্ভূত হওয়ায় অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিসোপ্ত করা হয়েছে। একই সাথে অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বরাবর চিঠি প্রেরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
দুদকে যেসব আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে আইডিআরএকে চিঠি দেয় তার মধ্যে রয়েছে- আফতাবনগরে প্লট ক্রয়ে ১৬ কোটি ৭০ লাখ ৪০ হাজার টাকা, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে ফ্লোর স্পেস ক্রয়ে ৩ কোটি ৩৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে ৪১ লাখ ৩৪ হাজার ৭২৫ টাকা এবং গাড়ি ক্রয়ে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা আত্মসাৎ।
দুদকের চিঠির ৮ মাস পর আইডিআরএ;র তদন্ত
প্রগ্রেসিভ লাইফের আর্থিক অনিয়েমের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে দুদক থেকে চিঠি পাঠানোর ৮ মাস পরে তদন্ত কমিটি গঠন করে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইডিআরএ। দুদকের চিঠি পাঠায় ২০১৭ সালের ১৮ মে আর আইডিআরএ তদন্ত কমিটি গঠন করে ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি। আইডিআরএর পরিচালক (উপ সচিব) মো. শাহ আলমকে আহবায়ক করে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য ২ সদস্যের মধ্যে ছিলেন- ঊর্ধ্বতন নির্বাহী কর্মকর্তা মোরশেদ মুসলিম ও জুনিয়র অফিসার তানজিরুল ইসলাম।
তদন্ত কমিটি ২০১৮ সালের ১৮ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করে।
আইডিআরএ ওই তদন্তে ৩৮ ধরনের অনিয়মের তথ্য ওঠে আসে। যার মধ্যে- হুদাভাসির ম্যানেজমেন্ট অডিটে বেশি দামে জমি ক্রয় করে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণও পায় আইডিআরএ’র তদন্ত দল। আইডিআরএ তদন্ত দল সংস্থাটির চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে ২০১৮ সালে ২০ মে।
তদন্তের ১ বছর পর আইডিআরএ’র শুনানি:
আইডিআরএ’র তদন্ত দল চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে ২০ মে ২০১৮ সালে। তবে শুনানি করা হয় ২০১৯ সালের ১৭ জুন, অর্থাৎ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের এক বছর পর। আইডিআরএ’র ওই শুনানি সভায় সভাপত্বি করেন আইডিআএ’র সদস্য আইন বোরহান উদ্দিন। অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন, সদস্য গকুল চাদ দাস, পরিচালক শাহ আলম ও ঊর্ধ্বতন নির্বাহী কর্মকর্তা মোরশেদ মুসলিম।
প্রগ্রেসিভ লাইফ থেকে শুনানিতে অংশ নেয় মুখ্য নির্বাহী দ্বিপের কুমার সাহা রায় এফসিএ, বিপুল চন্দ্র নাথ, মো. জহির উদ্দিন।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, হুদাভাসির ম্যানেজমেন্ট রিপোর্ট অনুসারে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বীমা কোম্পানি আদালতে মামলা করে তার তালিকা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র কাছে প্রেরণ করবে।
তবে বীমা আইন ২০১০ এর ৫০ ধারায় গ্রাহক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করার দায়ে দোষীদের কোম্পানি থেকে অপসারণ করার বিধান থাকলেও সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আইডিআরএ।
আবার আত্মসাকৃত অর্থ উদ্ধারে বীমা আইনের ৯৫ ধারায় প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার বিধান ও ১৩৬ ধারায় আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধারে প্রসাশককে মামলা করার ক্ষমতা দেয়া হলে সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আইডিআরএ।
আত্মসাতে জড়িতদেরকেই মামলা করার নির্দেশ দিল আইডিআরএ
অর্থ আত্মসাৎকারিদের বিরুদ্ধে মামলা করা নির্দেশ দিয়ে ২ দফায় প্রগ্রেসিভ লাইফকে চিঠি দেয় আইডিআরএ। এর মধ্যে প্রথম চিঠি দেয়া ২০১৯ সালের ১৮ আগষ্ট ও ২০২২ সালের ২৩ মার্চ। এ দুটি চিঠিতেই উল্লেখ করা হয়, “গত ১৭ জুন অনুষ্ঠিত শুনানী সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক মেসার্স হুদাভাসি চৌধুরী এ্যান্ড কোং চার্টার্ড একাউন্টস কর্তৃক আপনার কোম্পানির উপর পরিচালিত নিরিক্ষা এবং তৎপরবর্তী দাখিলকৃত প্রতিবেদন মোতাবেক নির্দিষ্ট অভিযোগের বিপরীতে দায়ি ব্যক্তিদের বিুরদ্ধে মামলা করে সেটার তালিকা কর্তৃপক্ষে প্রেরণ করার জন্য নির্দেশ ক্রমে অনুরোধ করা হলো।”

২০২২ সালের ২৩ মার্চ আরেকটি চিঠিতে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের তাগিদ দেয় বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। ওই সময় বীমা কোম্পানিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন অর্থ আত্মসাতে অভিযুক্ত নাসির আলী শাহ; আর এম এ করিম ছিলেন পরিচালক।
আইন বলছে মামলা হবে উচ্চ আদালতে, কিন্তু সেই মামলা করা হলো নিম্ন আদালতে
বীমা আইনের লাইফ ফান্ডের অর্থ আত্মসাৎ হলে তা উদ্ধারের জন্য উচ্চ আদালতে মামলার বিধান রাখা হয়েছে। এই মামলা বাদি হবেন কোম্পানির একজন সদস্য। অথচ প্রগ্রেসিভ লাইফ মামলা করে থানায় ও নিম্ন আদালতে।
এর মধ্যে- ঢাকার সিএমএম আদালতে ২০২৫ সালে আফতাব নগরে বেশি দামে জমি ক্রয় করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সিআর মামলা নং- ৭৮৪/২০২৫ দায়ের করে।
অপর একটি মামলা করা হয় পল্টন মডেল থানার মামলা নং- ৪৩(৮)২২, দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০/৪০৮/১০৯/৩৪ ধারায় এই মামলা দাযের করা হয়।
এছাড়া আইডিআরএ নির্দেশনার আগেই ৩০ কোটি ১৯ লাখ ৫৩ হাজার টাকা আত্মসাতের দায়ে ঢাকার সিএমএম আদালতে ২০১৮ সালে মামলা দায়ের করে প্রগ্রেসিভ লাইফ। সিআর মামলা নং- ১৪৫৮/২০১৮।
আইডিআরএ নির্দেশনা সত্বেও মামলা থেকে যাদের নাম বাদ দেয়া হলো
আইডিআরএ নির্দেশনা দেয় হুদাভাসী চৌধুরী অ্যান্ড কোং এর ম্যানেজমেন্ট অডিট প্রতিবেদন অনুসারে নির্দিষ্ট অভিযোগের বিপরীতে দায়ি ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করার। অথচ আফতাব নগরে বেশি দামে জমি ক্রয় করে ১৬ কোটি ৭০ লাখ ৪০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা (সিআর মামলা নং- ৭৮৪/২০২৫) মামলায় আসামি করা হয় কোম্পানির তৎকালিন সাবেজেক্ট কমিটি-১’র সদস্য এবং পরিচালক ও সাবেক চেয়ারম্যান এম এ মালিক, স্পন্সর পরিচালক নাসির আলী শাহ, শেয়ারহোল্ডার পরিচালক নাজিম তাজিক চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ করিম, হেড অব অডিট মো. মনিরুজ্জামান।

হুদাভাসির রিপোর্ট অনুসারে, এই মামলায় আসামী থেকে ৫ জন পরিচালকের নাম বাদ দেয়া হয়। তারা হলেন- তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান প্রদীপ সেন, পরিচালক কামাল মিয়া প্রতিনিধি এ এস এ মুয়ীজ, গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের প্রতিনিধি কোম্পানির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির এ চৌধুরী, পরিচালক নাহিদ চৌধুরী ও নিরপেক্ষ পরিচালক রথিন্দ্র কুমার চৌধুরী।
সিআইডি’র তদন্ত অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ: অভিযুক্ত হলেন যারা

আফতাব নগরে বেশি মূল্যে জমি ক্রয় করে অর্থ আত্মসাতের দায়ে পল্টন মডেল থানায় দায়েরকৃত সিআর মামলা নং–৭৮৪/২০২৫-এর তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ঢাকা। ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর ঢাকার ৫ নম্বর (পল্টন) সিএমএম ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রতিবেদনটি দাখিল করা হয়। এর আগে ১৫ মে আদালত মামলাটির তদন্তভার সিআইডি’র ওপর ন্যস্ত করেন।
সিআইডি’র তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে বলে মত দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আরজিতে বর্ণিত বিবাদী নাসির আলী শাহ, নাজিম তাজিক চৌধুরী ও এম এ করিম কোম্পানির ক্রয় কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কোম্পানির স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হন।
তারা প্লট বা জমির মালিকানা যথাযথভাবে যাচাই না করে এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ ছাড়াই ত্রুটিপূর্ণ ও প্রতারণামূলক ক্রয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের সঙ্গে যোগসাজশে তৎকালীন বাজারমূল্যের তুলনায় অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে মোট ১৬ কোটি ৭০ লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধের নামে আত্মসাৎ করেন।
যা বলছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ
এ বিষয়ে আইডিআরএ’র পরামর্শক (মিডিয়া এবং যোগাযোগ) ও মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, কর্তৃপক্ষ মনে করে- বীমা আইন ২০১০ এর সীমাবদ্ধতার কারণে এ ধরণের অনিয়ম-দুর্নীতির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। তাই বীমা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে আইডিআরএ’র আইনগত সক্ষমতা আরো বাড়বে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যাবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
অর্থ আত্মসাৎ নিয়ে যা বললেন প্রগ্রেসিভ লাইফের বর্তমান চেয়ারম্যান বজলুর রশিদ
বেশি দামে জমি ক্রয় করে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের তহবিল থেকে ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে কোম্পানিটির বর্তমান চেয়ারম্যান বজলুর রশিদ, এমবিই বলেন, কোম্পানিতে এ পর্যন্ত সংঘটিত বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনায় খাতভিত্তিক আলাদা আলাদা মামলা প্রস্তুতের প্রয়োজন থাকলেও, সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর সময়ে তিনি চেয়ারম্যান ছিলেন না, এমনকি বোর্ডে তাদের পক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতাও ছিল না; উপরন্তু ব্যবস্থাপনা পরিচালকও তখন তাদের পক্ষে ছিলেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বাস্তবতায় দুর্নীতির অনুসন্ধান ও আইনি পদক্ষেপ কার্যকরভাবে এগোয়নি। তবুও অভিযোগ ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে মোট ৯টি মামলা প্রস্তুত করা হয়, যার মধ্যে মাত্র একটি ছিল জমি-সংক্রান্ত; কিন্তু পরে কেবল একটি মামলা করা হলেও বাকিগুলো আর এগোয়নি বলে তিনি জানান।
এদিকে সম্প্রতি যে মামলাটি হয়েছে, সেটি কোম্পানির পক্ষ থেকে নয়- বরং একজন শেয়ারহোল্ডার নিজ উদ্যোগে করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোম্পানির পক্ষ থেকে মামলা করতে না পারার অন্যতম কারণ হলো- যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের অনেকেই এখনও বোর্ডে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন এবং তারা নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে মামলা ঠেকিয়ে দেন। তিনি বলেন, বোর্ড মিটিংয়ে প্রতিদিন একটি ইস্যু নিয়ে যুদ্ধ করে কোম্পানি চালানো যায় না; কারণ মূল লক্ষ্য হলো কোম্পানিকে বাঁচানো। এ অবস্থায় আইনি পদক্ষেপের অভাবকে ব্যক্তিগত এজেন্ডা নয়, বরং বোর্ডের অভ্যন্তরীণ বাধা ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার ফল হিসেবে উপস্থাপন করেন তিনি।
হুদাভাসীর রিপোর্টের পর আইডিআরএ কোম্পানিকে যে নির্দেশনা দিয়েছে, তাতে কার বিরুদ্ধে মামলা হবে- এই বিষয়ে নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ ছিল না; তবে যারা দায়িত্বে ছিলেন এবং যাদের নির্দেশনায় অনিয়ম হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে বলে তিনি জানান। উদাহরণ হিসেবে তিনি ২০১১ সালের আফতাব নগরের জমি ক্রয়ের সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরে বলেন, সেখানে সাব-কমিটি মাত্র এক বৈঠক করেই আগে থেকে পরিকল্পিতভাবে অর্থ স্থানান্তর শুরু করে দেয় এবং বোর্ড বৈঠকের পরদিনই চেক ইস্যু হয়ে যায়- যা সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।




