বাংলাদেশে মাইক্রোইন্স্যুরেন্স: আস্থা সংকট কাটলেই খুলবে বড় বাজার

রাজ কিরণ দাস: বাংলাদেশে মাইক্রোইন্স্যুরেন্সের সম্ভাবনা দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা এখনও অনিয়মিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল, আর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও সীমিত। অসুস্থতা, মৃত্যু, ফসলহানি কিংবা ঘূর্ণিঝড়-বন্যার মতো দুর্যোগ- যেকোনো একটি ঘটনা নিম্নআয়ের পরিবারকে মুহূর্তেই অর্থনৈতিক চাপ ও ঋণঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। এই বাস্তবতায় স্বল্প প্রিমিয়ামে লক্ষ্যভিত্তিক ঝুঁকি কভারেজ দেয়া মাইক্রোইন্স্যুরেন্স কেবল একটি আর্থিক পণ্য নয়; দারিদ্র্য হ্রাস, জলবায়ু অভিযোজন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কার্যকর হাতিয়ার হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিস্তারের ইঙ্গিত, বাজারের সম্ভাবনা
বিভিন্ন প্রতিবেদনের অনুমান অনুযায়ী দেশে কয়েক কোটির বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাইক্রোইন্স্যুরেন্স বা ক্ষুদ্র ঝুঁকি-সুরক্ষা সেবার আওতায় এসেছে। এই বিস্তার ঘটেছে মূলত তিনটি চালিকাশক্তির সমন্বয়ে-বীমা কোম্পানির বিকল্প বিতরণব্যবস্থা, এনজিও ও মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের নেটওয়ার্ক এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল চ্যানেল।
ইতোমধ্যে জীবন ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র বীমা, কৃষকের জন্য আবহাওয়া-সূচকভিত্তিক পাইলট পণ্য, গবাদিপশু বা ঘরবাড়ি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সম্পদ সুরক্ষার মতো উদ্যোগ বাজারে জায়গা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সরকারের স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি (এসএসকে)-এর মতো উদ্যোগও ঝুঁকি সুরক্ষার ধারণাকে আরও বিস্তৃত করছে।
বড় বাধা: সচেতনতার ঘাটতি ও আস্থার সংকট
সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে- বিশেষ করে সচেতনতার ঘাটতি এবং আস্থার সংকট। অনেক মানুষের কাছে বীমা এখনও ‘জরুরি সুরক্ষা’ নয়, বরং ‘অতিরিক্ত খরচ’ হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার ক্লেইম নিষ্পত্তিতে দেরি, নথিপত্রের জটিলতা কিংবা তথ্যের অস্পষ্টতা থেকে ‘টাকা পাওয়া যায় না’- এমন ধারণা তৈরি হয়, যা বাজার সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এ ছাড়া ‘সাশ্রয়যোগ্যতা’ ও ‘প্রবেশগম্যতা’র দ্বন্দ্বও প্রকট। প্রিমিয়াম কম রাখতে গিয়ে কভারেজ সীমিত হয়; আবার কভারেজ বাড়াতে গেলে প্রিমিয়াম নিম্নআয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। অন্যদিকে পণ্য সহজলভ্য হলেও মানুষ যদি সেটি না বোঝে, বা সহজে কিনতে ও সময়মতো নবায়ন করতে না পারে, তবে প্রকৃত বিস্তার থেমে যায়। ফলে মাইক্রোইন্স্যুরেন্স কখনও জনপ্রিয়তার, কখনও টেকসইতার সংকটে পড়ে।
সমাধান একমাত্রিক নয়: আস্থা, নমনীয়তা ও প্রযুক্তি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাতকে টেকসই করতে সমাধানের পথও বহুমাত্রিক হতে হবে।
প্রথমত, আস্থা তৈরির উদ্যোগ: গ্রাহকের ভাষায় সহজ ব্যাখ্যা, মাঠপর্যায়ে আর্থিক শিক্ষা এবং স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশের মাধ্যমে বিশ্বাস তৈরি করতে হবে। পণ্য কী, কী কভার করবে, কী করবে না- সবকিছু স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নমনীয় প্রিমিয়াম কাঠামো: অনিয়মিত আয়ের বাস্তবতা বিবেচনায় দৈনিক বা সাপ্তাহিক ক্ষুদ্র কিস্তি, মোবাইল ওয়ালেট/এমএফএস-ভিত্তিক পেমেন্ট, গ্রুপ কভারেজসহ নমনীয় প্রিমিয়াম ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তি ও অংশীদারত্ব: শেষ মাইল ডেলিভারি শক্তিশালী করতে এমএনও (মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর) ও ইন্স্যুরটেক অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল অনবোর্ডিং, ই-কেওয়াইসি, ক্লেইম ট্র্যাকিং এবং সময়সীমাবদ্ধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা খরচ কমাবে, সেবা অভিজ্ঞতা উন্নত করবে।
একই সঙ্গে কৃষক, নগরের অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা- সবার ঝুঁকি আলাদা। তাই স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী পণ্য নকশা ও রিস্ক প্রাইসিং আধুনিক ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে করা দরকার। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সমন্বয় ও ভোক্তা সুরক্ষার কাঠামো শক্ত হলে উদ্ভাবন এবং বাজার-আস্থা দুটিই একসঙ্গে বাড়তে পারে।
ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে একটি প্রশ্নে
বাংলাদেশে মাইক্রোইন্স্যুরেন্সের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে একটি মূল প্রশ্নে- এটি কি কেবল কাগজে-কলমে থাকা কভারেজ হয়ে থাকবে, নাকি দুর্যোগ ও দারিদ্র্যচাপে নতজানু মানুষের জীবনে বাস্তব অর্থে ঝুঁকি কমানোর ঢাল হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত আছে বিশ্বাসযোগ্য সেবা, দ্রুত ক্লেইম নিষ্পত্তি এবং প্রযুক্তি-সমর্থিত অংশীদারভিত্তিক বিস্তারের সক্ষমতায়। আস্থা সংকট কাটাতে পারলেই বাংলাদেশে মাইক্রোইন্স্যুরেন্সের জন্য সত্যিকার অর্থে বড় বাজার খুলে যাবে।




