প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের অভিনব জালিয়াতি: ভুয়া সার্ভে রিপোর্ট দিয়ে ১৭ বীমা দাবির টাকা আত্মসাৎ

আবদুর রহমান আবির: কোম্পানির তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাৎ করতে ১৭টি বীমা দাবি পরিশোধ দেখানো হয়েছে। এসব বীমা দাবি পরিশোধে জালিয়াতি করে তৈরি করা হয়েছে জরিপ প্রতিবেদন। আবার সব জরিপ প্রতিবেদনেই ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষয়ক্ষতির একই রকমের একটি ছবি। অপরদিকে গ্রাহকরাও জানেন না তাদের নামে বীমা দাবি পরিশোধ দেখানো হয়েছে। দেশের নন-লাইফ বীমা খাতে এমন অভিনব জালিয়াতির ঘটনা ঘটিয়েছে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স।

দাবি পরিশোধের নামে অর্থ আত্মসাতের এই চিত্র উঠে এসেছে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডির অনুসন্ধানে।

যেভাবে জালিয়াতি ফাঁস

বীমা দাবি পরিশোধে জাল-জালিয়াতির এই ঘটনার সূত্র উঠে আসে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের ২০২২ সালের বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স ১৭টি প্রতিষ্ঠানকে ১৭টি বীমা দাবি পরিশোধ করেছে। আর এসব বীমা দাবির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপন করেছে ৫টি সার্ভে প্রতিষ্ঠান। আর এই ৫টি সার্ভে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সার্ভে রিপোর্টে ক্ষয়ক্ষতির একই রকমের একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের এই তথ্যের ভিত্তিতে পৃথকভাবে ৫টি সার্ভে প্রতিষ্ঠানকেই একই রকমের ছবি ব্যবহারের কারণ জানতে চেয়ে পত্র দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ।

এর প্রেক্ষিতে সার্ভে প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের এই ১৭টি বীমা দাবি পরিশোধে তাদের যেমন নিয়োগ দেয়া হয়নি তেমনি তারা কোন সার্ভে রিপোর্টও দাখিল করেনি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদন, সার্ভেয়ারদের চিঠিপত্রসহ এ সংক্রান্ত সকল তথ্যই হাতে আসে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র। এসব নথিপত্র যাচাই করে সংশ্লিষ্ট বীমা গ্রাহকদের সাথে কথা বলে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি। এতে উঠে আসে জালিয়াতির এমন চিত্র।

যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে দেখানো হয় বীমা দাবি নিষ্পত্তি

ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র অনুসন্ধানে দেখা যায়, সর্বমোট ১৭টি প্রতিষ্ঠানের নামে এসব বীমা দাবি পরিশোধ দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই বিজিএমইএ’র সদস্য।

গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- এবি ফ্যাশন মেকার; রাতুল অ্যাপারেলস লিমিটেড; ফিন বাংলা অ্যাপারেলস লিমিটেড; ইন্টারলিঙ্ক ড্রেসেস; আমট্রানেট লিমিটেড; এস-২১ অ্যাপারেলস লিমিটেড; সার ইন্টারন্যাশনাল ক্লোথিং; স্টাফেক্স ফ্যাশনস লিমিটেড; আনাম ক্লোথিং লিমিটেড; স্কাইলার্ক নিট কম লিমিটেড; আরএন টেক্সটাইল; রেনেসাঁ অ্যাপারেলস লিমিটেড; বিসিএল পেপার মিলস লিমিটেড এবং ইন্টারস্টফ ক্লোথিং লিমিটেড।

অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান হলো -এমএএ সিস্টেম কম্পিউটার প্রিন্টার্স অ্যান্ড প্যাকেজিং; গিস সিটি প্রকাশনী এবং কুতুববাগ পেপার প্রোডাক্টস লিমিটেড।

গ্রাহকরা যা জানালেন

ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র পক্ষ থেকে ১৭টি প্রতিষ্ঠানের সাথেই যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। এর মধ্যে গার্মেন্টস খাতের ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪টি প্রতিষ্ঠানের মতামত পাওয়া যায়। তারা জানান, তারা প্রত্যেকেই প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের গ্রাহক। তবে এসব বীমা দাবির বিষয়ে তারা কেউ কিছুই জানেন না। 

বীমা দাবি নিয়ে এমন জালিয়াতির বিষয়ে এস-২১ অ্যাপারেলস লিমিটেডের পরিচালক আবদুর রহমান বলেন, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের এমন জালিয়াতি দেখে আমি অবাক হয়েছি। আমাদের প্রতিষ্ঠানের ফাইলপত্র যাচাই করে দেখেছি, আমরা এমন কোন ক্লেইম করিনি। আমাদের নামে তারা যে ইন্স্যুরেন্স ক্লেইম দেখিয়েছে; তা সম্পূর্ণ জাল-জালিয়াতি।

তিনি আরো বলেন, খুব শিগগিরই আমরা প্যারামাউন্ট ইন্স্যুোরেন্স কোম্পানির সিইও’কে চিঠি দিয়ে এই ফলস ক্লেইম (ভুয়া বীমা দাবি)’র বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইব। তারা যদি এ বিষয়ে কোন ব্যাখ্যা বা জবাব না দেয় তাহলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেব।

ফিন-বাংলা এ্যাপারেলস এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খসরুজ্জামান জানান, ২০২২ সালে কোনো দাবি উত্থাপন করেনি এবং দাবি বাবদ কোনো টাকা নেননি। তবে তিনি প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সে বীমা করেন বলে জানান।

এবি ফ্যাশন মেকার এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সানাউল হক বাবুল জানান, তিনি প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সে কোনো বীমা দাবি উত্থাপন করেননি এমনকি এ বাবদ কোনো টাকা নেননি। এবি ফ্যাশন মেকারে বিজিএমইএ’র সদস্য। সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল সার্ভেয়ার নাম ব্যবহার করে জালিয়াতি করে সার্ভে রিপোর্ট তৈরি করা হয়।

এনাম ক্লোথিং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনির হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা ক্লেইমটা নিয়েছি কিনা বলতে পারছি না। আমরা প্যারামাউন্টের কাছে কাগজপত্র পাঠিয়েছে আপনারা তাদের সাথে যোগাযোগ করেন।

সার্ভেয়ারদের জবাব- আমরা নিয়োগই পাইনি, রিপোর্ট দেব কোথা থেকে!

কর্তৃপক্ষের কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে ৫টি সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠানই স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ওইসব বীমা দাবির বিষয়ে তারা কোনো জরিপ করেনি এবং কোনো রিপোর্টও জমা দেয়নি। প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স তাদের নাম ভাঙিয়ে সম্পূর্ণ ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করেছে।

এ বিষয়ে সোনালী সার্ভে এন্ড ইন্সপেকশন কোং জানিয়েছে- ২০২২ সালে ফিন বাংলা অ্যাপারেলস লিমিটেডের পলিসির বিপরীতে যে জরিপ রিপোর্ট দেখানো হয়েছে সেটি তারা প্রদান করেনি। সার্ভে প্রতিষ্ঠানটি আরো বলছে, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স তাদের কোনো নিয়োগই প্রদান করেনি। সুতরাং তাদের পক্ষে রিপোর্ট দেয়ার কোনো সুযোগই নেই।

​রাতুল অ্যাপারেলস, মা সিস্টেম কম্পিউটার, গিস সিটি প্রকাশনী, সার ইন্টারন্যাশনাল ক্লোথিং এবং আনাম ক্লোথিং লিমিটেড- এই ৫টি প্রতিষ্ঠানের বীমা দাবির বিপরীতে দোয়েল সার্ভে এন্ড ইন্সপেকশনের নামে রিপোর্ট দেখানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আইডিআরএ’কে লিখিত জবাবে জানিয়েছে, এসব দাবির বিষয়ে তাদেরকে নিয়োগ করা হয়নি এবং তারা কোনো রিপোর্টও দেয়নি।

ক্যাপিটাল সার্ভেয়ার্স জানিয়েছে- তাদের নাম ব্যবহার করে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স যেসব জরিপ প্রতিবেদন দেখিয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং তারা এমন কোনো রিপোর্ট দাখিল করেনি।

​অগ্রণী ইন্সপেকশন কোম্পানি লিমিটেড এবং অগ্নি ইন্সপেকশন লিমিটেড -এই দুটি প্রতিষ্ঠানও একই কথা জানিয়েছে। ২০২২ সালের বিভিন্ন দাবির বিপরীতে তাদের নামে দাখিলকৃত ভুয়া জরিপ প্রতিবেদনের দায় তারা সরাসরি অস্বীকার করেছে।

ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’কে যা জানালেন সার্ভেয়ররা

প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের ১৭টি বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে জাল-জালিয়াতির সার্ভে রিপোর্ট দাখিলের বিষয়ে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ৫টি সার্ভে প্রতিষ্ঠানের সাথেই যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। এর মধ্যে-

দোয়েল সার্ভে এন্ড ইন্সপেকশনের ব্যবস্থাপনা অংশীদার ও প্রধান জরিপকারী মো. আলতাফ হোসেন বলেন, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের ৫টি বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে আমাদের নামে সার্ভে রিপোর্ট দেখানো হয়েছে; যেগুলোর সাথে আমাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই। আইডিআরএ থেকে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল- আমরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, এসব বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স আমাদের সার্ভেয়ার নিয়োগ করেনি। এ বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।

তবে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের এই জালিয়াতির ঘটনায় কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছেন কিনা- সে বিষয়ে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা কোন ব্যবস্থা নেইনি।

প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে ব্যবহৃত জরিপ প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ইন্সপেকশনের জরিপকারী কিউ এম করিম জানান, ঘটনাটি বেশ পুরোনো হওয়ায় এই মুহূর্তে সঠিক তথ্য তার মনে নেই। তবে অফিসের নথিপত্র যাচাই করে পরবর্তীতে এ বিষয়ে তিনি মতামত জানাবেন।

এ বিষয়ে ক্যাপিটাল সার্ভেয়ার্সের প্রধান জরিপকারী মো. আব্দুল বারেক বলেন, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে আমাদের নামে ব্যবহৃত ৮টি জরিপ প্রতিবেদনে একই ছবি ব্যবহারের বিষয়ে আইডিআরএ জানতে চেয়েছিল। আমরা কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি- এসব বীমা দাবি পরিশোধে ব্যবহৃত জরিপ প্রতিবেদনের সাথে আমাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই।

তবে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের এই জালিয়াতির ঘটনায় কোম্পানির বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছেন কিনা- সে বিষয়ে তিনি বলেন, সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো আইডিআরএ’র অধীনে পরিচালিত হয়। তাই এ বিষয়ে আইডিআরএ যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই আমরা মেনে নেব। আইডিআরএ নির্দেশনা দিলে কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব, না হলে নয়।

জরিমানা ৫ লাখ, ​আইডিআরএ’র দায়মুক্তির অপকৌশল?

১৭টি বীমা দাবি পরিশোধে হুবহু একই ছবি ব্যবহারের দায়ে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে আইডিআরএ। অপরদিকে এসব বীমা দাবি পরিশোধে প্রতারণা হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, জরিমানার টাকা এরইমধ্যে পরিশোধ করেছে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি অপরাধে একাধিকবার শাস্তি দেয়ার কোন সুযোগ নেই। ফলে আইডিআরএ’র এই শাস্তিমূলক জরিমানা আরোপ কোম্পানিটিকে দায়মুক্তির সুযোগ করে দিয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তাদের মতে, বীমা দাবিগুলো গ্রাহকরা পেয়েছে কিনা বা এসব টাকা কারা নিয়েছে এবং এক্ষেত্রে আরো কি ধরণের জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে তা যাচাই করেই আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারত আইডিআরএ। সংস্থাটির গঠিত তদন্ত দলের প্রতিবেদনে জাল-জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সেসব অপরাধে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে এই জরিমানা আইনগত বাধা তৈরি করতে পারে।    

তারা আরো বলেন, বীমা আইন লঙ্ঘনের জন্য আইডিআরএ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু জাল-জালিয়াতি বা প্রতারণার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার আইডিআরএ’র নেই। এক্ষেত্রে দুর্নীত দমন কমিশন বা সিআইডি’কে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে সুপারিশ করতে পারে আইডিআরএ।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন হাতে আসার পরই কোম্পানিটির বিরুদ্ধে আইনগত কি কি ধরণের ব্যবস্থা নেয়া যায় সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিল আইডিআরএ’র।

ভুয়া সার্ভে রিপোর্ট দিয়ে ১৭ বীমা দাবি পরিশোধের বিষয়ে জানতে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাদ ইয়াহিয়ার সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশের বাইরে আছেন উল্লেখ করে কোন কথা বলতে রাজি হননি।

পরবর্তীতে বীমা কোম্পানিটির চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হোসেনের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরিচয় পেয়ে কল কেটে দেন। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে লিখিত প্রশ্নমালা পাঠানো হলেও কোন জবাব পাওয়া যায়নি।