পলিসির তথ্য গোপন রোধে এসবিসি’র শর্তারোপ, অবাস্তব বলছে বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলো

আবদুর রহমান আবির: দেশের নন-লাইফ বীমা খাতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে ২০২৬-২০২৭ বছরের পুনর্বীমা চুক্তি নবায়নে দুটি শর্তারোপ করেছে পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি) । তবে এসবিসি’র এই শর্তগুলোকে 'একতরফা' ও 'অবাস্তব' বলে মনে করছে বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলো। পুনর্বীমা চুক্তি নিয়ে সাধারণ বীমা করপোরেশন ও বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোর সাথে আলাপ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
প্রতিবছর এপ্রিলের মধ্যে পুনর্বীমা চুক্তি নবায়ন করতে হয় বেসরকারি নন-লাইফ কোম্পানিগুলোকে। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছরের পুনর্বীমা চুক্তির কার্যক্রম শুরু করেছে সাধারণ বীমা করপোরেশন। তবে এবারের পুনর্বীমা চুক্তিতে এসবিসি বলছে, যেসব কোম্পানির পুনর্বীমা প্রিমিয়াম বকেয়া রয়েছে তাদেরকে নূন্যতম ৩০ শতাংশ বকেয়া প্রিমিয়াম পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়াও মেরিন কার্গো পলিসির বর্ড্রো (পলিসির বিস্তারিত তথ্য) প্রতি মাসে জমা দিতে হবে।
যে কারণে বকেয়া প্রিমিয়ামের ৩০% পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আরোপ
সাধারণ বীমা করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আইন অনুযায়ী প্রিমিয়াম বকেয়া রেখে পুনর্বীমা চুক্তি সম্পাদন করার কোনো অবকাশ নেই। তা সত্ত্বেও, দীর্ঘ সময় ধরে বকেয়া প্রিমিয়াম রেখেই পুনর্বীমা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। বীমা দাবি ও প্রিমিয়াম সমন্বয়ের নামে প্রচলিত এই 'বাকি' ব্যবসার সংস্কৃতি বন্ধ করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই মূলত চুক্তি নবায়নের সময় বকেয়া পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
গত বছর (২০২৫-২৬) চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫০ শতাংশ বকেয়া পরিশোধের শর্ত দেয়া হলেও অধিকাংশ কোম্পানি তা পালনে আশানুরূপ সাড়া দেয়নি। ফলে সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলার স্বার্থে, সাধারণ বীমা কর্পোরেশন (এসবিসি) পরিচালনা পর্ষদ আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের পুনর্বীমা চুক্তি নবায়নের জন্য কমপক্ষে ৩০ শতাংশ বকেয়া প্রিমিয়াম পরিশোধের শর্ত আরোপের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
এসবিসি প্রত্যাশা করে, যেসব বীমা কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি মজবুত, তারা এই ন্যূনতম সীমার ঊর্ধ্বে থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ বকেয়া পরিশোধ করবে। এর ফলে পুনর্বীমা প্রিমিয়াম ও বীমা দাবির নিষ্পত্তিকরণ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, গতিশীল ও সময়োপযোগী হবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের বীমা খাতের প্রতি গ্রাহকের আস্থা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
মেরিন কার্গো পলিসির মাসিক বর্ড্রো দাখিলের বাধ্যবাধকতা আরোপ যে কারণে
প্রচলিত নিয়মানুযায়ী মেরিন কার্গো পলিসির বর্ড্রো ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে জমা দেয়ার বিধান থাকলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি) চলতি বছর থেকে তা প্রতি মাসে দাখিলের নির্দেশনা প্রদান করেছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে সুনির্দিষ্ট পেশাদার ও কৌশলগত কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছে সাধারণ বীমা করপোরেশন।
এসবিসি’র মতে, যেহেতু মেরিন কার্গো পলিসির মেয়াদ সাধারণত ৩০ দিন হয়ে থাকে, তাই ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষায় থাকলে অনেক ক্ষেত্রে তথ্যের স্বচ্ছতা বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো পলিসির বিপরীতে বীমা দাবি উত্থাপিত না হলে সেই পলিসির তথ্য ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করে না এবং চুক্তিকালীন প্রাপ্য প্রিমিয়াম এসবিসিকে প্রদান থেকে বিরত থাকে।
এই ধরনের অনিয়ম রোধ এবং প্রকৃত তথ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই মাসিক ভিত্তিতে বর্ড্রো দাখিলের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) বা বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, মাসিক ভিত্তিতে প্রতিবেদন দিলে অনেক পলিসি পুনর্বীমা কভারেজের বাইরে চলে যাবে এবং ঝুঁকি বাড়বে- যা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছে এসবিসি।
পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানটির মতে, ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে যেভাবে প্রতিটি পলিসি পুনর্বীমা সুরক্ষার আওতায় থাকে, মাসিক প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেও সেই সুরক্ষার কোনো ব্যত্যয় ঘটার সুযোগ নেই। বরং নিয়মিত বিরতিতে তথ্য আদান-প্রদান বীমা ও পুনর্বীমা প্রক্রিয়াকে আরও সুসংহত এবং উভয় পক্ষের জন্য ঝুঁকিমুক্ত করবে।
এসবিসি বলছে, এই পদক্ষেপের ফলে প্রিমিয়াম আদায়ে স্বচ্ছতা আসবে এবং দেশের বীমা খাতে একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিতামূলক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
নতুন দুই শর্তারোপ নিয়ে যা বলছে বেসরকারি কোম্পানিগুলো
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ)’র সেক্রেটারি জেনারেল ও সেনা ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) শফিক শামীম বলেন, প্রতিমাসে মেরিন পলিসির বর্ড্রো জমা দেয়া এবং বকেয়া পুনর্বীমা প্রিমিয়ামের ৩০ শতাংশ পরিশোধের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি সমাধানে কাজ করছে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ) । সুবিধামতো সময়ে এসবিসি’র সাথে মিটিং অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি বলেন, পুনর্বীমা চুক্তিতে উভয়পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। এসবিসি যদি তাদের বকেয়া প্রিমিয়ামের ৩০ শতাংশ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে তাহলে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর পাওনা বীমা দাবিও সেভাবে পরিশোধ করতে হবে। বছরের পর বছর বীমা দাবি বকেয়া রেখে প্রিমিয়াম আদায়ে চাপ সৃষ্টি করা যুক্তি সম্মত হবে না।
প্রতিমাসে মেরিন কার্গো পলিসির বর্ড্রো এসবিসিতে দাখিলের বিষয়ে শফিক শামীম বলেন, এটি বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ওপর একটি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বীমা বাজারে মেরিন কার্গো পলিসির বর্ড্রো ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে জমা দিতে হয়, এটাই স্বাভাবিক। প্রতিমাসে বর্ড্রো জমা দেয়ার বিষটি অযৌক্তিক।
তিনি আরো বলেন, এসবিসি যদি কোন অনিয়ম বন্ধের পদক্ষেপ হিসেবে এটি করে থাকে তাহলেও সেটা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, যেকোন অনিয়ম বন্ধের জন্য তারা আইডিআরএ’কে ব্যবস্থা নিতে বলতে পারে। তবে এটি চুক্তির শর্ত করা ঠিক হবে না। পুনর্বীমা চুক্তির ক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নেয়া উচিত।
এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ইমাম শাহীন বলেন, মেরিন কার্গো পলিসির বর্ড্রো প্রতিমাসে দাখিলের বিষয়টি জটিলতা তৈরি করবে। কোন পলিসি ল্যাপস হয়ে যেতে পারে। সব কোম্পানিতে প্রতিমাসে মেরিন কার্গো পলিসি হয় না। অনেক সময় শিপিংয়ের তথ্য সময়মতো পাঠায় না। তাই প্রতিমাসে বর্ড্রো দাখিলের সিদ্ধান্ত প্রফেশনাল হবে না। তাছাড়া বিদেশি পুনর্বীমা কোম্পানিগুলোকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতেই মেরিন কার্গো পলিসির বর্ড্রো জমা দিতে হয়, এটাই স্ট্যান্ডার্ড।
বকেয়া পুনর্বীমা প্রিমিয়ামের ৩০ শতাংশ পরিশোধের বিষয়টি একপেশে আখ্যায়িত করে ইমাম শাহীন বলেন, রেগুলেটরি আচারণ করলে চলবে না। প্রিমিয়াম আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে কিন্তু বীমা দাবি কবে পরিশোধ করা হবে তার কোন তথ্য জানাচ্ছে না, এটা হয় না। পুনর্বীমা চুক্তির ক্ষেত্রে উভয় পক্ষকেই উইন উইন সিচুয়েশনে থাকতে হবে।
তিনি বলেন, বেসরকারি কোম্পানিগুলোর দাবি পরিশোধে গ্রাহকদের চাপ থাকে, আইনের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। এমন অবস্থায় কোম্পানিগুলোকে তাদের এফডিআর ভেঙ্গে গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধ করতে হয়। তা না হলে- গ্রাহক হারাতে হয়, কোম্পানির ইমেজ নষ্ট হয়।
অথচ বছরের পর বছর ধরে পুনর্বীমা দাবির অর্থ বকেয়া থাকে এসবিসি’র কাছে। এক্ষেত্রে পুরো দায় এসবিসি’র নয়; আমাদেরও আছে। আর এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে চলে এসেছে প্রিমিয়াম ও বীমা দাবি বকেয়ার এই চিত্র। এক্ষেত্রে আমরা সময়মতো পুনর্বীমা প্রিমিয়াম পরিশোধ করব, এসবিসি সময়মতো দাবি পরিশোধ করবে- তাহলেই সম্ভব এ খাতের উন্নয়ন।
ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান তারেক বলেন, প্রতিমাসে মেরিন পলিসির বর্ড্রো জমা দেয়া সম্ভব নয়। এটি অবাস্তব এবং নরমাল প্র্যাকটিসের বাইরে। বিদেশি পুনর্বীমা কোম্পানি ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বর্ড্রো গ্রহণ করে এবং সে অনুযায়ী সময়মতো বীমা দাবি পরিশোধ করে। এক্ষেত্রে এসবিসি কেন একতরফাভাবে এই সিদ্ধান্ত আমাদের ওপর চাপিয়ে দেবে।
তাছাড়া প্রতিমাসে মেরিন পলিসির বর্ড্রো দাখিল করতে গিয়ে কোন পলিসি কাভারেজের বাইরে থাকতে পারে, যা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই এসবিসি’র এ ধরণের একতরফা সিদ্ধান্ত আমরা মানতে পারছি না। বিষয়টি নিয়ে এসোসিয়েশনে (বিআইএ) আলোচনা হয়েছে, খুব শিগগিরই এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য এসবিসি’কে জানানো হবে।
বকেয়া পুনর্বীমা প্রিমিয়ামের ৩০ শতাংশ পরিশোধের বাধ্যবাধকতার বিষয়ে হাসান তারেক বলেন, যেসব কোম্পানির প্রিমিয়াম বকেয়া আছে তাদের দায়-দেনা সমন্বয় করে; অর্থাৎ বকেয়া পুনর্বীমা প্রিমিয়ামের সাথে বকেয়া বীমা দাবির সমন্বয় করে যা থাকবে তার ওপর একটা নির্দিষ্ট অংশ গ্রহণ করতে পারে। তবে সব কোম্পানির জন্য একইভাবে শর্তারোপ করা বাস্তবসম্মত নয়।
গত ৩১ মার্চ সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি)’কে দেয়া এক চিঠিতে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ) জানিয়েছে, বর্তমান ডলার সংকট, যুদ্ধের প্রভাব ও তারল্য সংকটের কারণে অনেক বেসরকারি বীমা কোম্পানির পক্ষে বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে যেসব কোম্পানির পুনর্বীমা দাবির অর্থ পাওনা রয়েছে, তাদের বকেয়া না নিয়েই পুনর্বীমা চুক্তি সম্পন্ন করার আহবান জানিয়েছে বিআইএ। পাশাপাশি, এই চুক্তি সম্পন্ন করার সময়সীমা আরও এক মাস বাড়ানোর এবং আলোচনার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু সমাধানের অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি।



