কৃষি ও জলবায়ু ঝুঁকিতে গ্রিন ইন্স্যুরেন্স: কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

নিজস্ব প্রতিবেদক: জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ সুরক্ষায় বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে ‘গ্রিন ইন্স্যুরেন্স’ বা সবুজ বীমা। সুইস রি ইন্সটিটিউট-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জলবায়ু ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের বীমার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক গ্রিন ইন্স্যুরেন্স বাজার ২০২৪ সালে প্রায় ১.২৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে ১.৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং ১৪–১৬ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে ২০৩৩ সালের মধ্যে এটি ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। বর্তমানে ইউরোপ এগিয়ে থাকলেও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

বাংলাদেশে এই খাত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে, তবে কৃষিতে এর ব্যবহার বাড়ছে। বিশ্ব ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়তি ঝুঁকির মুখে, ফলে বীমা সুরক্ষার গুরুত্ব বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে আবহাওয়াভিত্তিক (ওয়েদার ইনডেক্স) বীমা কৃষকদের জন্য কার্যকর সমাধান হিসেবে উঠে আসছে।

দেশের বেসরকারি খাতে এ উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে যেখানে প্রায় ৩,০০০ কৃষক এই বীমার আওতায় ছিলেন, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৩০,০০০-এর বেশি হয়েছে- দুই বছরে প্রায় ১০ গুণ বৃদ্ধি। একই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার বেশি দাবি নিষ্পত্তি করা হয়েছে, যা প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক সুরক্ষা জোরদার করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পশুসম্পদ খাতও ঝুঁকির মুখে। এ প্রেক্ষাপটে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া হিট ইনডেক্স ভিত্তিক বীমা পণ্য তীব্র তাপপ্রবাহে ক্ষতি হলে খামারিদের সুরক্ষা দিতে সক্ষম হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় তাপপ্রবাহজনিত ক্ষতি বাড়তে থাকায় এই ধরনের বীমার চাহিদা আরও বাড়বে।

গ্রিন ইন্স্যুরেন্স বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দূষণ দায়বদ্ধতা এবং সবুজ অবকাঠামো- এই তিন খাতে কেন্দ্রীভূত। সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ সুরক্ষা, শিল্প দূষণজনিত ক্ষতির আর্থিক কভার এবং পরিবেশবান্ধব স্থাপনায় প্রিমিয়াম প্রণোদনা- এই খাতগুলোতে বীমা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশে বীমা খাতের পেনিট্রেশন এখনও কম, প্রায় ০.৪০ শতাংশ। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, যেখানে ভারতে এটি প্রায় ৪ শতাংশ এবং উন্নত দেশে ৫-১২ শতাংশ, সেখানে গ্রিন ইন্স্যুরেন্স নতুন বাজার তৈরির সুযোগ তৈরি করছে। তবে সচেতনতার অভাব, সীমিত পণ্য বৈচিত্র্য, তুলনামূলক উচ্চ প্রিমিয়াম ও তথ্য ঘাটতি বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পরিবেশবান্ধব আর্থিক খাতকে উৎসাহিত করছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নীতিগত সহায়তা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সচেতনতা বাড়লে গ্রিন ইন্স্যুরেন্স জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে গ্রিন ইন্স্যুরেন্স শুধু একটি পণ্য নয়, বরং একটি কৌশলগত প্রয়োজন। এই খাতকে মূলধারায় আনা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে।