বিআইএ’র প্রেসিডেন্ট শেখ কবির হোসেনের ১৩ বছরের নেতৃত্ব, কতটা মনে রাখল বীমা খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদায় নিলেন বীমা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ)’র সাবেক প্রেসিডেন্ট শেখ কবির হোসেন। দীর্ঘ ১৩ বছর দেশের বীমা খাতের এই শীর্ষ সংগঠনের নেতৃত্বে থাকার পরও তার মৃত্যুতে বীমা খাত নিরবই থেকে গেল। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় শোক বার্তা দেয়া ছাড়া আর কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন করেছে বলে জানা যায়নি। এমনকি কোনো বীমা কোম্পানিও শোক সভার কোনো আয়োজন করেনি।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শেখ কবির হোসেন। রাজধানীর কলাবাগানে প্রথম জানাজার পর গোপালগঞ্জে নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
শেখ কবির হোসেন ২০১১ সালে বিআইএ’র প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে টানা ১৩ বছর দায়িত্ব পালন করে ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর পদত্যাগ করেন। দীর্ঘ এ সময়ে দেশের বীমা খাতের নীতিগত সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজার শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বীমা গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় শেখ কবির হোসেনই উদ্যোগ নেন বীমা কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন ফি কমানোর। ২০১৮ সালে নিবন্ধন নবায়ন ফি গ্রস প্রিমিয়ামের ওপর প্রতি হাজারে ৩ টাকা থেকে কমিয়ে ১ টাকা করা হয়। ২০১৮ সালের ১১ জুন এই বিধিমালার গেজেট প্রকাশ করা হয়।
নন-লাইফ বীমা খাতে ২০১০ এর আগে কমিশন হার নির্ধারণ ছিল না । শেখ কবির হোসেন বিআইএ’র প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর কমিশন দেয়া বন্ধ করে দেন। পরে ২০১২ সালে বীমা খাত নিয়ন্ত্রক সংস্থা ১৫ শতাংশ কমিশন হার নির্ধারণ করেন।
দেশে লাইফ বীমা গ্রাহকদের জন্য ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব খোলার উদ্যোগ নেন শেখ কবির হোসেন। এই উদ্যোগের ফলে ২০১৪ সালের ২ জুন বীমা গ্রাহকদের জন্য ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার অুনমোদন দিয়ে সার্কুলার জারি করেন।
নন-লাইফ বীমায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের মাধ্যমে নন-লাইফ বীমা পলিসি গ্রহণে ব্যাংকের এনলিস্টমেন্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। শেখ কবির হোসেনের নেতৃত্বে কেন্দ্রিয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়।
নন-লাইফ বীমা খাতে অবৈধ কমিশন ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধে উদ্যোগ নেন শেখ কবির হোসেন। পরে ২০২১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সার্কুলার জারি করে কমিশন শূন্য শতাংশ করা হয়। বীমা কোম্পানির খরচ কমানোর জন্য গ্রাহকদের মোবাইলে মেসেস দেয়ার সংক্রান্ত আইডিআরএ’র বিতর্কিত কর্মাকাণ্ডের তীব্র বিরোধীতা করেন শেখ করি হোসেন।
বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে ও বীমার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে জাতীয় বীমা দিবস প্রবর্তন ও ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীতকরতে তার প্রচেষ্টায় প্রতি বছর ‘১ মার্চ’কে জাতীয় বীমা দিবস ঘোষণা করা হয়। দিবসটি ২০২০ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘ক’ শ্রেণির দিবস হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত হয়। ২০২৪ এর জুলাই গনঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতীয় বীমা দিবস পালনে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের স্থায়ী অবকাঠামোগত ভিত্তি দেয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ)’র নিজস্ব ভবন নির্মাণের জন্য জমি ক্রয়ের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয় তার সময়েই।
১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জে জন্মগ্রহণকারী শেখ কবির হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চাচাতো ভাই।
সরকারি কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও সোনালী ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগের পর বেসরকারি খাতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
তিনি সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স ও ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়া ন্যাশনাল টি কোম্পানি, বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামিয়া আই ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। লায়ন্স ক্লাবস ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা খাতে খান সাহেব শেখ মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা ছিল।



