৫৫৫ কোটি টাকার পুনর্বীমা করেনি গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স

আবদুর রহমান আবির: আইন অনুযায়ী পুনর্বীমাযোগ্য পলিসির পুনর্বীমা না করলে বীমা কোম্পানির লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার বিধান রয়েছে। তবে এই বিধান লঙ্ঘন করে প্রায় ৫৫৫ কোটি টাকার পুনর্বীমা করেনি গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। এর ফলে একদিকে যেমন কোম্পানি ও গ্রাহক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে, অন্যদিকে পুনর্বীমা প্রিমিয়াম থেকে বঞ্চিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি)।

গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের ২০২২ সালের কার্যক্রমের ওপর একটি বিশেষ নিরীক্ষা পরিচালনা করে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। নিরীক্ষা পরিচালনা করে ইউএইচওয়াই সাইফুল শামসুল আলম এন্ড কোং। এই বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে আসে বীমা কোম্পানিটির এসব অনিয়মের চিত্র।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের সাতটি শাখা অফিস থেকে ইস্যু করা মোট ৩ হাজার ২২টি বীমা পলিসি যাচাই করে বিশেষ নিরীক্ষক দল। এর মধ্যে ১ হাজার ২৪৯টি পলিসি পুনর্বীমাযোগ্য হলেও কোম্পানিটি ১ হাজার ১২টি পলিসি- অর্থাৎ প্রায় ৮১ শতাংশ পলিসির পুনর্বীমা করেনি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, পুনর্বীমা না করা এসব পলিসির মোট বীমা অংক ছিল ২ হাজার ৫৯৮ কোটি ১২ লাখ টাকা। এর মধ্যে পুনর্বীমাযোগ্য বীমা অংকের পরিমাণ প্রায় ৫৫৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সংযুক্তিতে পুনর্বীমাযোগ্য হলেও পুনর্বীমা করা হয়নি এমন ১ হাজার ১২টি পলিসির মধ্যে ৮৩টি পলিসির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

এ তালিকায় অগ্নি বীমার ৭টি পলিসি রয়েছে, যেগুলোর বীমা অংক ২১ কোটি ৮৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে পুনর্বীমাযোগ্য বীমা অংকের পরিমাণ ৭ কোটি ৮৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।

এ ছাড়া একটি মোটর বীমা পলিসির তথ্য পাওয়া গেছে, যার বীমা অংক ৭৭ লাখ টাকা এবং পুনর্বীমাযোগ্য বীমা অংকের পরিমাণ ৩২ লাখ টাকা।

অন্যদিকে মেরিন কার্গো বীমার ৭৫টি পলিসির তথ্যও প্রতিবেদনের সংযুক্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। এসব পলিসির মোট গ্রস প্রিমিয়াম ৫০ কোটি ৪৯ লাখ ৪১ হাজার ২৭৯ টাকা এবং পুনর্বীমাযোগ্য বীমা অংকের পরিমাণ ২৭ কোটি ৯৯ লাখ ৪১ হাজার ২৭৯ টাকা।

পুনর্বীমাযোগ্য পলিসির পুনর্বীমা না করা বীমা করপোরেশন আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। এতে একদিকে যেমন গ্রাহকের দাবি পরিশোধে ঝুঁকি তৈরি হয়, অন্যদিকে বীমা কোম্পানিও বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়ে।

বীমা আইন ২০১০-এর ১০(১)(ঝ) ধারা অনুযায়ী, কোনো বীমা কোম্পানি সন্তোষজনকভাবে পুনর্বীমা ব্যবস্থাপনা সম্পাদনে ব্যর্থ হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ সেই কোম্পানির নিবন্ধন স্থগিত বা বাতিল করতে পারে।

তথ্য অনুযায়ী, গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের পুনর্বীমা না করাসহ মোট ৩২টি আপত্তির বিষয়ে ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই একটি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তবে ওই শুনানিতে বীমা আইন ও আইডিআরএর সার্কুলার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলেও কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কোনো জরিমানা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি।

শুনানি সভায় বিষয়টি আইনানুগভাবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কোম্পানিটিকে সতর্ক করার জন্য কর্তৃপক্ষের আইন অনুবিভাগকে সুপারিশ করা হয়। তবে পরবর্তীতে আইন অনুবিভাগ গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সাধারণত এ ধরনের শুনানিতে কোম্পানির অপরাধ বা অনিয়মের মাত্রা অনুযায়ী জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে।

এর আগে ২০১৫ সালে যথাযথভাবে পুনর্বীমা না করার অভিযোগে স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের লাইসেন্স স্থগিত করেছিল আইডিআরএ। ওই কোম্পানি ৪৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকার বীমা পলিসির বিপরীতে আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক পুনর্বীমা করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

একই ধরনের অপরাধে ২০১৫ সালের ২১ জুন থেকে প্রাথমিকভাবে তিন মাসের জন্য কোম্পানিটির লাইসেন্স স্থগিত করা হয় এবং পরবর্তীতে এই স্থগিতাদেশ আরও দুই মাস বাড়ানো হয়। তবে একই বছরের ২৯ জুন হাইকোর্ট ওই স্থগিতাদেশের ওপর ছয় মাসের স্থগিতাদেশ প্রদান করে, ফলে কোম্পানিটি ওই সময়ের মধ্যে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো বীমা কোম্পানি যদি পুনর্বীমাযোগ্য পলিসির যথাযথ পুনর্বীমা না করে, তাহলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দাবি পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক সক্ষমতা হারাতে পারে। এমনকি গ্রাহকের দায় পরিশোধ করতে গিয়ে কোম্পানিটি দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতেও পড়তে পারে।

তাদের মতে, পুনর্বীমা না করা হলে একদিকে যেমন বীমা গ্রাহক ঝুঁকির মধ্যে পড়েন, অন্যদিকে কোম্পানিটিও আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ কারণেই আইনে পুনর্বীমাযোগ্য পলিসির পুনর্বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং এই বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করলে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলসহ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স পিএলসি’র সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে মতামত জানানোর কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে আর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।